ফরহাদ মজহার


Friday 28 August 15

print

আমাদের আলোচনার জন্য লুদভিগ ফয়েরবাখ (১৮০৪ - ১৮৭২) গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান কারন, ধর্মের বিষয় আর দর্শনের বিষয় একই, হেগেলের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হেগেলের বিরুদ্ধে ফয়েরবাখের নালিশের জায়গাগুলো আমাদের বোঝা দরকার। হেগেলের এই দাবির ওপর দাঁড়িয়েই আমরা আমাদের আলোচনা শুরু করেছি। এখনও অবধি সেখানে দাঁড়িয়েই আমরা ধর্ম-পর্যালোচনার অর্থ বোঝার চেষ্টা করছি। সেই দিক থেকে ধর্মের বিরুদ্ধে ফয়েরবাখের আপত্তির চরিত্র এবং ‘ফয়েরবাখীয় নাস্তিকতা’র বৈশিষ্ট্য বোঝা আমাদের আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে ‘মুক্তবুদ্ধি’, ‘মুক্তচিন্তা’ ইত্যাদি নামে নাস্তিকতার যে ধারা আমরা দেখি তার চরিত্র ধর্ম বিদ্বেষী, বালখিল্য ও যারপরনাই মূর্খতার ফল। ফলে নাস্তিকতা মানেই ধর্ম বিদ্বেষ, ধর্ম বিশ্বাসীদের অপমানিত করা, নবি রসুলদের নিয়ে কুৎসিত ভাবে লেখালিখি করা, শ্রীকৃষ্ণকে লম্পট প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকা, শ্রীমতি রাধার পরকীয়া নিয়ে অতি উৎসাহী হয়ে পড়া, যীশুর জন্ম নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করা – বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে নাস্তিকতা সম্বন্ধে এই ধরণের ধারণাই গড়ে উঠেছে। বলাবাহুল্য এগুলো বিরক্তিকর ও দুঃখজনক। এর রাজনৈতিক ও সামাজিক কুফল আছে। যার লক্ষণ হিংসা, হত্যা ও ক্ষমতাসীনদের অন্ধকার রাজনীতির নোংরা কাদায় খাবি খাওয়ার মধ্যে আমরা দেখছি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তথাকথিত নাস্তিকতা, নাস্তিক্যবাদ, মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা ইত্যাদির কুফল নানাভাবে আমরা ভোগ করছি।

কিন্তু রাজনীতি বা ক্ষমতা নিয়ে প্রত্যক্ষ লড়াই, সন্ত্রাস ও সহিংসতা যেন দার্শনিক পরিমণ্ডলে নাস্তিকতার আলোচনার সঙ্গে গোলমাল পাকিয়ে না ফেলে সে ব্যাপারে আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষত বাংলাদেশের বাস্তবতায়। রাজনীতি নাস্তিকতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে বিরূপতা ও ক্ষোভ তৈরি করে দর্শনের দিক থেকে একই প্রকার বিক্ষুব্ধ ধারণা বদ্ধমূল হওয়া বিপজ্জনকও বটে। কারণ নাস্তি বা বিদ্যমান বিষয়কে ‘না’ বলা, বর্তমানকে নির্বিচারে মেনে না নিয়ে আগামির স্বপ্ন দেখা, এমনকি আল্লাহ, ঈশ্বর, কোরান, হাদিস বা বেদ-উপনিষদ, বাইবেল, ত্রিপিটক ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন তোলা চিন্তার জগতের বাইরের কিছু নয়। নাস্তিকতা, অবিশ্বাস, সংশয় ইত্যাকার চিন্ময় মুহূর্ত চিন্তারই অনিবার্য প্রক্রিয়া -- অতিক্রমণশীল, কিন্তু আবশ্যিক। যে অনুমান থেকেই চিন্তা শুরু করুক তার সত্যতার প্রতি নেতিবাচক অবস্থান ছাড়া কোন সজীব ও সক্রিয় চিন্তা শুরু হতে পারে না। নাস্তিকতার মুহূর্ত সজীব ও সক্রিয় চিন্তার আন্তরিক মুহূর্ত, নেতির মধ্য দিয়ে ইতিবাচকতা নির্মাণ। হেগেল চিন্তাকে একটি প্রক্রিয়া আকারে দেখাতে গিয়ে দেখিয়েছেন চিন্তা কিভাবে তার নেতিবাচক অবস্থান অতিক্রম করে ইতিবাচক অবস্থায় পৌঁছায়। কিন্তু পোঁছাবার পর সেই সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া আত্মসচেতন চিন্তাশীল মানুষ ভুলে যায় না। যে নেতিবাচক মুহূর্তের মধ্য দিয়ে চিন্তা পরিণত হয়ে উঠেছে সেই গতিপথ চিন্তা মনে রাখে। নাস্তিকতা যদি চিন্তার স্বভাবে না থাকত, তাহলে জগতকে ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ হিসাবে যেভাবে আমরা দেখতাম বা উপলব্ধি করতাম তার মধ্যেই আমরা আবদ্ধ থেকে যেতাম। এর বেশী জগত নিয়ে আমরা ভাবতে পারতাম না। মূর্ত জগতের মধ্য দিয়ে বিমূর্ত জগতে প্রবেশের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে মূর্ত সত্যকে অস্বীকার করা। তার প্রতি সংশয়ী ও অবিশ্বাসী হওয়া। অর্থাৎ এই জগত সত্য নয়, ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ জগতের বাইরেও সত্য থাকতে পারে এই সন্দেহ মনে জাগরিত রাখা এবং সেই সম্ভাবনার প্রতি চিন্তাকে নিবিষ্ট করা। যা দেখছি, স্পর্শ করছি, ঘ্রাণ পাচ্ছি, স্বাদ নিচ্ছি সেটাই একমাত্র সত্য নয়, এর বাইরেও সত্য আছে বিদ্যমান সত্যের প্রতি এই নেতি বা অস্বীকার ছাড়া মানুষ চিন্তার জগতে প্রবেশাধিকার পায় না। আর কে না জানে, আল্লা প্রত্যক্ষ সত্য নন, তার সত্যের নির্ণয় ঘটে বিমূর্ত চিন্তার হিম্মত অর্জনের মধ্য দিয়ে। আল্লা সম্পর্কে প্রাথমিক অনুমান ও ধারণা নির্মাণের সময় আমরা প্রত্যক্ষ জগত উপলব্ধির অভিজ্ঞতা বিমূর্ত জগতে আরোপের চেষ্টা করি। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ জগত উপলব্ধির অভ্যাস দিয়ে আল্লাহকে অনুধাবনের চেষ্টা অনিবার্য ভাবেই ব্যর্থ হতে বাধ্য। এই ব্যর্থতা থেকেই নাস্তিকতার কিম্বা চিন্তার নাস্তিক মুহূর্তের আবির্ভাব ঘটে। দর্শন এই মূহূর্তকে অনিবার্য ও আবশ্যিক গণ্য করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে নাস্তিকতা যে প্রকট রাজনৈতিক উপদ্রব হিসাবে হাজির হয়েছে তার সঙ্গে দার্শনিক নাস্তিকতাকে সমার্থক গণ্য করা দর্শনের জন্য বিপজ্জনক।

বিদ্যমান ও ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ জগতের বাইরেও আরেক সত্য আছে। তাঁকে আল্লা, ঈশ্বর, গড, প্রভু যে নামই দেই না কেন, তাকে প্রত্যক্ষের সত্য অস্বীকার না করে নির্ণয় করা অসম্ভব। এই নাস্তিকতা সজীব ও সক্রিয় চিন্তার জন্য জরুরী সেটা তথাকথিত ‘নাস্তিক’ কিম্বা ‘বিশ্বাসী’ দুইয়ের কেউই আর মনে রাখে না। প্রত্যক্ষবাদী, অর্থাৎ যারা প্রত্যক্ষের সত্য মানতে রাজি, কিন্তু আল্লাকে অস্বীকার করে, তারা নাস্তিকতার এক পক্ষে দাঁড়ায়। আর তাদের বিপরীতে দাঁড়ায় সেই সকল বিমূর্ত বিশ্বাসীরা যারা আল্লাহ বা পরমের সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রত্যক্ষকে অস্বীকার করে। ইসলাম এই দুটো ধারাকেই নাকচ করেছে বহু বহু বছর আগে। আল্লা ছাড়া তাঁর সৃষ্টির কোন অর্থ নির্ণয় যেমন অসম্ভব, ঠিক তেমনি সৃষ্টির সত্য অস্বীকার করে স্রষ্টার সত্য উপলব্ধিও অসম্ভব। তাহলে বাংলাদেশের নাস্তিক বা নাস্তিকতার সঙ্গে আমরা যেন দার্শনিক নাস্তিকতা, কিম্বা দার্শনিক অর্থে নাস্তিকদের গুলিয়ে না ফেলি। দর্শনের দিক থেকে কাজ হচ্ছে স্রষ্টা, সৃষ্টি, উভয়ের সম্পর্ক ইত্যাদির অনুমান বা ধারণা চিন্তা কোন্‌ অর্থে, কিভাবে, কখন, কোন্‌ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে সেইসব বিচার করে দেখা।

নাস্তিকতার নামে ঘোরতর ইসলাম বিদ্বেষীদের অন্তঃসারশূন্য চিন্তা, সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের নামে মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে পাশ্চাত্য পরাশক্তির পক্ষে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির তর্কের সঙ্গে জড়িত। আমরা যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি তার সঙ্গে কোন এ সবের কোন যোগই নাই। বাংলাদেশে ধর্ম বিদ্বেষীদের নাস্তিকতা আসলে রাজনৈতিক ইস্যু। যে কারনে আমরা আগেই বলেছি রাজনৈতিক দুষমনদের মোকাবিলা রাজনৈতিক ভাবেই করতে হবে। সেই রাজনীতির আলোচনা আমরা এখানে করছি না। সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু এই লেখাগুলো পাঠের সময় আমাদের তা মনে রাখতে হবে। কারণ বাংলাদেশে ধর্ম বিদ্বেষীদের মোকাবিলার বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের সমাজ এড়াতে পারে না। তার রূপ কি দাঁড়াবে তা বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতিই নির্ধারণ করে দেবে। তার পরিণতিও আমরা আগাম বলতে পারবো না। রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখতে হলে এই মোকাবিলার কোন বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু দর্শনে মুক্তচিন্তার নামে বালখিল্য তর্কের স্থান নাই।

লুদভিগ ফয়েরবাখ নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে কথাগুলো বারবার বলতে হচ্ছে। কারণ ফয়েরবাখ নাস্তিক ছিলেন। কিন্তু ফয়েরবাখের নাস্তিকতা দর্শনের নাস্তিকতা, তাকে দর্শনের জায়গা থেকে বুঝতে হবে। এর উৎপত্তি পাশ্চাত্য দর্শনে, বিশেষত জর্মন ভাবাদর্শের পরিমণ্ডলে। পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসের ভেতর থেকে তাকে বোঝাই আমাদের লক্ষ্য। ইসলাম যদি নিজেকে চিন্তার ক্ষেত্রে বিপ্লব হিসাবে গণ্য করে এবং মানবেতিহাসে সেভাবে হাজির হতে চায়, তাহলে দেশকালপাত্র ভেদে চিন্তার বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে তার দার্শনিক ন্যায্যতা ও অনিবার্যতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরী। সেই দিক থেকে দার্শনিক নাস্তিকতাকে দর্শনের ক্ষেত্রে দাঁড়িয়েই মোকাবিলার হিম্মত ইসলামকে অর্জন করতে হবে।

ফয়েরবাখের প্রতি আমাদের আগ্রহ তাঁর দার্শনিক নাস্তিকতার জন্য, যা দিয়ে তিনি জর্মন ভাবাদর্শের রূপান্তর ঘটিয়ে দিয়েছিলেন এবং কার্ল মার্কসের আবির্ভাব নিশ্চিত করে তুলেছিলেন। দেশকালপাত্রভেদে দর্শনের পরিমণ্ডলে নাস্তিকতার বিভিন্ন রূপ ও ধরণ কিম্বা সুনির্দিষ্ট ভাবে ফয়েরবাখের নাস্তিকতা মোকাবিলা করবার আগে নাস্তিকতা বিচারের ক্ষেত্রে ইসলামের দার্শনিক অবস্থান কী হতে পারে সে সম্পর্কে খানিক আন্দাজ থাকা জরুরী। অন্তত কিছু আগাম অনুমান জারি না রাখলে পাশ্চাত্য নাস্তিকতার বিচার আমাদের জন্য ফলপ্রসূ হবে না। সে কারণে এখানে কিচু প্রাথমিক ধারণা ফয়েরবাখ নিয়ে আলোচনার আগে পেশ করে রাখব।

ইসলামপন্থি ও ইসলাম বিদ্বেষী উভয়ের মধ্যেই একটি প্রবল বিশ্বাস জারি যে ইসলাম মানেই নাস্তিক বিদ্বেষী বা ঘোরতর ভাবে নাস্তিকতা বিরোধী ধর্ম। এই ধারণা ইসলামী চিন্তাচেতনাসম্পন্ন ব্যাক্তি, এমনকি প্রাজ্ঞ আলেম ওলামাদের মধ্যেও দেখা যায়। কেন এই ধারণা দানা বেঁধেছে সেটা এক বিস্ময় বটে। এ নিয়ে ভিন্ন গবেষণার দরকার আছে। অথচ দর্শনের পরিমণ্ডলে দাঁড়িয়ে বিচার করলে নাস্তিকতা ইসলামের গুরুতর কোন সমস্যা মোটেও নয়। একত্ববাদী অন্য ধর্মের সমস্যা হতে পারে। বরং ইসলাম ঘোরতর ভাবে যার বিরোধী তা হচ্ছে শেরেকি, নাস্তিকতা নয়। অর্থাৎ যিনি নিরন্তর গায়েব এবং দেশকালের অতীত বা সততই দেশকালের বাইরে অধরা, তাঁকে বস্তুজ্ঞানে ‘আছে’ কিম্বা ‘নাই’ হিসাবে বিচার করার ঘোর বিরোধী ইসলাম। শুধু তাই নয় এই এক বা অদ্বৈতকে কোন কিছুর সঙ্গে তুলনা করা ইসলাম একদমই বরদাশত করে না। যে কারণে শুধু দেশকালের অধীন বস্তুর সঙ্গে তুলনা নয়, আল্লাকে বুদ্ধির বিষয় বা বুদ্ধির নির্ণয়ে পর্যবসিত করাও ইসলাম শেরেকি হিসাবে বিবেচনা করে, কিম্বা করতে বাধ্য। এর বিরুদ্ধ ইসলামের দার্শনিক লড়াই অনিবার্য ও অপরিহার্য।

আল্লা নাই, এটা ইসলামের দিক থেকে মূর্খতা বা বেয়াদপি, কিন্তু বিরাট কোন অপরাধ নয়। কারণ আল্লাহ যে আকাশ, বাতাস, গাছপালা, পাথর, পাহাড় ইত্যাকার কোন বস্তু বা ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ সত্য হিসাবে ‘নাই’ এটা কোন নতুন কথা না। উপলব্ধির স্তরভেদে মানুষ এই অজ্ঞানতা কাটিয়ে উঠতে পারে, নিজের আত্মবিকাশ নিজেই ঘটাতে পারে। তবে শেরেকি কাটিয়ে উঠতে হলে খোদ চিন্তার পদ্ধতির মধ্যে পরিবর্তন আনা জরুরী। ইসলামের দাবি এখানে।

নাস্তিকতা তখনই শেরেকি হয়ে ওঠে যখন আল্লার সঙ্গে কোন কিছুর তুলনা নিষিদ্ধ করার কথা বললেও– অর্থাৎ চিন্তাকে এই স্তরে অধঃপতিত না করার জন্য কঠোর ভাবে সাবধান করা সত্ত্বেও আর দশটা বস্তুকে আমরা যেভাবে ‘আছে’ কিম্বা ‘নাই’ বলি, আল্লাকেও সেইসকল বস্তুর মতোই দেশকালে হাজির একটি সত্তা গণ্য করা হয়; আল্লাকে বস্তুর গুণসম্পন্ন গণ্য করে ‘আছে’ কিম্বা ‘নাই-ইয়ের তর্কে আমরা জড়িয়ে পড়ি। খেয়াল করতে হবে নাস্তিক ও আস্তিক উভয়েই এই ভুল করে। অর্থাৎ শেরেকি শুধু নাস্তিকদের সমস্যা নয়, আস্তিকদেরও অজ্ঞানতা। শেরেকি সম্পর্কে ইসলামের কঠোর অবস্থান জানার পরেও আল্লাহকে বস্তু হিসাবে গণ্য করার এবং তিনি সামনে না থাকলেও আসমানে কোথাও বস্তুর মতোই আসীন আছেন -- এই ধারণা ধর্ম বিশ্বাসীদের মধ্যে প্রবল। চিন্তার এই প্রাথমিক কিম্বা সাধারণ স্তর অতিক্রম করা আসলে কঠিন। কিন্তু ইসলাম এই কঠিনকে জয় করবারই নির্দেশ দেয়। যে কারনে ইসলাম শেরেকির প্রতি যতোটা কঠোর নাস্তিকতার প্রতি ততোটা নয়। আল্লাকে বস্তুজ্ঞান করে বস্তু হিসাবে জগতে আবিষ্কার করতে না পেরে 'নাস্তিক' হওয়ার  মধ্যে অজ্ঞানতা বা জাহেলী আছে, কিন্তু সেটা শেরেকির অপরাধ নয়, সে কারণে শেরেকির তুলনায় নাস্তিকতা ইসলামের জন্য গৌণ ইস্যু।

দর্শনের ভাষায় ইসলাম ‘আল্লা’ নামচিহ্নে যাঁর দিকে রুকু নির্ণয় করে বা তার চিন্তা, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, সংকল্প, প্রতিজ্ঞা ইত্যাদিকে ধাবিত করে তিনি নিরন্তর গায়েব বা অনুপস্থিত। ফলে আল্লাহকে বস্তু জ্ঞান করে তাঁর সত্তা সম্পর্কে ‘আছে’ বা ‘নাই’ বলা যায় না। এতে আল্লাকে বস্তুর সঙ্গে তুলনা করা হয় । যারা তা করে তারা আদতে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়, কারণ শেরেকি ইসলামে ঘোরতর ভাবে নিষিদ্ধ। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রত্যক্ষ বস্তুতে বা চিন্তা, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, সংকল্প, প্রতিজ্ঞা ইত্যাদির ‘বিষয়’ হিসাবে নিরন্তর গায়েবকে পর্যবসিত করা ইসলামের দিক থেকে ক্ষমার অযোগ্য কুফরি বা অজ্ঞানতা।

শেরেকির ধারণা বিচার করলে বোঝা যায় ইসলামের বিচরণ চিন্তার অনেক  গভীর স্তরে। সজীব ও সক্রিয় চিন্তার পদ্ধতি হিসাবে ইসলাম নেতি বা না-বাচক মুহূর্তকে অস্বীকার করে না। এটা আমরা আর কিভাবে বুঝব? এটা বুঝব কলেমার বিচার করলে। ইসলামের কলেমা শুরু হয় নাস্তির ঘোষনা দিয়ে। অর্থাৎ ‘লা ইলাহা’ বা আল্লাহ নাই – এই ঘোষণার মাধ্যমে। কারণ নাস্তি বা ‘ নাফি’ ছাড়া ‘এজবাত’ হয় না, অর্থাৎ আল্লাহ নাই এই ঘোষণা ছাড়া এরপর ইল্লালাহ্‌ -- বলবার শর্ত তৈরী হয় না। যেসকল বস্তু বা বিষয় এ যাবতকাল ‘আছে’ বলে আমরা জানি বা জেনে এসেছি এরা কোন অবস্থাতেই আল্লার সমতুল্য নয়, কারণ আল্লা ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষ বস্ত নন, কিম্বা আল্লা নামচিহ্নে যে সকল ধারণা আমরা অজ্ঞানতাবশে কিম্বা অভ্যাসের অনুবর্তী হয়ে ধারণ করি সেই ধরণের আল্লা ‘নাই’ ঘোষণা দেওয়া ইসলামে জরুরী। এই নেতিবাচক ঘোষণার মধ্য দিয়েই ইসলামের ইমান নিজের রুকু নির্ধারণ বা নির্ণয় করে। একই সঙ্গে তার আগের কিম্বা পরের সকল প্রকার একত্ববাদ থেকে ইসলাম আলাদা হয়ে যায়। যে আল্লার উপাসনা মানুষের উচিত বলে ইসলাম মনে করে তার সঙ্গে প্রথাগত ভাবে বা অভ্যাস বশে আমরা যে 'আল্লা'র ধারণা বহন করি তা একদমই এক না। এ কারণে প্রথাগত অর্থে আমরা ধর্মে ‘বিশ্বাস’ বলতে যা বুঝি, ইসলামে ‘ইমান’ ধারণাটিকে সেভাবে অনুবাদ করা যায় না। আল্লায় ‘বিশ্বাস’ মানে অন্যান্য বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে যেভাবে আমরা ‘আছে’ বলি, ইসলামের আল্লা সম্পর্কে সেভাবে ‘আছে’ বলা যায় না, কিম্বা আল্লাহকে সেইরকম বস্তুগুণ সম্পন্ন সত্তা হিসাবে 'আছে' জ্ঞান করে ‘বিশ্বাস’ করা যায় না। ইসলাম মানুষের চিন্তার পদ্ধতি ও ব্যাকরণ বদলাবার দাবি করে। দর্শনের দিক থেকে এই দাবি একটি বৈপ্লবিক ঘটনা।

অনেকে 'ইলাহ'কে আল্লাহ অনুবাদ করায় অস্বস্তি বোধ করেন। এই অস্বস্তি অসঙ্গত নয়। এই অস্বস্তির উৎপত্তি এক প্রকার ইতিবাচক উপলব্ধি থেকে তৈরি হয়, যা স্বাভাবিক বা স্বতঃস্ফুর্ত। অর্থাৎ ইসলাম যে 'আল্লাহ'কে মানুষের উপাস্য বলে দাবি করে তা  প্রচলিত কোন  'ইলাহ' বা প্রচলিত 'প্রভু' নয়, এই  উপলব্ধিই অস্বস্তির কারণ। যে কারণে তাঁরা মনে করেন এই অস্বস্তির মীমাংসার জন্য  'ইলাহ' আর 'আল্লাহ' কে সমার্থক জ্ঞান করা যাবে না। 'লা ইলাহা'কে 'আল্লা নাই' অনুবাদ করায় তাঁরা অস্বস্তি বোধ করতে পারেন।  স্বস্তি বোধের জন্য 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর  অনুবাদ  'আল্লা ছাড়া বা আল্লাহ ব্যাতীত কোন প্রভু নাই' -- তাঁরা এভাবেই অনুবাদ করেন।  ভাষার পার্থক্য বজায় রেখে ইসলামের আল্লার ধারণার পার্থক্য এ যাবতকাল এভাবেই অস্পষ্ট ভাবে বোঝানো হয়েছে।  চিন্তা বা দর্শনের দিকে থেকে ইসলামের 'আল্লাহ' ধারণার বৈশিষ্ট্য ও বিশেষ তাৎপর্য এতে স্পষ্ট হয় না। যেসকল বস্তু বা বিষয় এ যাবতকাল ‘আছে’ বলে আমরা জানি বা জেনে এসেছি তারা যে কোন অবস্থাতেই আল্লার সমতুল্য নয়, সেই ধারণা অস্পষ্ট থেকে যায়। কারণ আল্লা ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষ বস্তু নন। অতএব আল্লা নামচিহ্নে যে সকল ধারণা আমরা অজ্ঞানতাবশে কিম্বা অভ্যাসের অনুবর্তী হয়ে ধারণ করি সেই ধরণের আল্লা ‘নাই’ ঘোষণা দেওয়া ইসলামে জরুরী। এই তাগিদ শেরেকি থেকে মুক্ত থাকার তাগিদ থেকে জাত।

এই ক্ষেত্রে ঘাটতি ঘটলে দর্শনের দিক থেকে মুশকিল ঘটে।  ইসলামের বৈপ্লবিক প্রস্তাবনা এতে অস্পষ্ট এবং অপরিচ্ছন্ন হয়ে যায়। মূল উদ্দেশ্য শেষমেষ সাধিত হয় না। আল্লাহ যে ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ বস্তু -- এমনি বুদ্ধিরও 'বিষয়' নন সেই সত্য উপলব্ধির ক্ষেত্রে এই অনুবাদ আমাদের বিশেষ কোন সহায়তা করে না। বরং 'আল্লাহ' নামচিহ্নের অধীনে আমরা পুরানা ও প্রথাগত চিন্তার গহ্বরেই থেকে যাই। যেমন, আল্লাহ দৃশ্যমান না হলেও ভাবি আসমানে কোথাও গ্রহ নক্ষত্রের মতো তিনি দেশকালে আছেন। শেরেকির ছায়া আমাদের পেছনে পেছনে ঘুরতে থাকে। শেরেকির প্রশ্নকে আল্লার  ধারণা থেকে আমরা আলাদা ভাবে বিচার করি, যা আমাদের প্রাক-ইসলামি চিন্তা ও অভ্যাসের যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। দর্শনে মূল তর্ক হচ্ছে 'আছে' কিম্বা 'নাই' গুণ আল্লার ধারণা প্রকাশের জন্য সঙ্গত কিনা।  দ্বিতীয়ত 'আল্লাহ' ভাষার একটি চিহ্ন মাত্র, যা আমাদের সকল বৃত্তিকে একটি সত্য  উপলব্ধির প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। সেই সত্য আর আক্ষরিক 'আল্লাহ' নামও সমার্থক  নয়। সেটা অক্ষরের সমষ্টি, নাম বা চিহ্ন মাত্র। এখন  'নামচিহ্ন' তো নিজে আল্লাহ হতে পারে না। নামচিহ্নকে আল্লাহ হিসাবে গণ্য করার শেরেকি অজ্ঞানতাবশে হরদমই আমরা করি। ওতএব  ইলাহকে আল্লাহ অনুবাদ করব কিনা সেই তর্ক আক্ষরিক বা ভাষাতাত্ত্বিক পরিমণ্ডলের তর্ক নয়। শেরেকির প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে ইসলামে আল্লাহ নিয়ে কোন ধারণার আলোচনা চলে না। দর্শ্ন এই দিকটির উপরই জোর দেবে।

দর্শনের দিক থেকে কলেমার গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ ‘আছে’ গণ্য করে ইসলাম আরম্ভ করে না, কোন কিছুই তাঁর সমতুল্য বা তাঁর সঙ্গে তুলনীয় নয় -- নিখিল নাস্তির অভূতপূর্ব ঘোষণা দিয়ে ইসলাম শুরু করে। এতোকাল মানুষের ইতিহাস ‘আল্লা’ নামচিহ্নের অধীনে যে সকল সত্তা বা বিষয়কে ভেবেছে নিখিল নাস্তি শুরুতেই তা অস্বীকার করে আরম্ভ করে। ‘আল্লা নাই, কিন্তু আছে’ এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইসলাম যে-আল্লার ‘এজবাত’ নিশ্চিত করে, তাঁকে বর্তমান করে তোলার চিন্তা ও রাজনীতি মানবেতিহাসে নতুন প্রস্তাব। এই প্রস্তাব আজ অবধি মানুষের চিন্তা আত্মস্থ করা দূরের কথা আদৌ পুরাপুরি বুঝে উঠতে পেরেছে কিনা সন্দেহ।  একালের দর্শনের দিক থেকে তা অতিশয় গভীর ও গুরুতর জিজ্ঞাসা হয়ে এখন আবার ফিরে এসেছে।

 

পাশ্চাত্যে ধর্ম ও চিন্তার ইতিহাসের আরম্ভ আস্তিকতায়, কিন্তু পরিণতি নাস্তি বা নাস্তিকতায়। ইসলামের শুরু নাস্তিকতায় – অথচ পরিণতি সম্পূর্ণ নতুন ধরণের আস্তিকতায়, যার নজির অতীতে নাই। ‘আছে’ বা ‘আছি’ বলে আমরা যেভাবে জীবন ও জগতকে বুঝি তাকে প্রশ্ন বা অস্বীকার করেই তার আরম্ভ, অথচ ইসলাম যা কায়েম করতে চায় তা হচ্ছে তৌহিদ, বা সেই সর্বব্যাপী বর্তমানতা, নিরন্তর গায়েব হয়েও সর্বত্র ও সর্বকালে যিনি হাজির থাকেন: লা ইলাহা ইল্লালাহ। অতএব নাস্তিকতার ঘোষণা নতুন ধরণের আস্তিকতার উদ্বোধন ঘটায়। এই উদ্বোধন ঘটানো ইসলামে জরুরী।

আরও বলি, ইসলামে বোঝার দিকটা অন্যত্র। যে ঘোষণার শুরু নাস্তিকতায় তার অভিমুখ বা রুকু আল্লার প্রতি – অর্থাৎ আস্তিকতায়। পাশ্চাত্যের শুরু তার বিপরীতে। তার শুরু আস্তিকতায় কিন্তু তার পরিসমাপ্তি ঘটছে নাস্তিকতায়, নিহিলিজমে। পাশ্চাত্য ‘আছে’ বা ‘আছি’ কথাটির অর্থ বোঝার জন্য দর্শনে এখন পেরেশান হয়ে যাচ্ছে। পাশ্চাত্যের চিন্তার সংকট এখন অনেক প্রকট ও দৃশ্যমান। এর সমাধান পাশ্চাত্য চিন্তার চরিত্র বা বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আছে কিনা সন্দেহ। কিনতি সেই সনহকট সমাধানের ক্ষেত্রে ইসলাম কোন ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা সে সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হতে পারি না, কারণ সজীব ও সক্রিয় চিন্তার অভ্যন্তর থেকে ইসিলাম তার প্রস্তাবনা নিয়ে ভাবতে ও পর্যালোচনা করতে সক্ষম কিনা তার কোন সুষ্পষ্ট প্রমাণ আমাদের কাছে নাই। তারপরও বলা যায়, কলেমার সংক্ষিপ্ত ভাবটুকু বুঝতে পারলে সজীব ও সক্রিয় চিন্তার অভিমুখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে আগামি দিনে ইসলামের সম্ভাব্য নির্ধারক ভূমিকা সম্পর্কে কিছুটা আন্দাজ আমরা করতে পারব। তবে আপাতত বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে ইসলামকে নাস্তিকতা সম্পর্কে লেকচার দিয়ে কোন লাভ নাই।

আল্লাহ দেশকালের অধীন কোন ধারণা নয়, ফলে বস্তুর মতো তিনি অস্তিত্বমান নন। তিনি সর্বদাই গায়েব অথচ তিনি ‘নাই’ হয়েও -- নিরন্তর মানুষের কাছে গায়েব থেকেও -- আছেন। এটা কি করে সম্ভব? সম্ভব এ কারণে যে – বস্তুর ‘আছে’ গুণ যে কারণে দেশকালের অধীন বস্তুর গুণ হিসাবে আমরা ব্যবহার করি তেমনি ‘নাই’ কথাটাও দেশকালাধীন বস্তুর অনুপস্থিতি ব্যক্ত করবার জন্যই আমরা বলি। তাই তিনি গায়েব বললে আমরা তাঁকে বস্তু জ্ঞান করে ‘নাই’ বলে ভাবতে শুরু করি। অর্থাৎ গায়েব থেকেও কিভাবে বিরাজ করেন, কিভাবে বর্তমান থাকেন সেটা সহজে বুঝতে পারি না।  বিরাজমানতা বা বর্তমানতার এই ধারণা তৌহিদের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ যিনি সর্বব্যাপী, অথচ গায়েব। এতোটুকু আমরা বুঝতে পারছি যে আল্লাহকে বস্তু গণ্য করবার ভুল করি বলেই তাঁর সম্পর্কে ‘আছে’ বা ‘নাই’য়ের তর্ক আমরা তুলি। ইসলামে আস্তিকতা/নাস্তিকতার তর্ক এতো সরল বিষয় নয়। এই জাহেলি বা অজ্ঞতা নিয়ে ইসলামের আল্লাকে বোঝা অসম্ভবই বটে। এই অজ্ঞতা সম্পর্কেই ফকির লালন শাহের বিখ্যাত একটি পদ রয়েছে। তিনি বলছেন:

“নফি এজবাত যে জানে না
মিছেরে তার পড়াশোনা
লালন কয় ভেদ-উপাসনা
    না জেনে চটকে মারে”।

যারা প্রথমে ‘লা ইলাহা’ এবং পরে ‘ইল্লাল্লাহ’ বলবার ভেদ বোঝে না কিম্বা এই পার্থক্য নিরূপনের মর্ম বোঝে না তারা ধর্মের নামে চটকদারি করে বেড়ায়। ‘আছে’ ও ‘নাই’য়ের ভেদবিচার ছাড়া আল্লাকে বোঝা অসম্ভব। যারা এই ভেদবিচার করতে অক্ষম তারা আল্লার কিতাব পড়ে কি করবে? তারা তো কোরানুল করিম পড়ে কিছুই বুঝবে না। ধর্মের পর্যালোচনা আমাদের চিন্তার নতুন দিগন্ত রেখা উন্মোচনে কিভাবে সহায়ক হয় আশা করি ওপরের আলোচনায় তার কিছুটা নজির তুলে ধরতে পেরেছি।

ফয়েরবাখের নাস্তিকতা নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে নফি ও এজবাত সম্পর্কে এই ভূমিকাটুকু জরুরী ছিল। ফয়েরবাখ সম্পর্কে আলোচনার পর আমরা বিচার করব ফয়েরবাখের কারণে পাশ্চাত্য দর্শনে নাস্তিকতার কিম্বা আস্তিকতার প্রতি দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গীর কোন গুণগত পরিবর্তন ঘটল কিনা। সে আলোচনা সংক্ষেপ রাখার প্রয়োজনে আমরা কার্ল মার্কসকে কেন্দ্র করেই করব। বাংলাদেশের জন্য সেটাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হবে বলে মনে হয়। দর্শন যদি ধর্মের বিষয় নিয়েই কারবার করে তাহলে এটা অনুমান করা যায় যে হেগেলের দিক থেকে ধর্ম-পর্যালোচনার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ধর্মের বিষয়কে দর্শনে আত্মস্থ ও মোকাবিলা করা। ফয়েরবাখের প্রধান নালিশ এখানেই যে হেগেল ধর্মকে চিন্তার গৌরবটুকু দিতে গিয়ে, দর্শনকে ধর্মে পরিণত করে ফেলেছেন। পাশ্চাত্যের এই তর্ক বিবেচনার মধ্যে আনা আমাদের জন্য জরুরী। প্রথমত, ধর্মের বিষয় আর দর্শনের বিষয় একই – হেগেলের এই দাবির প্রতি আমাদের সায় আছে। কিন্তু হেগেল কথাটি যেভাবে বলেছেন সেটা যেমন আমাদের বুঝতে হবে, তেমনি তার পর্যালোচনাও করা জরুরী। নইলে ইসলাম প্রসঙ্গে পর্যালোচনার অভিমুখ নির্দেশ অসম্পূর্ণ থাকবে। হেগেলকে ফয়েরবাখ যেভাবে সমালোচনা করেছেন তার ফলে ইসলামের দার্শনিক পাঠ আমাদের নতুন কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে কিনা – সেই দিকটাও আমরা আরও সতর্ক ভাবে বিবেচনা করবো। এর মধ্য দিয়ে চিন্তার বৈশ্বিক দিগন্তের বাইরে নয়, কিম্বা প্রাচ্য বনাম পাশ্চাত্য চিন্তার অনড় বাইনারি বা নিত্য বিরোধ অনুমান করে নয় – বরং চিন্তার নিজস্ব শক্তি মানুষের স্বভাব হিসাবে আমাদের সবার মধ্যে যেভাবে বিরাজ করে চিন্তার সেই স্বভাব ও নিজের প্রণীত দিগন্তের অভ্যন্তর থেকেই ইসলাম নিয়ে আমাদের আলোচনা ও পর্যালোচনার অভিমুখ নির্দেশ করা আমাদের জন্য সহজ হবে। আগামি বিশ্ব ইতিহাস নির্মাণে ইসলামের আদৌ যদি কোন হিম্মত থেকে থাকে তাহলে বিশ্বব্যাপী চিন্তার বিদ্যমান অবস্থা – তার সংকট ও স্ববিরোধিতা অতিক্রম করে যাবার সম্ভাবনা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে আমরা ইসলামের সম্ভাবনা আগাম আন্দাজ করতে পারব।

২৩ অগাস্ট ২০১৫। ৮ভাদ্র ১৪২২। শ্যামলী

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  

View: 2066 Leave comments (0) Bookmark and Share


Go Back To Arts & Culture
EMAIL
PASSWORD