নোটিশের জবাব দেন নি, তাই অর্থদণ্ডসহ মাহমুদের তিন বছর


বিচারের সময় মামলার তদন্তকারী অফিসার নিজেই স্বীকার করেছেন দুদক এখনও মাহমুদুর রহমানের অবৈধ সম্পদের কোন হদিস পায় নি, কিন্তু তারপরও আজ ১৩ অগাস্ট ২০১৫ তারিখ বৃহস্পতিবার ঢাকার তিন নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আবু আহমেদ জমাদার পাঁচ বছর আগে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে করা মামলার রায় ঘোষণা করছেন। এই হোল বাংলাদেশের বিচার। তিন বছরের কারাদণ্ডের পাশপাশি মাহমুদুর রহমানকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

মাহমুদুর রহমানের কী অপরাধ! তাঁর বিরুদ্ধে দুদকের কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে কি? মোটেও না। তাহলে মামলাটা কিসের? ২০১০ সালের ১৯ এপ্রিল সম্পদের বিবরণী চেয়ে মাহমুদুর রহমানকে নোটিস পাঠায় দুদক। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে দুদকের কোন অভিযোগ নাই। তিনি নোটিশে সাড়া দেন নি। সাড়া না দেওয়ায় ওই বছরের ১৩ জুন দুদকের উপ-পরিচালক নূর আহম্মেদ গুলশান থানায় মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। একই বছরের ১৫ জুলাই ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। গতবছর ২৮ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্যে দিয়ে মাহমুদুরের বিচার শুরু হয়।

বিস্ময়ের হলেও সত্য যে বিচারক তার রায়ে বলেছেন, নোটিশের জবাব না দেয়ার কারনেই মাহমুদুর রহমানের এই সাজা হয়েছে। দুদকের আইনজীবী আদালতে বলেছেন, এটা অবৈধ সম্পদের মামলা নয়, এটি দুদকের নোটিশের জবাব না দেয়ার মামলা। (দেখুন আমার দেশ অনলাইন)। বকশীবাজারে বিশেষ জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে রায় ঘোষণার সময় মাহমুদুর রহমানকে কারাগার থেকে হাজির করা হয়।

মাহমুদুর রহমানের আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেছেন,প্রাথমিকভাবেও মাহমুদুর রহমানের কোন অবৈধ সম্পদের হদিস না পেয়ে সম্পদের হিসাব চেয়ে কোন নোটিশই দুদক দিতে পারে না। কিন্তু দুদক সেটা করেছে। এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলকভাবে দায়ের করা মামলা। উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে মাহমুদুর রহমান দুই দফায় তিন বছর একমাস ছয় দিন কারাভোগ করেছেন। রায়ে বিচারক উল্লেখ করেন তার কারাভোগ প্রাপ্ত সাজা থেকে বাদ যাবে। মামলার বিচারকালে মোট নয়জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়।

২০০৮ সাল থেকে মাহমুদুর রহমান দৈনিক আমার দেশের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন মাহমুদুর রহমান। ওই সময় থেকেই তিনি পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকের কথিত স্কাইপ কথোপকথন প্রকাশ, রাষ্ট্রদ্রোহ ও ধর্মীয় উসকানির অভিযোগে ২০১৩ সালের এপ্রিলে আমার দেশ কার্যালয় থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন থেকেই তিনি কারাগারে আছেন।

আদালত আবমাননার একটি মামলায় এর আগে ২০১০ সালে মাহমুদুরকে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকার অর্থদণ্ড দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

রায় ঘোষণার পর মাহমুদুর রহমান সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার কারণ আমি সরকার প্রধানের পুত্র ও জ্বালানি উপদেষ্টাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিলাম। জজ সাহেব সরকারপ্রধানকে খুশি করতে আইনবহির্ভূত এ রায় ঘোষণা করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ মামলায় বাদী কোনো দুর্নীতির প্রমাণ পায়নি। এরপরও বেআইনিভাবে আমাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এক স্কাইপ কেলেঙ্কারির জন্য আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একই কাজ জনকণ্ঠ ও একাত্তর টেলিভিশন করেছে। তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলা করা হয়নি। তাহলে দেশে কোথায় আইনের শাসন!’

কোর্ট থেকে বেরিয়ে প্রিজনভ্যানে ওঠার সময় মাহমুদুর রহমান আরো বলেন, ‘এ রায়ের মাধ্যমে জুলুম ও অবিচারের আরেকটি নজির স্থাপিত হলো। প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা (জহিরুল হুদা) সাক্ষ্য দিতে এসে পালিয়ে গেছেন। তিনি সাক্ষ্য দিলে সরকারের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসত। ফ্যাসিবাদী এ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে। হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে। এ লড়াই থামবে না।’

তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, মাহমুদুর রহমানের কোন অবৈধ সম্পদের হদিস দুদক পায়নি। আদালতে সাক্ষ্য প্রদানকালে মামলার আইও নুর আহমেদ স্পষ্টভাবে এটা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন ২০১০ সাল থেকে এ নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। এতাদিন অনুসন্ধান করেও তারা কোন অবৈধ সম্পদের সন্ধান পাননি। অ্যাডভোকেট তাজুল বলেন, ‘বিচারক সংবিধান এবং দুদক আইন লঙ্ঘন করে এ রায় ঘোষণা করেছেন। রাজনৈতিক উদ্দেশে এ মামলা ও রায় হয়েছে। আমরা উচ্চ আদালতে যাব। সেখানে এ রায় টিকবে না।’

 দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেছেন, এই মামলা  অবৈধ সম্পদের মামলা নয়। বৈধ -অবৈধ যে সম্পদেই থাকুক সেটার হিসাব দেয়ার জন্য দুদক নোটিশ দিয়েছিল। সে নোটিশের জবাব না দিয়ে মাহমুদুর রহমান আইন লংঘন করেছেন। এ জন্য তাকে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন আদালত। তিনি বলেন,‘আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মাহমুদুর রহমানকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের দুর্নীতি সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর ২০১০ সালের জুন মাসে সরকার আমার দেশ-এর প্রকাশনা বন্ধ করে দেয় এবং মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। এরপর আদালত অবমাননার একটি অভিযোগে তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয় সুপ্রিম কোর্ট। তখন প্রায় ১০ মাস কারাভোগ শেষে তিনি মুক্তি পান। সুপ্রিম কোর্টের আদেশে তখন আমার দেশ আবার পুনঃপ্রকাশিত হয়।

এরপর ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল আবার গ্রেপ্তার করা হয় মাহমুদুর রহমানকে। এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের স্কাইপ কেলেঙ্কারির কথোপকথন প্রকাশ করে আমার দেশ। দ্বিতীয় দফায় আবার আমার দেশ বন্ধ করে দেয়া হয়।এরপর থেকে মাহমুদুর রহমান কারাগারেই আছেন। আর আলোর মুখ দেখেনি দ্বিতীয় সর্বাধিক সংখ্যার আমার দেশ।

প্রহসন যে আজ আদালত দৈনিক জনকন্ঠকে আদালত অবমাননার জন্য শাস্তি দিয়েছে। গুরুতর আদালত অবমাননা প্রমাণিত হবার পরও তাদের শাস্তি কোর্ট চলা অবধি কোর্টে বন্দী থাকা আর দশ হাজার টাকা জরিমানা। কিন্তু মাহমুদুর রহমানের ক্ষেত্রে আদালত এই বৈষম্য করলো কেন?

এই প্রশ্নের উত্তরে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, "মাহমুদুর রহমানকে আদালত অবমাননার দায়ে ৬ মাসের কারাদণ্ড দিলে আতিক উল্লাহ খান মাসুদকেও ৬ মাসের কারাদণ্ড দিতে হবে এমন কোন কথা নেই। কনটেম্প এর বিষয়টি আদালতের একেবারে নিজস্ব এখতিয়ার। এক বছরের দণ্ড আর এক দিনের দণ্ড একই কথা। সামগ্রিকভাবে ৬ বিচারপতি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন"। আদালত অবমাননার দায়ে জনকণ্ঠ সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদকের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের সাজা ঘোষণার পর প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। (দেখুন, মানব জমিন)

এর আগে আদালত অবমাননার দায়ে আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ৬ মাসের এবং সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমানকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিল।

এটর্নি জেনারেল ভুল বলেছেন, আদালত অবমাননা আদালতের এখতিয়ার, কিন্তু বিচারে বৈষম্য আদালত করতে পারে না। নাগরিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচারণ করবার কোন এখতিয়ার আদালতের নাই, থাকতে পারে না।

 

 


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।