‘বুর্জোয়া’


ফরহাদ মজহার || Friday 23 June 17

আমরা ‘বুর্জোয়া’ বুঝি কি?

বামপন্থায়, তবে বিশেষ ভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনে, একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হচ্ছে ‘বুর্জোয়া’। শ্রেণি রাজনীতি যারা করেন তাদের কাছে এই শব্দটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আমরা তরুণ বয়সে যখন কমিউনিস্ট রাজনীতিতে দীক্ষা নেই তখন শব্দটার প্রতি আমাদের আকর্ষণ ছিল প্রবল। শব্দটি মনের মধ্যে প্রচণ্ড শত্রু শত্রু ভাব জাগাতো কারন এর বিরুদ্ধেই শ্রমিক শ্রেণি বা কমিউনিস্ট ভাষায় ‘প্রলিতারিয়েত’কে লড়ে বিপ্লব করতে হবে। শব্দটার প্রতি প্রবল আকর্ষণ থাকলেও রহস্যে টইটুম্বুর এই বিদেশি শব্দের আসল মানে আমরা সেকালে ততো জানতাম না। ‘বুর্জোয়া’ বলতে আমরা ধনি বা বড়লোক বুঝতাম। এর দ্বারা সমাজের শোষক শ্রেণিকে বোঝানো হচ্ছে সেটা বুঝতাম বটে, কিন্তু বুর্জোয়া শ্রেণির ঐতিহাসিক আবির্ভাব এবং ইতিহাসে তার বৈপ্লবিক ভূমিকার তাৎপর্য তখন পুরাপুরি স্পষ্ট হয় নি। ‘বুর্জোয়া’ একটি নিন্দাবাচক শব্দ হিসাবেই আমরা জেনেছি, বুঝেছি এবং কাউকে গালি দেবার জন্য ব্যবহার করেছি।

বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে আরেকটি ঘাটতি ছিল। এই শব্দটির মধ্যে স্বাধীন ‘ব্যক্তি’র ধারণা নিহিত রয়েছে সেটা আমরা জানতাম না। বুর্জোয়া শ্রেণির আবির্ভাব মানে সামন্ত বা বিভিন্ন প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক শৃংখল ভেঙে এমন এক অর্থনৈতিক শ্রেণির আবির্ভাব চেতনাগত ভাবে সেটা একই সঙ্গে ‘ব্যক্তি’র আবির্ভাবও বটে। এই গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্যটুকু বুঝে উঠতে পারা কঠিন ছিল। অর্থাৎ ইতিহাসে এমন এক কর্তাশক্তির আবির্ভাব ঘটল যে নিজেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণ্য করে। মনে পুষিয়ে রাখা শত্রু শত্রু ভাবের জন্য ‘বুর্জোয়াকে’ ঘৃণা করতে হবে, এটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যারামে পরিণত হয়েছিল। এই মানসিক বাধা অতিক্রম করে মার্কস বলা সত্ত্বেও ‘বুর্জোয়া’ ও ‘বুর্জোয়া শ্রেণি’কে ঐতিহাসিক ভাবে বোঝার পদ্ধতি আমরা রপ্ত করি নি। শেখাবার মতো কাউকে পাই নি। কমরেডদের কাছ থেকে এতোটুকুই বুঝতাম যে ‘ধনি’ বা ‘বড়লোক’ শ্রেণিকে বোঝাতেই ‘বুর্জোয়া’ কথাটার ব্যবহার। আমরা সেভাবেই অর্থ করতাম। এ থেকেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত টানতাম, কমিউনিস্টদের লড়াই ধনিদের বিরুদ্ধে। তো তারা খারাপ, আমরা ভালো। নৈতিক দিক থেকে এটা খুব আরামের আর নিজেকে এর জন্য খুব উচ্চস্তরের আদর্শবান মনে হোত। সেই নৈতিক আদর্শের জন্য আমরা জান দিতে তৈরি ছিলাম। অনেকে দিয়েছেনও বটে। শোষিত নিপীড়িত মজলুম জনগণের প্রতি তাঁদের নৈতিক পক্ষপাত অমূল্য। তাঁদের অবদানকে খাটো করবার কোন সুযোগ নাই। কিন্তু বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন ব্যর্থ হোল কেন সেটা বুঝতে হলে ধনি ও ধনিক শ্রেণির বিরুদ্ধে বাস্তবোচিত ঐতিহাসিক অবস্থান নেওয়া আর নিজেকে অতি নীতিবান আদর্শবাদী জ্ঞান করে নৈতিক যুক্তিতে ‘অপর’কে ঘৃণার চর্চা যে এক নয় সেটা আমাদের বুঝতে হবে। কমিউনিজমে নীতি আছে, কিন্তু সেটা ইতিহাস ও বাস্তবতার বাইরে বিমূর্ত ও মনগড়া চর্চা নয়। ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ আমরা কথায় কথায় আউড়াই বটে, কিন্তু সেটা নৈতিক আদর্শবাদের অধিক কিছু নয়। এই চরম সত্য বুঝতে অনেক রক্তক্ষয় হয়েছে। এই চর্চার ধারাবাহিকতা এখনও বাংলাদেশে তীব্র মাত্রায় রয়েছে। অনৈতিহাসিক নৈতিক আদর্শবাদ থেকে অপরকে ঘৃণার রাজনীতি পুষ্টি পায়-- সেই নীতি নৈতিকতা ধর্ম থেকে হোক, কিম্বা হোক ধর্মের বাইরে সেকুলার চিন্তাভাবনার পরিমণ্ডলে। বাস্তবে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে সকল দ্বন্দ্ব বা সংঘাত তৈরি হয় তা মীমাংসার রাজনীতি গড়ে উঠতে পারে না। ঘৃণা চর্চা ইতিহাস অজ্ঞ ও বাস্তবতা বর্জিত অবিকশিত ‘পেটি বুর্জোয়া’ বা বঙ্গীয় মধ্যবিত্তের শ্রেণি চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

নৈতিক ঘৃণাকে অযৌক্তিক বা মিথ্যা ভাববারও কোন কারন নাই। বাংলাদেশে এখনকার ধনিক শ্রেণির লুটতরাজ, ডাকাতি ও লুম্পেন চরিত্র দেখে ধনি শ্রেণিকে ঘৃণা ছাড়া ভালবাসা কঠিন বটে। মাত্রায়, চরিত্রে ও বৈশিষ্ট্যে আমাদের সময়কালের ধনিদের সঙ্গে এখনকার ধনিদের দের পার্থক্য আছে, কিন্তু ঘৃণা কবার মতো যথেষ্ট গুণ তাদেরও বর্তমান ছিল। কর্তব্য হচ্ছে নৈতিক ঘৃণাকে ঘৃণার রাজনীতিতে পর্যবসিত না করে তাকে বাস্তব ইতিহাসের বাস্তব দ্বন্দ্ব-সংঘাত মীমাংসার অভিমুখে প্রবাহিত করতে পারা। তাকে রাজনৈতিক কর্তাসত্তায় রূপান্তর ঘটানো। এই কাজে আমরা আগেও ব্যর্থ হয়েছি, এখনও সফল হবার সম্ভাবনা দেখছি না। নৈতিক শক্তিকে ঐতিহাসিক রূপান্তরের কর্তাশক্তিতে পরিণত করা কঠিন তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশ্ন।

বড়লোক বা ধনি শ্রেণির প্রতি ন্যায়সঙ্গত বিদ্বেষ থাকে বলেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির বৃহৎ একট অংশ প্রগতিশীলতার নামে ধনীদের বিরুদ্ধে একটা বিমূর্ত নৈতিক অবস্থান নিয়ে রাজনীতি করে। কমিউনিস্ট আন্দোলন লুটতরাজ ও লুন্ঠনের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থানকে অস্বীকার করে না। নিপীড়িত শ্রমিক, কৃষক ও গরিবের দিক থেকে দেখলে একে অস্বীকার করবার কোন প্রশ্নই আসে না। তবে কাজ হচ্ছে বাস্তব অবস্থাকে বাস্তব বৈশিষ্ট্য হিসাবে বুঝতে সহায়তা করা। শ্রমিক কৃষক সর্বহারাকে যেমন, তেমনি নৈতিক তাগিদে মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে রাজনীতিতে আসা তরুণ বিপ্লবীদেরও সামগ্রিক ভাবে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক ও ব্যবস্থার সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া ও সচেতন করাই কমিউনিস্টদের কাজ।

আরেকটি শব্দ হচ্ছে ‘প্রলিতারিয়েত’। এর অর্থ করা হোত শ্রমিক শ্রেণি। ‘বুর্জোয়া’ শব্দটির মতো এই ধারণাটিকে নিয়েও আমরা বিপাকে পড়তাম। যদি ‘বুর্জোয়া’ মানে ধনিক শ্রেণি আর প্রলিতারিয়েত মানে শ্রমিক হয়, তাহলে সেভাবে বললেই তো সহজ হয়, আলাদা করে শব্দ দুটি জারি রাখবার কি দরকার? নাকি ‘বুর্জোয়া’ ও ‘প্রলিতারিয়েত’-এর এমন কিছু অতিরিক্ত অর্থ বা তাৎপর্য আছে যাকে কেবল মাত্র অর্থনৈতিক বর্গে নিষ্পন্ন করলে আসল মানে হারিয়ে যায়। ব্যবহারিকভাবে যাদের আমরা বাংলাদেশে কমিউনিস্ট হিসাবে পেয়েছি তারা সাধারণত এই সকল গুরুত্বপূর্ণ শব্দকে কেবলই অর্থনৈতিক ক্যাটাগরির জায়গা থেকেই মানে করে থাকেন। তাদের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক পরে নিষ্ঠার সঙ্গে কার্ল মার্কস পড়ে বুঝেছি।

তবে সেই সময় টের পেতাম ‘বুর্জোয়া’ মানে স্রেফ ধনি না, আর ‘প্রলিতারিয়েত’ মানেও নিছক শ্রমিক না। ছাত্রাবস্থায় এ নিয়ে আমরা তর্ক করেছি, কিন্তু ফয়সালা করতে পেরেছি তা হলফ করে বলতে পারব না। মার্কস, লেনিন বা মাওজে দং কিভাবে মানুষের জীবনের বৈষয়িক অবস্থা এবং চেতনাগত অবস্থার ফারাক কিম্বা মিল বিচার করতেন এবং তার ভিত্তিতে বিপ্লবী রণনীতি ও রণকৌশলের ব্যবহার করেছেন সে ব্যাপারে সত্তর দশক অবধি বাংলাদেশে কোন স্পষ্ট ধারণা বামপন্থিদের ছিল না। তাদের লেখালিখি বইপত্রই তার প্রমাণ।

তখন মার্কস বা লেনিনের বই সহজে পাওয়া যেত না। প্রগতি প্রকাশনীর কিছু অনুবাদ পাওয়া যেত, চিনাদেরও নিজস্ব অনুবাদের কিছু কিছু বই ছিল। কিন্তু এই ধরণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসার জন্য যে ধরণের মৌলিক বইপত্র হাতের কাছে থাকার দরকার, আমাদের তা ছিল না। ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি পুরা ষাট থেকে সত্তর দশক পর্যন্ত এই দেশের ‘প্রগতিশীল’ বা ‘কমিউনিস্ট’ আন্দোলন বলতে বুঝত গরীবের হয়ে ধনি বা বড়লোকদের বিরুদ্ধে লড়াই। বঞ্চিত মানুষদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা। বিপ্লবের অর্থ ছিল শ্রমিক গরিব সর্বহারার পক্ষে ক্ষমতা ‘দখল’ করে সবাইকে ‘সম্পদ সমান ভাবে বিতরণ’। ‘সাম্যবাদ’ কায়েম। উৎপাদন ব্যবস্থা, উৎপাদন সম্পর্ক ইত্যাদি ব্যাখ্যার মূল ভারকেন্দ্র ছিল কিভাবে ধনিক শ্রেণি রাষ্ট্রকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। কিভাবে শ্রমিক কৃষকদের ন্যায্য পাওনা বা তাদের দ্বারা উৎপাদিত ‘উদ্বৃত্ত মুল্য’ শোষণ ও ব্যবহারের জন্য রাষ্ট্র ভূমিকা রাখে। কিভাবে রাষ্ট্র জনগণকে সর্বহারায় পরিণত করে, আর সমাজের সম্পদ ধনিদের হাতে পুঞ্জিভূত করে। ফলে শ্লোগান উঠত ‘এই রাষ্ট্র ভাঙতে হবে, এই রাষ্ট্র বুর্জোয়া রাষ্ট্র’। বিপ্লব মানে ‘শোষণহীন সমাজ’ কায়েম করা। ‘শোষণ’ না হয় কিছুটা ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা দ্বারা বোঝা যেত। কিন্তু ‘শোষণহীন সমাজ’ মানে কি? গরু না মহিষ ? তার কোন কুলকিনারা বোঝা যেত না।

কমিউনিস্টরা শ্রমিক হয়ে কারখানায় কাজ নিতো, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করতো, শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলত, ইত্যাদি। সেই ক্ষেত্রে তাদের আত্মত্যাগ ও নিষ্ঠা ছিল অপরিসীম। শ্রমিক আন্দোলন শুধু নয়, উনসত্তরের গণঅভ্যূত্থানে বামপন্থিদের গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক অবদান আছে। কিন্তু প্রগতিশীল আন্দোলন বলতে প্রধানত বোঝাত অর্থনৈতিক ভাবে যারা ধনি তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। কমিউনিস্টরা গরিবদের অর্থনৈতিক স্বার্থ আদায় করবার পার্টি; যেমন, অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান। সেই সুবিধা আদায়ের জন্য জনগণ কমিউনিস্টদের চাইতো বটে, কিন্তু রাজনীতির জন্য ভিড়ত সত্যকারের রাজনৈতিক দলের পেছনে। বাংলাদেশে স্বায়ত্ব শাসনের দাবির মধ্যে অর্থনৈতিক মর্ম আছে, কিন্তু সেটা একান্তই রাজনৈতিক দাবি। এই দাবি সামনে এনে আওয়ামী লীগ স্বায়ত্ব শাসন থেকে মুক্তিযদ্ধের কালপর্ব অবধি কিভাবে বৃহৎ জাতীয় দলে পরিণত হোল সেটা বুঝতে হলে অর্থনৈতিক স্বার্থ বনাম রাজনৈতিক চেতনার ফারাক বুঝতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাস থেকেই শেখা যায়। কমিউনিজমকে অনুবাদ করা হোত ‘সাম্যবাদ’। কিন্তু কোন অর্থে ও কিভাবে সেই সাম্য কায়েম হবে সে সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ধারণা ছিল না। অর্থনৈতিক শ্রেণিভেদের বিলোপ ঘটিয়ে সবাইকে সমাজে অর্থনৈতিক ভাবে একই কাতারে নিয়ে আসার অধিক কোন চিন্তা সেই সময় ছিল তার প্রমাণ দেওয়া কঠিন। কমিউনিজম সমাজের বৈষয়িক অসাম্য নিরসন করে অর্থনৈতিক ভাবে সবাইকে সমান মাত্রায় সম্পদশালী করবার অলীক প্রতিশ্রুতি হিসাবেই জারি ছিল।

শ্রেণি চেতনা?

প্রায়ই মুশকিল বাঁধত ‘শ্রেণি চেতনা’ নিয়ে। বামপন্থি ও কমিউনিস্ট(?) দের সবসময়ই‘চেতনা’ নিয়ে খুব বিব্রত হতে দেখেছি। শ্রেণি চেতনা অর্থনৈতিক স্বার্থ বোধের অধিক কিছু অর্থ বহন করতো না। অর্থনৈতিক ভাবে কেউ একজন শ্রমিক হতেই পারেন। তাহলে শ্রমিকের চেতনা মানে কি সেই বাস্তবের শ্রমিকের মন মানসিকতা? সর্বহারার চেতনা? গ্রামে জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব মানুষ যখন শহরের বস্তিতে এসে মাথাগোঁজার জন্য একটা ঘর বাঁধে সর্বহারার চেতনা কি তাদের সব হারাবার বেদনা ও ধনিদের বিরুদ্ধে ক্রোধ? শ্রমিক বা সর্বহারার চেতনা বলতে আসলে এটাই ছিল প্রধান চিন্তা । এই যুক্তিতে কমিউনিস্টদের কাজ হোত শ্রমিক বা সর্বহারার মধ্যে ধনিদের বিরুদ্ধে ক্রোধ আরও উসকে দেওয়া এবং কোন এক ‘বিপ্লবের’ মধ্য দিয়ে ধনিদের জমিজমা ধনসম্পত্তি দখল করে বঞ্চিতদের মধ্যে সমান ভাবে বিতরণ। জবরদস্তি সম্পত্তির মালিকানা বদল হল বিপ্লবের আসল কথা বলে বোঝানো হোত। সম্পত্তির মালিকদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সেই সম্পদ বঞ্চিত দের বিতরণ করা। ব্যাতিক্রম থাকতে পারে, কিন্তু শ্রমিক শ্রেণির চেতনা বলতে এর অধিক কিছু বোঝাত কিনা তা এখন সমাজতাত্ত্বিক গবেষনার বিষয়। সর্বহারা বা শ্রমিক শোষিত, নির্যাতীত ও বঞ্চিত; সেই বঞ্চনার চেতনাই শ্রমিকের চেতনা। শ্রমিকের চেতনার অর্থ বড়লোক বা ধনিকে ঘৃণা করা, তাদের সম্পত্তি একদিন জব্দ করে সবাইকে বিলিয়ে দেবার স্বপ্ন দেখা। বামপন্থি দলগুলোর কথাবার্তা কাজকর্ম, চলাফেরা জীবনযাপন সব কিছুর মধ্যেই তাদের এই ‘চেতনা’র প্রকাশ ঘটত।

কমিউনিস্ট্ হতে হলে সেই সময় জীবন যাপনে শ্রেণিচ্যুতির (de-class) কথা কমিউনিস্টরা বলতেন, নিজেরাও ধর্ম বিশ্বাসের মতো ত্যাগী বা সন্ন্যাসীর জীবনকে কমিউনিস্ট আদর্শ হিসবে মানতেন। এর প্রকোপ সেই সময় বাংলাদেশে বেশি হবার একটা বড় কারণ মনে করা হয় বাংলাদেশে যাদের হাত দিয়ে কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তাদের প্রায় অনেকেই ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে আসা ত্যাগ বা সন্ন্যাসব্রতকে উচ্চস্তরের নৈতিক আদর্শ হিসাবে গণ্য করতেন। ধর্মীয় ঐতিহ্য কমিউনিস্ট আন্দোলনেও মারাত্মক ছাপ ফেলেছিল। সন্নাসীর মতো ভোগের বদলে ত্যাগের জীবন আদর্শ মনে করা হত। অনেকে বৃটিশ বিরোধী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, ফলে পরমার্থিক উদ্দেশ্যে নিজেকে আত্মাহুতি দেওয়া কিম্বা আত্মত্যাগের আদর্শ জীবনের ব্রত হিসাবে তারা মানতেন। তাঁদের মিতাচারি সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবনের আত্মপরায়ন শক্তি অস্বীকার করবার জো নাই। সেই আড়ম্বরহীন জীবন তরুণদের অনুপ্রাণিত করতো। মনে করা হোত, এটাই কমিউনিস্ট হবার ছহি পথ।

কমিউনিজম ধনির বিরুদ্ধে সর্বহারার লড়াই। সর্বহারা শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়ত, কারণ ‘ব্যাক্তিগত সম্পত্তি’ আছে বলেই এক শ্রেণির মানুষ সম্পত্তির মালিক, আর বাকিরা সম্পত্তিহারা। এই ক্ষেত্রে কালপ্রিট হচ্ছে ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’। এই ছিল সরল ব্যাখ্যা। তাই বাংলাদেশে ‘কমিউনিজম’-এর প্রধান লক্ষ্য ছিল ‘ব্যাক্তিগত সম্পত্তি’র উৎখাত। বাংলাদেশে চালু ‘কমিউনিস্ট’ নামের আদর্শ এর অধিক ভাবতে অক্ষম ছিল। এখনও তার খুব একটা হেরফের হয় নি। যে কারনে ‘সমাজতন্ত্র’ কায়েম করতে চায় বলে যারা নিজেদের ‘কমিউনিস্ট’ দাবি করতেন কিম্বা এখনও করেন ধন, ধনোৎপাদন বা ধনির প্রতি তারা বিদ্বেষী; তাদের বিদ্বেষটাই প্রকট হয়ে ধরা পড়ে। বিদ্যমান পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক বা ব্যবস্থা ঠিক কিভাবে বাংলাদেশের বিকাশের প্রতিবন্ধক আর সেই সুনির্দিষ্ট প্রতিবন্ধকতা, সমস্যা বা বাধা কিভাবে আমাদের টপকাতে বা নিরসন করতে হবে তার বিশেষ ব্যাখ্যা সুনির্দিষ্ট ভাবে পাওয়া যায় না।

মধ্যবিত্ত শ্রেণি – যারা সর্বহারা ও ধনির মাঝখানে থেকে সবসময়ই আরও গরিব হয়ে যাবার ভয়ে ভীত থাকে তাদের ধনসম্পদ ও ধনি শ্রেণির প্রতি ঈর্ষা ও নেতিমূলক প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে পাশ্চাত্য দর্শনের সবচেয়ে বিকশিত ক্ষেত্র জার্মান ভাবাদর্শের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে কার্ল মার্কস ‘কমিউনিজম’কে যেভাবে ভেবেছিলেন তার সঙ্গে এই ধরণের মধ্যবিত্তসুলভ প্রতিক্রিয়ার সম্বন্ধ নাই বললেই চলে। তবে শ্রেণি চেতনা বা ইতিহাস চেতনা বলতে কার্ল মার্কস কি বুঝিয়েছিলেন তা নিয়ে তর্ক আছে। ব্যবহারিক রাজনীতিতে লেনিন বা মাও জে দং যেভাবে বুঝেছেন তা মার্কসের সঙ্গে কতোটা সঙ্গতিপূর্ণ সেইসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তর্ক আকারেই রয়ে গিয়েছে।

‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’র ওপর উদ্ধৃতি চিহ্ন দিয়েছি এ কারণে যে ‘ব্যাক্তিগত মালিকানা’ আর ‘ব্যাক্তিগত সম্পত্তি’ এক নয়। যদিও ইংরেজি Private Property-র অনুবাদ হিসাবে দুটোরই চল বাংলা ভাষায় আছে। আমাদের ছাত্রাবস্থায় এই দুটো ধারণা একই অর্থে ব্যবহার করা হোত। এখনও তার বিশেষ অন্যথা হয় না। নিজের ভোগের জন্য অনেক কিছুই আমার নিজের সম্পত্তি বলে বিবেচিত হতে পারে, কিন্তু সেই অধিকার উৎখাতের কথা কমিউনিজম বলে না। কমিউনিজম মানেই ব্যাক্তিগত সম্পত্তির – অর্থাৎ নিজের ভোগের জন্য ধার্য সম্পত্তির অধিকার থেকেও উৎখাত এটা কার্ল মার্কসের ভাষ্য নয়।
কমিউনিস্ট ইশতেহার এ ব্যাপারে পরিষ্কার: ‘‘সাধারণ ভাবে মালিকানার উচ্ছেদ নয়, বুর্জোয়া মালিকানার উচ্ছেদই কমিউনিজমের বৈশিষ্টসূচক দিক...। এই অর্থে কমিউনিস্টদের তত্ত্বকে এক কথায় প্রকাশ করা চলে: ব্যাক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ’ (প্রগতি প্রকশন ১৯৮৫ পৃ। ৪৩)। ব্যক্তিগত মালিকানা আর ব্যক্তিগত সম্পত্তি সমার্থক না।

অনেক কিছুই হয়তো একালে আর আগের মতো না। কিন্তু আমার মনে হয় না ধনি/নির্ধন অর্থনৈতিক বিভাজন এবং 'ব্যাক্তিগত সম্পত্তির উৎখাত'-এর বাইরে চিন্তার দিক থেকে বাংলাদেশের বামপন্থা খুব একটা অগ্রসর হতে পেরেছে। এর দোষ পুরাটা বাংলাদেশের বলা যাবে না। আন্তর্জাতিক পরিসরেও প্রধান প্রধান কমিউনিস্ট ধারার ব্যাখ্যা বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের তুলনায় খুব আলাদা ছিল তাও নয় কিন্তু। বিশেষত যে সকল ধারার সঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা সম্বন্ধ রাখতেন। বিপ্লবী শ্রেণি রাজনীতি নিজেও নানান সংকটের মধ্যে রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্ন কমিউনিস্ট আন্দোলনকে একটা চরে ঠেকিয়ে দিয়েছিল সেটা হোল বৈষয়িক অবস্থা মানুষের চেতনাকে নির্ধারণ করে নাকি চেতনা বৈষয়িক অবস্থার নির্ণায়ক? এই তর্কের চূড়ান্ত মীমাংসা হয়েছে বলে আমার জানা নাই। যদি বৈষয়িক অবস্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে চেতনার কোন ভূমিকা না থাকে তাহলে ইতিহাস সচেতন অগ্রসর চেতনা সম্পন্ন কমিউনিস্ট পার্টিরও বা কী দরকার? পার্টি কথাটার অর্থই হচ্ছে কোন না কোন চেতনা – অর্থাৎ মতাদর্শ, উদ্দেশ্য, ইচ্ছা, অভিপ্রায়, প্রতিজ্ঞা বা সংকল্প বাস্তবায়নের জন্য সংগঠিত তৎপরতা। যদি মানি যে পার্টি সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটাতে পারে, তাহলে এটাও মানতে হয় যে মানুষের চেতনা বৈষয়িক অবস্থার বদল বা রূপান্তর ঘটাতে সম্ভব। চেতনা অবশ্যই ঐতিহাসিক কর্তা হিসাবে ভূমিকা রাখতে পারে ও রাখে; বৈষয়িকতা যে অর্থে ইহলৌকিক এবং সত্য, ইতিহাসের কর্তাসত্তা হিসাবে চেতনাও ঠিক সেই অর্থেই বৈষয়িক ও সত্য। ঐতিহাসিক ভাবে তৈয়ার হওয়া মানুষের কর্তাসত্তার ইতিহাস বদলাবার কিম্বা মানবেতিহাসের বিশেষ অভিমুখ নির্ণয়ের ভূমিকা থাকে।

প্রশ্ন করার তাগিদ

প্রশ্নগুলো তুলছি রাজনৈতিক কর্তাসত্তা নতুন ভাবে নির্মাণের দরকারে। বিপ্লবী রাজনীতি সম্পর্কে প্রথাগত চিন্তা পাল্টানো জরুরি হয়ে পড়েছে। দর্শন বা চিন্তার ইতিহাস যে সকল গোড়ার প্রশ্ন তুলেছিলো তাকে এড়িয়ে যাবার কোন সুযোগ নাই। তার জন্য আমাদের নিজেদের অন্তর্গত বিপ্লবী কর্তাসত্তাকে সবসময়ই সজাগ রাখা জরুরী। দরকার সব কিছুকেই পর্যালোচনা করবার হিম্মত অর্জন এবং বর্তমানের করণীয় নির্ধারণ। তার জন্য নিজের চিন্তাকে শাণিত করা। চিন্তা যে সকল প্রশ্নের মুখোমুখি হয় তাকে ধামাচাপা না দিয়ে মোকাবিলা করবার সাহস ও শক্তি অর্জন।

ছাত্রাবস্থায় আমরা যারা কমিউনিস্ট ইশতেহার মনোযোগ দিয়ে পড়েছি তারা পদে পদে হোঁচট খেয়েছি। কারণ নতুন নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি যা কমিউনিজম সম্পর্কে প্রচলিত বা প্রথাগত ধারনার সঙ্গে মিলত না। অন্যদিকে মীমাংসার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা বা পরিমণ্ডল দরকার সেটাও অনুপস্থিত ছিল।

কমিউনিস্ট ইশতেহার পড়তে গিয়ে প্রথমেই যে বাক্যটির ওপর প্রচণ্ড ভাবে হোঁচট খেয়েছিলাম সেটা হোল, ‘উৎপাদনের উপকরণে অবিরাম বৈপ্লবিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে এবং তাতে করে উৎপাদন সম্পর্ক ও সেই সঙ্গে সমগ্র সমাজ-সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণি বাঁচতে পারে না’। বুর্জোয়া শ্রেণি যে ঐতিহাসিক ভাবে বৈপ্লবিক শ্রেণি এটা জোরের সঙ্গে মার্কস বলেছেন। যা ‘বুর্জোয়া’ সম্পর্কে আমাদের ধারণার সঙ্গে একদমই খাপ খেতো না। এর পরের কয়েকটি ছত্রে বুর্জোয়া শ্রেণির বৈপ্লবিক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন মার্কস ও এঙ্গেলস। ধনিক শ্রেণির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে কমিউনিজমের নামে যে ঈর্ষা, বিদ্বেষ প্রতিক্রিয়াশীলতা দেখি তার কিছুই সেখানে নাই।

আরো হোঁচট খেয়েছিলাম যখন ছাত্রাবস্থায় প্রথম পড়ি, ‘শ্রমিক শ্রেণির অন্যান্য পার্টিগুলির প্রতিপক্ষ হিসাবে কমিউনিস্টরা পৃথক পার্টি গঠন করে না’। দেখা যাচ্ছে কমিউনিস্টদের আলাদা পার্টি গঠনের কথা কমিউনিস্ট ইশতেহার বলছে না। কেন করে না? কারন ‘প্রলেতারীয় আন্দোলনকে রূপ দেওয়া বা গড়ে পিটে তোলার জন্য তারা (কমিউনিস্টরা) কোন গোষ্ঠিগত নীতি খাড়া করে না’। দেখা যাচ্ছে কমিউনিস্ট দল গঠন করে কোন ‘গোষ্ঠিগত নীতি’ চর্চা কমিউনিস্টদের কাজ নয়। কমিউনিস্টরা অবশ্য অধিকাংশ সময় এটাই করেছে, বা এটাই করে।

ব্যক্তিগত মালিকানার প্রশ্নে আসি। কমিউনিস্ট ইশতেহার বলছে, ‘সাধারণভাবে মালিকানার উচ্ছেদ নয়, বুর্জোয়া মালিকানার উচ্ছেদই কমিউনিজমের বৈশিষ্ট্যসূচক দিক’। অর্থাৎ কমিউনিজমের লক্ষ্য হচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের উচ্ছেদ: অর্থনৈতিক ও তার আইনী রূপ উভয় অর্থে।  কিন্তু ‘বুর্জোয়া' বলার মানে হোল একে শুধু অর্থনৈতিক ও আইনী অর্থে বুঝলেও চলবে না। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অর্থেও বুঝতে হবে। যদি সমাজে আমিত্বের ভাব প্রবল থাকে তাহলে ডিক্রি জারি করে ‘আমি’ বা ‘আমার’ নিরাকরণ ঘটানো যাবে না। একটা দীর্ঘ সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের দরকার আছে। তাহলে কমিউনিজম বললে কেন মনে করা হয় যে ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ চাওয়া হচ্ছে?

কমিউনিস্ট ইশতেহারের ব্যাখ্যা হচ্ছে, “শ্রেণি বিরোধের উপর, অল্পলোকের দ্বারা বহুজনের শোষণের উপর প্রতিষ্ঠিত উৎপাদন এবং উৎপন্ন দ্রব্যগুলিকে নিজেদের অধিকারভূক্ত করার ব্যবস্থার চূড়ান্ত ও পূর্ণতম প্রকাশ হল আধুনিক বুর্জোয়া ব্যাক্তিগত মালিকানা। এই অর্থে কমিউনিস্টদের তত্ত্বকে এক কথায় প্রকাশ করা চলে: ব্যাক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ’। পুঁজি বিশ্বব্যবস্থা হিসাবে যতোই পরিণত রূপ নিচ্ছে ততোই ব্যাক্তিগত মালিকানা বিশেষ ঐতিহাসিক রূপ পরিগ্রহণ করছে। তাহলে মালিকানার এই পরিণত রূপের উৎখাত ঘটানোই – অর্থাৎ বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিলয় ঘটানোই কমিউনিজমের লক্ষ্য। শুধু কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার থেকে উদাহরণ দিয়েছি, কারণ মার্কসের অন্য বই না থাকলেও এটা যে কোন কমিউনিস্ট দাবিদারের কাছে থাকার কথা।

উদাহরণ দিচ্ছি তিনটি কারনে। এক. কমিউনিজম, ব্যাক্তিগত মালিকানা, সমাজ, ইতিহাস, শ্রেণি, শ্রেণি চেতনা ইত্যাদি সম্পর্কে মনগড়া ধারণা দিয়ে বিপ্লবী রাজনীতির পুনর্গঠন সম্ভব নয়। যদি আমরা মার্কসের ছাত্র হতে চাই তাহলে নিষ্ঠার সঙ্গেই তাকে পাঠ করতে হবে। অনুমানে কথা বললে হবে না। এতে কমিউনিস্ট আন্দোলন আগায় না, পিছিয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, মার্কস আসলে কিভাবে ধারণাগুলো ব্যবহার করেছেন তা মার্কসের সামগ্রিক লেখালিখি পর্যালোচনা করেই বুঝতে হবে। কারন বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন প্রসংগে একই পরিভাষা তিনি ব্যবহার করছেন কিন্তু তার অর্থভেদ আছে, এবং

তিন. নতুন বৈপ্লবিক রাজনৈতিক কর্তাসত্তা নির্মানের মার্কসের লেখালিখিরও পর্যালোচনা জরুরী। মার্কসের পরেও মানুষের চিন্তা ভাবনা বহুদূর এগিয়েছে। তাদের আমলে নিতে হবে, সব কিছুওকেই প্ররযালোচনার অধীন করতে হবে। মানুষের চিন্তা চেতনার অনেক বিকাশ ঘটেছে, এই সত্যটুকু না মানলে সামনে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়।

বুর্জোয়া শ্রেণি ও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব

‘বুর্জোয়া’ শব্দটি ফরাসি ভাষা থেকে আসা। কোন লেখায় শব্দটি কিভাবে ব্যবহার করা হোল তার ওপর শব্দটি কি বোঝায় সেটা নির্ভর করে। মূলে বা আদিতে বোঝাত গ্রামের বিপরীতে শহরে যারা বিশেষ পৌর এলাকায় বাসিন্দা এবং পৌর আইনে বিশেষ সুবিধাভোগী। ইউরোপে ১১ শতাব্দি থেকে তাদের আবির্ভাব শুরু হয় আর ১২ শতাব্দিতে নগরায়নের সময় থেকে গ্রাম থেকে শহরে মানুষ আসা শুরু করার পর রেনেসাঁর সময় থেকে তারা বিশেষ ভাবে দৃশ্যমান হতে শুরু করে। ‘বুর্জোয়া’ পরিভাষা হিসাবে ব্যবহার শুরু হয় ১৩ শতাব্দি থেকে। বুর্জোয়া সুনির্দিষ্ট কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ভোগ করত। বুর্জোয়ারা শহরবাসী বটে, কিন্তু সব শহরবাসি মানেই ‘বুর্জোয়া’ নয়, কারন তারা বুর্জোয়ার আইনী অধিকার ভোগ করত না।

প্রাচিন যুগ (Ancient Regime) শেষ হচ্ছে আর নতুন যুগের আবির্ভাব ঘটছে, সেই সন্ধিক্ষণে ফ্রান্সের মধ্য যুগে নগরবাসী হিসাবে ‘বুর্জোয়া’ বিশেষ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করত। ‘বুর্জোয়া’ বলতে তাহলে আদিতে তাদেরকেই বোঝাত যারা পৌর আইনে বিশেষ ‘নাগরিক’ অধিকারের অধিকারী হয়ে শহরে ব্যবসা বাণিজ্য দোকানপাট কলকারখানা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল। অর্থাৎ ‘বুর্জোয়া’ শুধু অর্থনৈতিক বর্গ নয়, তার আইনী অধিকারও ছিল। বুর্জোয়াকে শুধু তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দিয়ে বুঝলে তাহলে চলছে না, তার আইনও ‘বুর্জোয়া’র সংগা নির্ণয়। এরপর রয়েছে চেতনা গত দিক। বুর্জোয়ার বিশেষ চেতনা, ইচ্ছা ও সংকল্প রয়েছে যার ভিত্তিতে এই শ্রেণি সমাজে রাজনীতিতে সংস্কৃতিতে এম্নকি আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখে। চেতনার দিক থেকে যেমন তেমনি বুর্জায়ার বিকাশ বুর্জোয়া আইন বা রাষ্ট্রের দ্বারাও সংজ্ঞায়িত হয়।

আইন ও অধিকারের জায়গা থেকে বুর্জোয়াকে বুঝতে হলে এতাআও মনে রাখতে হবে যে অধিকার আইনের দ্বারা সিদ্ধ (positive law) তার বাইরেও আইনে অনুপস্থিত (passive law) মানবিক অধিকার মানুষের আছে – বুর্জোয়া শ্রেণি সে অধিকার ধারণ করে। ইতিহাসে সেতা দুই প্রকার অধিকার হিসাবে ইতিহাসে হাজির হয়েছেঃ ১. নাগরিক অধিকার, আর ২. মানবিক অধিকার। যে কারণে আমরা দেখি ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সামন্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে যে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটে তার আদর্শিক ভিত্তি ‘মানুষ ও নাগরিক অধিকারের ঘোষণা’ (Declaration of the rights of Man and of the Citizens (১৭৯৩) এই ঘোষণা ইতিহাসে বিখ্যাত। এই ঘোষণায় কেন মানুষের অধিকারের কথা নাগরিক অধিকার থেকে আলাদা করে বলতে হোল । তার মানে রাষ্ট্রের আইনের দ্বারা সিদ্ধ ‘নাগরিক’ অধিকার আর অন্যদিকে আইনে অনুপস্থিত ‘মানবিক’ অধিকারের পার্থক্য মনে রাখলে আমরা বুঝব।

‘মানুষ ও নাগরিক অধিকার’ ঘোষণা মূলত বুর্জোয়া শ্রেণির ভাবাদর্শিক ও রাজনৈতিক ঘোষণা। ন্যূনতম যে সকল মানবিক ও নাগরিক অধিকার স্বীকার করলে কাউকে ‘বুর্জোয়া’ বলা যায় তার মানদণ্ড হচ্ছে ফরাসি বিপ্লবের ঘোষণা। ফরাসি বিপ্লবে বুর্জোয়া শ্রেণি শুধু নেতৃত্ব দিয়ে ক্ষান্ত থাকে নি, এই ঘোষণা এবং ঘোষণার ভিত্তিতে সামন্ত ও রাজারাজড়াদের বিপরীতে নতুন ধরনের জনগণের রাষ্ট্র (Republic) গড়ে তুলেছিল, যে কারণে বিপ্লবের চরিত্রটিও ছিল বুর্জোয়া। কমিউনিস্টরা একেই ‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ হিসাবে অভিহিত করে। বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের দিক থেকে ফরাসি বিপ্লব থেকে যে শিক্ষা কমিউনিস্টরা নেয় তার তাৎপর্য হচ্ছে যেসব দেশে বুর্জোয়া নাগরিক ও মানবিক অধিকার এখনও কায়েম হয় নি, সেইসব দেশে জনগণের সাংবিধানিক বা গঠনতান্ত্রিক আইনসিদ্ধ অধিকার হিসাবে নাগরিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা। যে সব দেশে বুর্জোয়া শ্রেণি দুর্বল কিম্বা এই অধিকার কায়েমে অক্ষম কমিউনিস্টদের কাজ হচ্ছে তাদের নিজেদের নেতৃত্বে ‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ সম্পন্ন করা।এই অধিকারকে গঠনতান্ত্রিক ভিত্তি দেবার জন্য নতুন গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন ও নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম। বুর্জোয়া বিপ্লবের জন্য কমিউনিস্টদের ‘শ্রমিক আর কৃষকের বৈপ্লবিক মৈত্রী’ গড়ে তুলতে হবে --লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা এই নীতি অনুসরণ করে সফল হয়েছিল।

এখানে বোঝার বিষয় হচ্ছে আমাদের মতো দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতৃত্বে বুর্জোয়া শ্রেণি না থাকলেও সেই বিপ্লবের চরিত্র ‘বুর্জোয়া’ই হবে। কারণ বুর্জোয়া নাগরিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠাই তার আশু উদ্দেশ্য । সেটাও তাহলে হবে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব। ‘বুর্জোয়া’ কথাটি বাদ দিলে আমরা এই বিপ্লবকে স্রেফ বলতে পারি ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ বা জনগণের বিপ্লব, যারা এমন এক রাষ্ট্র গঠন করতে চায় যেখানে প্রত্যকের নাগরিক ও মানবিক অধিকার নিশ্চত থাকবে।। লেনিনও গণতান্ত্রিক বিপ্লবই করেছিলেন। কিন্তু তিনি নতুন একটি যুক্তি দিলেন। সেটা হোল কমিউনিস্ট পার্টি যদি সক্ষম হয় তাহলে শুধু গণতন্ত্রে সন্তুষ্ট থাকবে কেন, সরাসরি ‘সমাজতন্ত্র’ কায়েম করুক। এটা রাজনৈতিক দর্শন ও বিপ্লবের ইতিহাসে খুবই বড়সড় তর্ক হয়ে আছে।

রাজনৈতিক ক্ষমতার একটা ব্যাখ্যা লেনিন দাঁড় করিয়েছিলেন। গণতান্ত্রিক বিপ্লবে রাজনৈতিক ক্ষমতা শ্রমিক ও কৃষকের বৈপ্লবিক মৈত্রীর ওপর নির্ভর করে। গণতন্ত্র মানে সবার জন্য গণতন্ত্র নয়, কৃষকের ও শ্রমিকের জন্য গণতন্ত্র, কিন্তু যারা শ্রমিক এবং বঞ্চিত চাষাভূষাদের স্বার্থের বিরোধী তাদের বিরুদ্ধে একনায়কতন্ত্র বা সোজা কথায় ‘বল প্রয়োগ’। একই যুক্তিতে রাজনৈতিক ক্ষমতার দিক থেকে ‘সমাজতন্ত্র’ বলতে লেনিন বুঝিয়েছিলেন শ্রমিক শ্রেণির নিজেদের জন্য গণতন্ত্র, কিন্তু অন্য সকল শ্রেণির জন্য একনায়কতন্ত্র। গণতন্ত্র বনাম একনায়কতন্ত্রের সম্বন্ধ এবং এই বিষয়ে কমিউনিস্টদের অবস্থান নিয়ে বিস্তর তর্কবিতর্ক আছে। সেই তর্কে আমরা যাবো না। লেনিন আসলে রাষ্ট্র ‘ক্ষমতা’ নিয়ে কথা বলছিলেন। বলা হয়ে থাকে, লেনিন পার্টি আর রাষ্ট্র একাকার করে ফেলেছিলেন। একালে ‘ক্ষমতা’ নিয়ে আলোচনা শুধু বল্প্রয়োগ ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক করা হলে সেতা হবে অসম্পূর্ণ। একালে যা নিয়ে নতুন ভাবে আলোচনা পর্যালোচনা চলছে। সোভিয়েত রাশিয়ার পতন ক্ষমতা সম্পর্কে লেনিনের এই ধারণার মধ্যে নিহিত ছিল কিনা সেটা রাজনৈতিক দর্শন ও ব্যাবহারিক রাজনীতির অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ তর্ক হিসাবে এখনও হাজির রয়েছে। সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেবার উপায় হচ্ছে ‘বুর্জোয়া’ আকাংখাকে পূর্ণ ভাবে আমলে নেওয়া। মানুষ ‘স্বাধীন’ এই বুর্জোয়া চেতনাকে গায়ের জোরে দাবিয়ে রেখে ইতিহাস সামনে অগ্রসর হতে পারে নি, বহু রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে সেটা বোঝা গিয়েছে। আগামি দিনের নতুন রাজনৈতিক চর্চার জন্য এই শিক্ষা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে এটাও ঠিক যে ‘মুক্তি’, ‘স্বাধীনতা’ ইত্যাদি ধারণাগুলো বুঝা আর পর্যালোচনা জরুরী। অবশ্যই। ধারনাগুলোর সীমা ও সম্ভাবনার বিচার গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একে ‘বুর্জোয়া’ বলে ‘ধরো তক্তা মারো পেরেক’ জাতীয় রাজনীতি দিয়ে দমন করা যায় না; লাফ দিয়ে অতিক্রম করে যাওয়াও অসম্ভব। মানবেতিহাসে ‘স্বাধীন ব্যক্তি’র ভূমিকা, কিম্বা ‘মানুষ স্বাধীন ও সার্বভৌম’ এই অনুমান বা ধারনার প্রতাপ ভালো ভাবে বোঝার দরকার। পুঁজির সঙ্গে তার সম্বন্ধের জায়গাও সকল দিক থেকে বিচার করা জরুরি। ব্যক্তির ‘ব্যক্তিত্ব’ ঐতিহাসিক ভাবে তৈয়ার হয়, ‘ব্যক্তি’ মানুষের অন্তর্গত কোন রহস্যজনক শক্তি না। অতএব পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, কামনা, বাসনা অভিপ্রায় পুঁজির দ্বারাই নির্ধারিত হয়। কিন্তু একই ভাবে মুক্ত ও স্বাধীন কর্তাসত্তা হিসাবে ব্যক্তি চেতনাগত ভাবে ব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে পুঁজিতান্ত্রিক শৃংখলের বিরোধিতাও করে, করতে সক্ষম। ব্যক্তি মাত্রেই এই সম্ভাবনাও সমান মাত্রায় ধারন করে। সেই কর্তাসত্তার উদ্বোধনের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক তৎপরতা বাংলাদেশে কি হবে? সেটাই এখনকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একে আমলে না নিয়ে নতুন নতুন রাজনীতির নির্মান সম্ভব কিনা সন্দেহ।

‘ব্যক্তি’ বহুকাল ধরেই দর্শনের কেন্দ্রীয় বিষয়। বুর্জোয়া বিশ্ব ব্যবস্থা আরও গভীর ও বিস্তৃত হয়েছে। বুর্জোয়া সমাজে মানুষ নিজেকে ‘স্বাধীন’ গণ্য করা ও ব্যক্তি অধিকারের সম্পর্কে সচেতন থাকাই স্বাভাবিক। অসচেতনতা শুরু হয় যখন নিজের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে আমরা অপরের অধিকার অস্বীকার করে বসি, আমল করিনা বা স্বীকার করতে চাই না। – এখানেই অসচেতনতা। মানুষ নিজেকে ‘মুক্ত’ উপলব্ধি করতে চায়, স্বাধীনতার স্বাদ চায়। শুধু উপলব্ধি করে ক্ষান্ত থাকে না, তার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রূপও দেখতে আগ্রহী। তাহলে মুক্তির এই আকাঙ্ক্ষা, তাগিদ ও স্বাদকে দাবিয়ে রেখে ইতিহাসের বুর্জোয়া কালপর্ব অতিক্রম করে যাওয়া সম্ভব কিনা সেটাই একালের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নিজেরটা চাইতে হলে একই ভাবে পরের অধিকার ও অপরের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে সক্রিয় থাকতে হয় এটা বোঝানোই এখনও সবচেয়ে কঠিন কাজ। এতে বোঝা যায় বুর্জোয়া যুগ অতিক্রম করবার ঐতিহাসিক শর্ত আসলে এখনও তৈরি হয় নি। বাংলাদেশে বুর্জোয়া পর্বই এখনও এলো না, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিন চেতনা ও তৎপরতা হিসাবে ব্যক্তির বিকাশ ঘটলো না, সেখানে বুর্জোয়া যুগ অতিক্রম করে পরের পর্যায়ের আশা আকাশকুসুম মাত্র।

শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলনের অনুপস্থিতিতেও মাও জেদং দং চিন দেশে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ করেছিলেন। কিন্তু তিনি তার নাম দিলেন ‘জনগণতান্ত্রিক’ বা ‘নয়া গণতান্ত্রিক’ বিপ্লব। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এটা নতুন ধরণ। আমরা তরুণ বয়সে মাও জে দং-এর নীতি ও কৌশলের প্রতি প্রবল ভাবে আকর্ষণ বোধ করবার কারণ হচ্ছে চিনের অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে জনগণকে সংগঠিত করবার দর্শন ও কৌশল আমাদের মতো দেশেও কার্যকর হতে পারে। কিন্তু বুর্জোয়া গণাতান্ত্রিক বিপ্লব বাংলাদেশে সম্পন্ন করা বাংলাদেশে সম্ভব হয় নি।

মার্কসের পরিভাষা হিসাবে ‘বুর্জোয়া’

মার্কস শুরুর দিকে হেগেলকে অনুসরণ করছিলেন। আমরা এখন ‘নাগরিক সমাজ’, ‘সিভিল সোসাইটি’, ‘সিভিল সমাজ ’ বলতে যা বুঝি হেগেল তার কালে ‘সিভিল সোসাইটি’ শব্দবন্ধ দিয়ে মোটেও সেটা বুঝতেন না। বুঝতেন আইন ও রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে স্বার্থপর ব্যক্তিদের প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গা হিসাবে; সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক হচ্ছে সমাজ স্বার্থপর ব্যক্তির ব্যাক্তিগত কামনা বাসনা চরিতার্থ করবার আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্র। ধারণা হিসাবে নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রের ধারণার অধীন। আইন ও রাষ্ট্র সম্পর্কে হেগেলের সামগ্রিক ধারণার আলোকে সেটা বুঝতে হবে। তবে সমাজ বলতে আমরা যা বুঝি -- যেখানে ব্যক্তি ও পরিবার তাদের বৈষয়িক স্বার্থ চরিতার্থ করবার জন্য হাজার কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকে— হেগেল সে ধারণাকেই তার ‘অধিকার শাস্ত্রে’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্গ হিসাবে গড়ে তুলেছেন। সিভিল সোসাইটির বিপরীতে রাষ্ট্র হচ্ছে বিশেষ বিশেষ স্বার্থের উর্ধে উঠে সকলের সার্বজনীন ইচ্ছা ও অভিপ্রায় পূরণের জায়গা। হেগেলের সিভিল সোসাইটি বুঝতে চাইলে সাধারণত ‘সমাজ’ বলতে আমরা যা দেখি ও বুঝি সেটা মনে রাখলে সুবিধা হতে পারে। সমাজ আমাদের ব্যাক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করবার জায়গা, মানুষের নৈতিকতা তার আপন তাগিদে তাড়িত হয়ে সমাজ থেকেই উদ্ভূত হয়ে রাষ্ট্রের রূপ পরিগ্রহণ করে – হেগেল সেটাই তার অধিকার শাস্ত্রের দর্শনে দেখাতে চেয়েছেন। হেগেলের কাছে ‘রাষ্ট্র নৈতিকতার চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা; নীতি ও অধিকার বোধের যৌক্তিক পরিণতি’।

তাহলে সিভিল সোসাইটি ( জর্মন ভাষায় burgerliche Geesellschaft) স্বার্থপর ব্যক্তির অর্থনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করবার জায়গা, এই ধারণা অধিকার শাস্ত্রের বিচার ও রাষ্ট্রচিন্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এখানে, এই আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে, তার বিশেষ ব্যাক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করে। নীতি তাড়িত সার্বজনীন বা সামষ্টিক বিবেচনা থেকে এই স্বার্থপরতার উর্ধে উঠতে গিয়ে মানুষ রাষ্ট্র গড়ে তোলে। নৈতিক আদর্শের পরিণত রূপ রাষ্ট্রের বিপরীতে হেগেল নাগরিক সমাজকে ভেবেছেন, স্বার্থপরতা চরিতার্থ করবার ক্ষেত্র হিসাবে প্রতিস্থাপন করেছিলেন।

হেগেলের ছাত্র হবার কারনে বুর্জোয়া বলতে মার্কস তরুণ বয়সের লেখালিখিতে স্বার্থপর সমাজে ব্যক্তির ছোটলোকি স্বার্থপরতাই বুঝতেন। বাংলাদেশে আমরা তরুণ বয়সে স্বার্থপর ধনি শ্রেণিকে যেভাবে বুঝতাম, ১৮৪২ সালের দিকে মার্কস আইন ও দর্শনের বাইরে এসে সবে যখন ‘বৈষয়িক’ বিষয়াদি নিয়ে লিখতে শুরু করেছিলেন, তখন তার বোঝাবুঝি আমাদের চেয়ে আলাদা কিছু ছিল না। রাইনল্যান্ডের যেসব অর্থশালীরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিরোধী ছিল তাদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে মার্কস মন্তব্য করছেন: ‘আমাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে বুর্জোয়াদের, নগরবাসীদের (citoyen) না’। নগরায়ন সামন্ত অর্থনীতির বদল ঘটাচ্ছে, তাকে তিনি ইতিবাচক ভাবছেন, কিন্তু ‘বুর্জোয়া’ তখনও তার কাছে খারাপ, ছোটলোক, সংকীর্ণ। ফরাসি নাট্যকার মলিয়ের (১৮২২-৭৩) কিম্বা হেনরিক ইবসেন (১৮২৮ – ১৯০৬) যেভাবে বুর্জোয়াদের হীনমন্য, সংকীর্ণ আর টাকা দিয়ে সম্মান আর আভিজাত্য কিনে নেবার জন্য কাতর চরিত্রে রূপ দিয়েছিলেন মার্কসের ফরাসি ভাষা থেকে ধার করা ‘বুর্জোয়া’ পরিভাষাটির ব্যবহার সেই সময়ের সাহিত্যিক অনুষঙ্গ থেকে খুব আলাদা ছিল না। মার্কস তখনকার প্রচলিত ধারণা থেকে ভিন্ন কিছু ভাবছিলেন বলে মনে হয় না। বুর্জোয়া তার প্রথম দিকের লেখালিখিতে স্বার্থপর সম্পত্তিবান শ্রেণি। এই শ্রেণির হীনমন্য ও সংকীর্ণ মানসিকতাকে মার্কস সমাজের বৃহত্তর বৈপ্লবিক আকাংখা বা সার্বজনীন আকুতির বিপরীতে স্থাপন করেছিলেন।

শুরুতে মার্কস লেখালিখি করছিলেন বন থেকে গরীবদের কাঠ চুরি করা নিয়ে আইনসভার তর্ক বিতর্কে গরিবদের পক্ষাবলম্বন করতে গিয়ে। কিন্তু ১৮৪২-৪৩-এর দিকে লিখতে গিয়ে তার মনে হোল এই ধরণের বৈষয়িক বিষয় বোঝার মতো পড়াশুনা তাঁর নাই। অর্থশাস্ত্র নিয়ে তিনি তখনও পড়াশুনা করেন নি। নিজের বোঝাবুঝির এই অভাববোধ তাঁকে আইন ও দর্শন থেকে অর্থশাস্ত্র পাঠ ও পর্যালোচনায় প্রতি আগ্রহী করে তুলল। এর পরের ইতিহাস আমাদের জানা। নিজের জীবনের এই কালপর্ব সম্পর্কে মার্কস নিজেই লিখছেন, পত্রিকায় বনের কাঠচুরি নিয়ে লেখালিখির সময় তিনি “প্রথম নিজেই খুব বিব্রত বোধ করলেন’ আর এটাই তাকে ‘অর্থনৈতিক প্রশ্ন’ গুলোর দিকে নজর ফেরাতে বাধ্য করল (দেখুন, ১৮৫৯ সালের অর্থশাস্ত্র পর্যালোচনা ক্ষেত্রে একটি সংযোজন (A Contribution to the Critique of Political Economy)।

তবে ১৮৪৫-৪৪ এর সময় থেকে ‘বুর্জোয়া’ সম্পর্কে তাঁর ধারণা বদলাতে শুরু করে। বুর্জোয়া ফ্রান্সের সামন্ত সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে সেটা তিনি দ্রুতই টের পেয়েছিলেন। এটা তিনি পেরেছিলেন কারন ততোদিনে তিনি অর্থনৈতিক ভাবে বিভিন্ন শ্রেণিকে বোঝার কাজে এগিয়ে গিয়েছিলেন। “সাধারণ ভাবে ফরাসি অভিজাত শ্রেণি এবং ধর্ম যাজকদের ইতিবাচক চরিত্র বোঝা যায় পাশাপাশি বুর্জোয়া শ্রেণিকে দিয়ে, যারা তাদের বিরোধী” (Marx, 1844) । যাজক ও সামন্ত শ্রেণির বিপরীতে বুর্জোয়া ইতিবাচক। এর চার বছর পর কমিউনিস্ট ইশতেহারে আমরা বুর্জোয়া সম্পর্কে একদমই নতুন ধরনের কথা শুনি।

“বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশের ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সমানে চলেছিল সে শ্রেণির রাজনৈতিক অগ্রগতি। এই যে বুর্জোয়ারা ছিল সামন্ত প্রভুদের আমলে একটা নিপীড়িত শ্রেণী, মধ্যযুগের কমিউনে যারা দেখা দেয় একটা সশস্ত্র ও স্বশাসিত সংঘ রূপে, কোথাও বা স্বাধীন প্রজাতান্ত্রিক নগর রাষ্ট্র (যেমন ইতালি ও জার্মানিতে) আবার কোথাও বা রাজতন্ত্রের করদাতা ‘তৃতীয় মণ্ডলী’ রূপে (যেমন ফ্রান্সে), তারপর হস্তশিল্প পদ্ধতির প্রকৃত পর্বে যারা আধা সামন্ততান্ত্রিক বা নিরংকুশ রাজতন্ত্রের সেবা করে অভিজাতবর্গের বিরুদ্ধে সমভার শক্তি হিসেবে, সেই বুর্জোয়া শ্রেণি অবশেষে আধুনিক শিল্প ও বিশ্ববাজার প্রতিষ্ঠার পর আজকালকার প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্রের মধ্যে নিজেদের জন্য পরিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অর্জন করে নিয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রের শাসকমণ্ডলী হোল সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণির সাধারণ কাজকর্ম ব্যবস্থাপনার একটা কমিটি মাত্র

ঐতিহাসিক ভাবে বুর্জোয়া শ্রেণি খুবই বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছে”। (কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ১৮৮৮)।

ঐতিহাসিক ভাবে বুর্জোয়া শ্রেণি খুবই বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছে --মার্কসের লেখায় বুর্জোয়ার এই ভূয়সী প্রশংসা শুনতে আমরা অভ্যস্ত না। যে কারণে ব্যবসা বাণিজ্য ধনোৎপাদন ইত্যাদি সম্পর্কে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গী বাংলাদেশের বামপন্থার মধ্যে নেতিবাচক। বলা বাহুল্য, এই পর্যালোচনাহীন নেতিবাচক অজ্ঞতার সঙ্গে মার্কসের কিম্বা কমিউনিস্ট ইশতেহারের বিশেষ সম্পর্ক নাই। ফলে বাংলাদেশে বুর্জোয়া শ্রেণির সম্ভাব্য ইতিবাচক ঐতিহাসিক ভূমিকা কি হতে পারে, এবং বুর্জোয়া শ্রেণির দিক থেকে জনগণের বিপদের ক্ষেত্রগুলো কি সেই সকল বিষয়ের যথেষ্ট পর্যালোচনা আমরা করি নি। করবার কর্তব্যবোধও জাগে নি। গতিশীল অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলবার জন্য প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের বৈপ্লবিক রূপান্তর দরকার সেই কর্তব্য নিয়ে যথেষ্ট ভাবি নি। এর জন্য কমিউনিস্টদের উপযুক্ত নীতি ও কৌশল গড়ে তোলা যায় নি। বরং যারা কিছুটা বুঝেছে, তার নির্ভর করেছে বাংলাদেশের লুটেরা ও লুম্পেন বুর্জোয়া শ্রেণির ওপর। লেনিনের ভাষায় পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের ‘দ্রুত ও ত্বরান্বিত’ বিকাশ নিশ্চিত করা এবং গতিশীল ও শক্তিশাল জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তুলবার ক্ষেত্রে বামপন্থি আন্দোলন সবসময়ই বাধা বা নুইসেন্স হিসাবে ভূমিকা রেখেছে।

মার্কস ‘বুর্জোয়া’ শ্রেণির বৈপ্লবিক ভূমিকার ভূয়সি প্রশংসা করে ক্ষান্ত থাকেন নি, তার হাতে হেগেলের ‘সমাজ’ (burgerliche Geesellschaft ) সংক্রান্ত ধারণার আমূল বদল ঘটে। নাগরিক ও মানবিক অধিকার হেগেল বিমূর্ত নীতিনৈতিকতার বিষয় হিসাবে হাজির করেছিলেন। ব্যাক্তির ‘স্বাধীনতা’, ‘অধিকার’ ইত্যাদি ছিল বিমূর্ত ধারণা। এমন বিমূর্ত রাষ্ট্রের ধারণা আগে অনুমান করে নিয়ে হেগেল ‘অধিকার’-এর ধারণা তাঁর ‘অধিকার শাস্ত্রের দর্শন’ গ্রন্থে নিষ্পন্ন করেছেন। মার্কস দেখালেন রাষ্ট্র আসলে বুর্জোয়ার অর্থাৎ এই স্বার্থপর মানুষের -- নিজ নিজ ব্যক্তি স্বার্থে পরস্পরের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল হিসাবে গঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রের কাজই হচ্ছে ব্যক্তির বৈষয়িক স্বার্থ রক্ষা করা। রাষ্ট্র ব্যক্তি স্বার্থপরায়নতারই অভিপ্রকাশ মাত্র, ব্যক্তিগত মালিকানার ওপর গড়ে ওঠা সমাজ যার বৈষয়িক ভিত্তি। পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি বিশেষ শ্রেণির স্বার্থই রাষ্ট্র রক্ষা করে আর সেই শ্রেণি হচ্ছে যারা পুঁজির মালিক। ব্যক্তিগত সম্পত্তির এই বিশেষ ধরণই আধুনিক রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহণ করে। পুঁজির মালিকরাই আধুনিক রাষ্ট্রের চরি্ত্র নির্ণয় করে। মার্কস লিখছেন, ‘সামন্তবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব’ বুর্জোয়া শ্রেণির এই বিশেষ সম্পত্তির ধরণেরই বিপ্লব। এই বিপ্লবে “মানুষ সম্পত্তি থেকে স্বাধীন হয় নি, সম্পত্তির মালিক হবার স্বাধীনতা লাভ করেছে’ ( (Marx, 1844, p. 167)।

এই কারণে কমিউনিস্ট ইশতেহারে ‘বুর্জোয়া’ কথাটা পুঁজির প্রতিনিধি বা পুঁজির স্বভাব যে শ্রেণির মধ্যে ‘কর্তা’ রূপে প্রকাশিত হয় সেই অর্থে মার্কস ব্যবহার করেছেন। কিন্তু করেছেন এমন ভাবে যাতে পরিষ্কার এই বুর্জোয়ার ঐতিহাসিক ভূমিকা বিপ্লবী হলেও এই শ্রেণী ইতিহাসে চিরকাল থাকার জন্য আসে নি। সামন্ত শ্রেণির মতো তার বিলয়ও ঐতিহাসিক বিকাশের গতিপ্রক্রিয়ার মধ্যে নিহিত। সেটা ঘটবে তার বিপরীতে যে নতুন বিপ্লবী শ্রেণি বা নতুন ঐতিহাসিক কর্তাসত্তার আবির্ভাব ও বিকাশের মধ্য দিয়ে।

বিপ্লবের নতুন কর্তা হিসাবে মার্কস কারখানার শ্রমিকদের কথা ভেবেছেন। শ্রমিক শ্রেণি নতুন বিপ্লবী শ্রেণী। এখানেই অর্থনৈতিক শ্রেণি আর ইতিহাস সচেতন রাজনৈতিক কর্তাসত্তার তর্কটা ক্রমে ক্রমে একালে সামনে চলে আসে। শ্রমিক শ্রেণি বাস্তবে আদৌ একালে বিপ্লবের কর্তা কিনা, তা নিয়ে বিস্তর তর্ক বিতর্ক আছে। তর্কটা বৈষয়িক অবস্থা মানুষের চেতনা নির্ণয় করে নাকি চৈতন্য বৈষয়িকতার --সেই গোড়ার দার্শনিক তর্কের সঙ্গে যুক্ত। অন্য দিক থেকেও তর্ক আছে। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের সমাজতন্ত্রে রূপান্তর স্রেফ বিপ্লবী কর্তাসত্তার মামলা না। শ্রমিক শ্রেণি বিপ্লবী হলেও তারা ঐতিহাসিক ভাবে ব্যর্থ হবে যদি উৎপাদন শক্তির বিকাশ না ঘটে। বিকাশ এমন পর্যায়ে যেতে হবে যাতে বিপ্লবী রূপান্তরের বৈষয়িক শর্ত তৈরি হয়।

এই তর্কগুলো আমরা আপাতত এখন করব না। আগামি কোন লেখার জন্য তুলে রাখলাম। বলা বাহুল্য বিপ্লবের কর্তাসত্তা একালে কিভাবে তৈরি হয় আর বাস্তবে সেই কর্তা কারা এই প্রশ্নের সুরাহা ছাড়া একালে নতুন বিপ্লবী কর্তাসত্তার আবির্ভাব অসম্ভব।

৬ জুন ২০১৭। ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪। শ্যামলী।