মার্কিন যুদ্ধ ও ভারতের আগ্রাসী নীতির পরিপেক্ষিত


কথা শুরু হয়েছিল আমেরিকান Forbes ম্যাগাজিনের একটা আগাম পূর্বাভাসকে কেন্দ্র করে। Forbes নেহায়েতই একটা ম্যাগাজিন নয়, স্টাটিসটিক্যাল তথ্যের এন্যালাইসিস থেকে প্রজেকশন করে বিভিন্ন রিপোর্ট সবসময়ই তারা করে থাকে। স্টাটিসটিক্যাল প্রজেকশন মানে বিগত ১০ দশবারো বছর বা সম্ভব হলে এরও বেশি ডাটা ব্যবহার করে প্রথমে তা দিয়ে একটা গ্রাফ তৈরি করা; এরপর ঐ গ্রাফের গতিধারা, অভিমুখ নজর করে এর বর্ধিত দিক কী হতে পারে তা এঁকে ফেলা। এতে আগামীদিনের কোনো ডাটা বা তথ্য ছাড়াই বরং উল্টা পথে ডাটার একটা আন্দাজ পাওয়া সম্ভব। এজন্য একে আমরা প্রজেকটেড বা সম্ভাব্য ডাটা বলি। তো, Forbes-এর ঐ কাজ ছিল আগামী দিনে বিশ্বশক্তিগুলোর ক্ষমতা বিন্যাসের চিত্রটা কেমন হতে পারে --তার একটা আগাম ধারণা তৈরি করা। লব্দ ফলের সারকথা ছিল, আমেরিকা একক পরাশক্তির জায়গায় আর থাকছে না। নতুন অন্তর্ভুক্তি ঘটছে ব্রাজিল, চীন ও ভারতের - এর ফলে কেউই আর একক ক্ষমতার অধিকারী নয়, নতুন ক্ষমতার বিন্যাসে অন্তত আট-দশ জনের মধ্যে প্রত্যেকে অন্যতম একজন মাত্র।

ধেয়ে আসা এই চিত্র দেখে ভয় পেয়ে করণীয় নির্ধারণে বসে যায় আমেরিকান নীতি নির্ধারকেরা। আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে কি হতে যাচ্ছে তার একটা চিত্র পেতে আরও ব্যাপক ও সুনির্দিষ্ট করে বুঝবার জন্য এক বিশাল গবেষণার কাজ হাতে নেয়া হয়। কাজটা দেয়া হয় আমেরিকার সরকারী নীতিনির্ধারক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, National Intelligence Council (NIC) কে। নভেম্বর ২০০৮ সালে NIC তাদের কাজ শেষ করে রিপোর্ট প্রকাশ করে। সরকারী এই ডকুমেন্ট পাবলিকলি ওপেন করা হয়েছে, (http://www.dni.gov/nic/PDF_2025/2025_Global_Trends_Final_Report.pdf)।

 

ঐ রিপোর্টে কিছু পর্যবেক্ষণ, বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব কোথায় কিভাবে তা বুঝার জন্য যা গুরুত্ত্বপূর্ণ সেগুলো নিয়ে সীমিত আকারে কিছু কথা এখানে বলব।

রিপোর্টে ছড়িয়ে থাকা কিছু পর্যবেক্ষণ এখানে তুলে ধরছি:

১. গ্লোবাল পরিসরে ২০২৫ সালের মধ্যে আমেরিকা গুরুত্ত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন বলে নিজেকে আবিষ্কার করবে, যদিও তখন অন্যদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীই থাকবে।

২. পুরা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাদি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এ পর্যন্ত যা কিছু বিকশিত ও গড়ে উঠেছে তা একেবারে বিপ্লবায়িত কায়দায় বদলে যাবে। শুধু Brazil, Russia, India and China, (সংক্ষেপে BRIC) - এই নতুন খেলোয়াড়েরা আন্তর্জাতিক উচু টেবিলে বসবার জন্য জায়গা পেয়ে যাবে তাইই নয়, তাদের এই হাজির হওয়ার মানে হবে আরও বড় বড় ভাগীদার হয়ে উঠা এবং খেলায় নতুন নতুন নিয়মও চালু করে ফেলা।

৩. আগে দেখা যায় নি এমন এক ঘটনা হলো, পশ্চিম থেকে পূর্বে সম্পদের স্থানান্তর, আমরা এখন তা ঘটতে দেখছি; সামনে যতদূর দেখা যায় এমন আগামী দিনগুলোতেও এটা ঘটতেই থাকবে।

৪. আগে উদাহরণ নাই এমন অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সাথে ১.৫ বিলিয়ন অতিরিক্ত জনগোষ্ঠী সম্পদের উপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষত, জ্বালানী, খাদ্য ও পানিতে -ক্রমবর্ধমান চাহিদার অস্বস্তিকর দৃশ্যাবলী তৈরি করবে।

৪. সম্ভাব্য সংঘাতের হুমকি বাড়তে থাকবে, অংশত: রাজনৈতিক ঝড়ে অস্থিরতার কারণে আর কিছু বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের কারণে।

৫. বর্তমানের এই বৈশ্বিক ঝোঁক যদি অব্যাহত থাকে তবে ২০২৫ সালের মধ্যে চীন দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসাবে জায়গা নিবে এবং সামরিক দিক থেকে অন্যতম শীর্ষস্থানে উঠে আসবে।

এই হলো সারকথায় বুঝবার জন্য গুরুত্ত্বপূর্ণ কিছু চুম্বক অংশ। মুলকথাটা হলো, চীন দ্বিতীয় অর্থনৈতিক ও অন্যতম শীর্ষ সামরিক শক্তি হিসাবে ধেয়ে আসছে এবং মার্কিন সাম্রাজ্য অধঃস্থানে যাচ্ছে - এই খবরে আমেরিকান নীতি নির্ধারকেরা নড়েচড়ে বসেছে। এখন তাদের করণীয় কী হবে? এটাই রিপোর্টের এই মূল বিষয় ও তাৎপর্য।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এটা একটা প্রজেকশন। ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়, ঘটতে যাওয়ার পূর্বাভাস। অর্থাৎ পরিস্থিতিকে এভাবে রেখে দিলে তা অনুমিত গতিপথে যাবে। কিন্তু যদি ক্ষিপ্রগতিতে নতুন কিছু উপাদান এখন থেকেই যুক্ত করা যায় - তাহলে কি হবে? তাহলে ফলাফল কিছু ঘুরে যাবার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু ফলাফল ঘুরে যায় যাতে এরকম ফ্যাক্টর বা উপাদান কী কী নীতি নির্ধারকদের হাতে আছে?

পশ্চিম থেকে পূর্বে সম্পদের স্থানান্তর হয়ে যাচ্ছে এবং আরও যাবে - এটা পশ্চিমের জন্য খুবই বেদনাদায়ক কথা। কিন্তু কী করা যায় তাতে? পূবে সস্তা শ্রমের কারণে এশিয়া নতুন নতুন বিনিয়োগ, সস্তায় অন্যদেশে রপ্তানি বাজার এবং একই কারণে নিজেই আভ্যন্তরীণভাবে বাজার - এএক বিশাল চক্র ও ক্ষেত্র হিসাবে তা হাজির হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগের জন্য, পুঁজির বেঁচেবর্তে মুনাফা কামিয়ে টিকে থাকার জন্য তা খুবই খুশির খবর। কিন্তু এতো পূবে, এশিয়ায় ঘটছে, সবাই ছুটছে এশিয়ার দিকে। এখন আবার ওকে পশ্চিমে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। কারণ, একে পশ্চিমে কমপিটিটিভ বিনিয়োগের জায়গা দেখিয়ে দেওয়া অসাধ্য। পশ্চিমের সীমিত বাজারে বিনিয়োগের জায়গা খুঁজে না পাওয়া সত্ত্বেও সেখানে ফিরে যাবার চিন্তা পুঁজির জন্য আত্মহননমূলক; শুকিয়ে মরা বা নিজের মাংস নিজে চিবিয়ে খাওয়ার মতো দুর্দশা। কাজেই সম্পদের এই স্থানান্তর মেনে না নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নাই। বরং মেনে না নিলে আরও বড় বিপদ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। কাজেই যা কিছু করার এশিয়ায় থেকেই করতে হবে। স্রোতের অভিমুখ উল্টানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়ার অবস্থা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের নাগালে নাই। তাহলে আর কি করণীয় আছে যাতে প্রজেকশন বা ভাগ্য উল্টানো যায়?

পাঠক লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয়, ঘটনার ঘনঘটা সব এশিয়াতে, মূলত চীন ও ভারতকে ঘিরে। কাজেই আমেরিকার নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্ত এবার সহজ অপশন, একটার সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে অপরটার বিরুদ্ধে জোট বেধে লড়ো, ভারতের সাথে চীনের বিরুদ্ধে।

এই নীতিতে আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতি: চীন ঠেকাও, ভারতের সাথে জোট বেধে চীন ঠেকাও - এই মনোবাসনার কারণে আমাদের এশিয়া সরগরম হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায়।

আমেরিকার এই সমর্থন ভারত ভালভাবেই মজা করে উপভোগ করছে। ঘটনাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, ভারত যতটা তার নিজের সামর্থ থেকে উত্থিত তার চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ক্ষমতা উপভোগ করতে শুরু করেছে। নিজের অর্থনৈতিক স্বক্ষমতাকে সত্যিসত্যিই একটা অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে উঠে দাঁড়ানোর কাজে আমেরিকার এই আশীর্বাদ পুজিঁ করে সবকিছুতে যাঁতা দেবার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের মনেবৃত্তিতে মশগুল। অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার কাজে তৎপরতায় যা কিছুই তারা বাধা, সমস্যা হিসাবে সামনে দেখছে -- তাকে আগ্রাসী বলপ্রয়োগের সমাধান পথে বেপরোয়া কুটনৈতিক বেছে নিচ্ছে।

আমেরিকার কূটনীতিক পথ দাঁড়িয়েছে, এশিয়ার সবল চীনের বিরুদ্ধে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ভারতকে ব্যবহার করা, এবং এর প্রভাবে ভারতের কূটনীতি সবকিছুকে বলপ্রয়োগ, চাপ দিয়ে আদায় করিয়ে নেবার লাইন - এটা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক লড়াই প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে সামরিক দিকেও গড়াবে সন্দেহ নাই। লক্ষণ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের সাথে ভারতের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা ও অপরাপর কৌশলগত চুক্তি তারই ইঙ্গিতবাহি।

বিশ্বপুঁজির স্বার্থের দিক চেয়ে বললে, অর্থনৈতিক লড়াই প্রতিযোগিতার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকুক এটাই তার ইচ্ছা। কিন্তু পুঁজি নৈর্ব্যক্তিক বলে এটা বিশ্বপুঁজির নৈর্ব্যক্তিক স্বার্থ। বাস্তবের দুনিয়ায় এর ভাগ্য নির্ধারিত হবে দেশ, রাষ্ট্রের অথবা এদেরই কোনো জোট, গ্রুপ এধরণের স্থানীয় স্বার্থগুলোর লড়াই, প্রতিযোগিতার নীট ফলাফল দিয়ে। তাতে স্থানীয় স্বার্থগুলোর হাতে পড়ে কোথায় কতটুকু নিজের জায়গা পাচ্ছে ততটুকই হবে পুঁজির বৈশ্বিক স্বার্থের বাস্তবায়ন। প্রকৃত দুনিয়ার লড়ায়েই এর ফয়সালা হবে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এশিয়ান কূটনীতিতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গী হয়ে ভারত আশেপাশের পড়শী থেকে শুরু করে সব প্রয়োজনে আগ্রাসী ভূমিকা নিচ্ছে, থাবা ও নখর বিস্তার করছে। তুলনায় প্রতীকিভাবে বলা যায় ভারত রথ চালাচ্ছে আর আমেরিকা তাতে সওয়ারী। এশিয়ার এই প্রতীককে বুঝবার জন্য একটু অন্দরে যাব। আমেরিকার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এক মজার দ্বৈততার। আমেরিকান রাষ্ট্র ও এর ক্ষমতা - এসবের দিক থেকে এই রাষ্ট্রের দরকার চীনের উপর একটা কর্তৃত্ব ও প্রভাব, পারলে যেন ওকে চূর্ণ করে দেওয়া। কারণ দুনিয়ায় আমেরিকার যে প্রভাব আজ আছে চীনের উত্থান একে ক্ষয়িষ্ণু, এলোমেলো করে তুলছে; আবার, আমেরিকান বিনিয়োগ পুঁজির স্বার্থের দিক থেকে দেখলে চীনের ধ্বংস মানে তারও মরণ। এটা চীনের ধ্বংস নয় যেন নিজেরই ধ্বংস। ফলে এই অদ্ভূত দ্বৈততাকে সাথে নিয়ে আমেরিকান রাষ্ট্রকে একটা ভারসাম্যের রেখা টেনেই চলতে হচ্ছে। গত বছরের নভেম্বরে চীন সফরে এসে ওবামাকে বলতে হয়েছে, যার যার স্বার্থের ভিতরে থেকেই পরস্পরকে কিভাবে সহযোগিতা করা যায় সেই লক্ষ্য এই সফরের উদ্দেশ্য।

এই দৃশ্যের সাথে তুলনায়, ভারতের চীনের কাছে সেসব দায় নেই। এজন্য অরুনাচল প্রসঙ্গে বিতর্কিত ভূমিতে এডিবির ঋণ নিয়ে উন্নয়ন তৎপরতার জবরদস্তি চালাতে গিয়ে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করে হলেও সেই আগ্রাসী পদক্ষেপ সে নেয়। যতদূর সর্বশেষ জানা যায়, আমেরিকা এই ইস্যুতে হাত সরিয়ে নিজেকে নিরপেক্ষ রাখার কথা চীন ও ভারতকে জানাতে বাধ্য হয়েছে। এরকম আরও অনেক ইস্যু আছে যেগুলোতে ভারত ও আমেরিকান অবস্থানের মিল অমিল নিয়ে কথা বলা যায়। কিন্তু আমেরিকা এশিয়ার শক্তিগুলোকে এভাবে ভাগ করে রেখে স্থানীয় স্বার্থগুলোর লড়াই, প্রতিযোগিতাকে কেবল অর্থনৈতিক জায়গায় রাখতে পারবে মনে হয় না। চীনকে একঘরে করে বাকি সবাইকে আমেরিকা-ভারতের স্বার্থজোটে জড়ো করার ভারতীয় চেষ্টার মধ্যেই সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এবং তা বাড়ছে। সম্প্রতি বার্মাকে নিজেদের কক্ষপুটে টেনে নিয়ে বাংলাদেশে সামরিক হুমকির অবস্থা তৈরি করা, চাপ সৃষ্টি করা সবচেয়ে কাছের উদাহরণ। বার্মার সামরিক সরকারও নিজেদের স্বীকৃতি, এবছরের নির্বাচন, অবরোধের ভিতরেও ভারতীয় অস্ত্রের চালান পাওয়া ইত্যাদি নানান কারণে ঐ জোটের কক্ষপুটে যাওয়াকে সুবিধা হিসাবে দেখেছে। বাংলাদেশকে ঘিরে ধরা হচ্ছে সবদিক থেকে, চারিদিকে বিপদ বাড়ছে। আমাদের জীবনের, আমাদের রক্তমাংসের শরীর ও স্বার্থের-- বাঁচামরার বষিয়ে আমরা কতটুকু সচেতন?

এবার সুনির্দিষ্ট করে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি। আগেই বলেছি আমেরিকাকে যাঁতা দেবার কাঠি হিসাবে ব্যবহারের মজার দিকটাই ভারতের কাছে লোভনীয় উপভোগের বিষয় হয়েছে। এই উন্মত্ত জোরাজুরির বিপদের দিক, বিনিময়ে কী সে হারাচ্ছে, - মজার খেলা ফেলে সেদিকে দেখবার মতো হুশ তার নাই। অনেকে বলেন, নিজের আভ্যন্তরীণ স্বক্ষমতার জোরে নয় বহিঃশক্তি গাটছড়ায় ভারতের যাঁতাপৃষ্ট করার ক্ষমতা হাতে পাওয়া জনিত ভারসাম্যহীনতা এটা। এজন্য আমরা এটাকে মুই কি হনুরে হিসাবে হাজির হতে দেখছি। রাষ্ট্র বৈশিষ্ট্যে ইসরায়েল যেমন নিজেকে আমেরিকা ভাবে, ভারতেরও সেসব বৈশিষ্ট্য লক্ষণ আমার দেখতে পাচ্ছি। সাথে জায়নবাদী ইরায়েলের সাথে বিপুল সামরিক সহায়তা সম্পর্ক ও গোপন যোগসাজস তো আছেই।

নিজেকে অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে দাঁড় করানোর কাজটা সুস্থিরভাবে চিন্তা করে অন্যদের সাথে সম্মানজনক আদানপ্রদানে সমন্বয় করতে পারতো। নিজের স্বার্থটাকে ভূআঞ্চলিক স্বার্থের ভিতরে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে সেখান থেকে সবার সাথে নিজেরও স্বার্থ হাসিল করার সুযোগ ভারতের ছিল। এক বিরাট সুযোগ সে পেয়েছিল। এতে তার বিকাশ একটা শক্ত খুঁটি, একটা দীর্ঘস্থায়ী ও শক্ত ভিত্তির উপরে দাঁড় করিয়ে নেবার সুযোগ ভারত নিতে পারতো। কিন্তু এই কষ্টকর তবে কংক্রিট পথের চেয়ে বরং, সবার উপর জোরজবরদস্তি, বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা জারি রেখে, ভয় ও চাপ সৃষ্টি করে, আগ্রামী চোখ রাঙানির পথটাই ভারতের পছন্দ হয়েছে।

আগে দেখা যেত বাংলাদেশের মতো দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা, পছন্দসই বৈশিষ্ট্যের একটা সরকারে বদলের ব্যাপারটা কেবল পশ্চিমাদের হাতে থাকে, ঘটে। এই প্রথম ভারত টের পেয়েছে এটা একটা খুবই সহজ ও মজার কাজ বটে। বাংলাদেশে একএগার’র সরকার কায়েমের অপতৎপরতায় একটা বড় ক্ষমতার ভাগিদার হিসেবে ভারত সেখানে জড়িত ছিল। বাংলাদেশের উপর ছড়ি ঘুরানোর মওকা, নিজের ইচ্ছামাফিক হস্তক্ষেপ করে ঘটনাবলীর ফল নিজঘরে তুলতে পারায় ভারত আরো ব্যগ্র হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে যা ইচ্ছা তাই করার ক্ষমতায় বলিয়ান বলে আত্মবিশ্বাসও ঝরে পড়ছে। ভারত ভেবে নিয়েছে এইটাই পথ। নিজেকে অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে দাঁড় করাতে বাঁধা, সমস্যা অপসারণে, কেমন বাংলাদেশ সে চায়, বাংলাদেশ থেকে যা নিতে চায়, যেমন সাইজে রাখতে চায় - সেভাবে পেতে একটা একএগার সরকার কায়েম থেকে শুরু করে সর্বশেষ হাসিনার সফরের প্রাপ্তি - এগুলো সহজে ও অনায়াসে করতে পেরেছে। নিজের কূটনীতি পরিচালনায় ভারতের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে; এই পথ বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা জারি রেখে, ভয় ও চাপ সৃষ্টি করে কাজ হাসিল করার, সর্টাকট বাজি মারার পথ। আমেরিকান চাঁড় কাঠি বা যাঁতা দিয়ে থেতলে দেওয়া কাঠির যে এত গুণ তা দেখে ভারত যারপরনাই আহ্লাদিত। এই অর্জন আসলেই তার অর্জন কিনা তা নিশ্চিত হবার সময় এখনও আসে নি। কেবল নজর দিতে বলব ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের জনগণের যে ঘৃণা কামিয়েছে, যেভাবে এটা বাড়ছে তার দিকে। মানুষ আস্তে আস্তে ফুঁসে উঠবে এবং এটা আরও বাড়বে বৈ কমবে না। পনের কোটি মানুষের মর্যাদা, জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তাকে পদদলিত করার আঘাতে যে ক্ষোভের বহ্নিশিখা জ্বলে উঠবে তাতে ভারতের সব আশু অর্জনই বিসর্জনের শোক গাথা হয়ে যেতে পারে। এখনই সাবধান হয়ে সরে না আসলে, পরে ফেরার পথও থাকবে না। সিদ্ধান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও নিতে হবে তারা কি এটাই চায় কিনা ।

আমরা ছোট্ট দেশ, দুই প্রতিবেশী চীন ও ভারতের এবং সহযোগী আমেরিকার এসব প্রস্তুতির হুঙ্কার, টানাটানি - সবই এখন আমাদের উপরে এসে পড়ছে। আমাদের রাজনীতির উপর দিয়ে এর প্রভাব, টানাপোড়েন টের পেতে শুরু করেছি। যদিও সে প্রভাবের খবর আমাদের রাজনীতির কারবারি কিংবা সমাজের আয়েশী শ্রেণীর কাছে পৌঁছচ্ছে বলে মনে হয় না। বরং উল্টা, হাসিনার ভারত সফর নিয়ে এখনই যে তোলপাড় সমাজে চলছে একে ৬০এর দশকের কায়দায় ভারত বিরোধিতা বলেই বিদ্রুপ করে অনেকেই আরামে নিদ্রা দিচ্ছে। অনেককে দেখছি, এটা "পাকিস্তানি মনের ভারত বিরোধিতা" বলেই নিজে বুঝেছে, অন্যকেও বুঝার জন্য তাগিদ রেখেছে।

আমাদের রাজনীতিকে আজ ২০১০ সালে এভাবে বুঝতে চাওয়া শুধু কূপমণ্ডুকতাই নয়, রীতিমত অপরাধ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রপাগান্ডার ধারাবাহিকতাই বটে। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন একমাত্র এই আঞ্চলিক ও বিশ্বপরিস্থিতির নতুন গতিপ্রকৃতি, যুদ্ধ আয়োজন এবং জোট গঠনের সমীকরণ থেকেই বুঝতে হবে। শত্রু-মিত্র নির্ধারণের যে মেরুকরণ খাড়া হয়েছে সেখানে আমরা কোথা আছি তাকে চিহ্নিত করেই প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রতিরোধের গণক্ষমতা গড়ে তুলে মোকাবেলা করতে হবে।

লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক, Afsanul Alam Munshe

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।