‘বিপ্লব’


ফরহাদ মজহার || Monday 26 June 17

‘বিপ্লব’, ‘বৈপ্লবিক’, ‘বৈপ্লবিকতা’ ইত্যাদি শব্দ হামেশা ব্যবহারের ফলে এই শব্দগুলো ক্লিশে হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ ব্যবহারে ব্যবহারে জীর্ণ, অনেকটা ছেঁড়া টাকার মতো। অথচ জাতীয় টাঁকশাল থেকে ছাপা টাকা সবসময়ই বৈধ। ছেঁড়া টাকা এখনও বিনিময়ের বৈধ মাধ্যম, কিন্তু বাজারে সেই টাকা চলে না, কেনাবেচা কঠিন হয়ে পড়ে। ছেঁড়া টাকা সহজে কেউ নিতে চায় না। তেমনি পরস্পরের মধ্যে চিন্তার বিনিময়ের জন্য কিছু উপযুক্ত ভাষা-পরিভাষার দরকার আছে, চিন্তার টাঁকশাল থেকেই তাদের উৎপত্তি। কিন্তু অতি ব্যবহারে সেটাও যখন জীর্ণ হয়, তখন যার সঙ্গে ভাবের বিনিময় ঘটাতে চাই তিনি তা বিশেষ কবুল করতে রাজি হন না। সেই ক্ষেত্রে ভাষা ও পরিভাষার মধ্যেও বদল আনা জরুরি হয়ে পড়ে। নতুন পরিভাষার দরকার হয়, কিম্বা ছেঁড়া টাকা টাঁকশাল থেকে বদলিয়ে ঝকঝকে নতুন ছাপা টাকা নিয়ে চিন্তার বাজারে কেনাবেচায় নামতে হয়। ক্লিশে পরিভাষাগুলোর হয়েছে সেই দশা।

তবে পরিভাষাগুলো এখনও গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যখন ব্যবহার করে তখন ব্যবহারকারীর আকাংখার দিকটা বোঝা খুব কঠিন নয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কোন্‌ অর্থে? রোমান্টিক ভাবাবশে ‘বিপ্লব’ সম্পর্কে পুরানা চিন্তা আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য নয়, বরং বদ্ধমূল ধ্যানধারণার কঠোর ও নির্মোহ পর্যালোচনার জন্য। পরিবার, সমাজ রাজনীতি, রাষ্ট্র, আইন, ক্ষমতা ইত্যাদি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা ইতোমধ্যে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন দিক থেকে তাদের পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নতুন নতুন প্রশ্ন উঠছে। পুরানা ভুল ও ব্যর্থতা নিষ্ঠার সঙ্গে পর্যালোচনার তাগিদ বেড়েছে। কেউ যখন বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা বলে তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ওই বলার মধ্যে মৌলিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থাকে। সেই ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন বলতে সুনির্দিষ্ট ভাবে কি চাওয়া হচ্ছে তার দ্বারা কী ধরণের রূপান্তর কাম্য পরিষ্কার বোঝা দরকার। বোঝা না গেলে ক্লিশে পরিভাষার ব্যবহার নিছকই কথার কথা মাত্র। বিদ্যমান অবস্থা কারো কাছে অসহ্য মনে হলে একদিন তার খোলনলচে বদলে ফেলার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতেই পারে। সেটা বাস্তব দুর্দশার প্রতি মানুষের সাধারণ প্রতিক্রিয়া। কিন্তু সমাজ বদলের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি এবং ক্ষমতা বা বলপ্রয়োগের দার্শনিক বিচার একালে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সকল বিষয়ে আমাদের সমাজে মনোযোগ, গবেষণা ও বিশ্লেষণ নাই বললেই চলে।

‘বিপ্লব’ অনুবাদিত শব্দ

বাংলায় বিপ্লব কথাটা আর দশটা পরিভাষার মতো পাশ্চাত্যের ‘রেভলিউশান’-এর অনুবাদ হিসাবেই এসেছে। অনুবাদ হলেও একে স্রেফ অনুবাদ ভাবা ঠিক না। কারণ অনুবাদের ঘাড়ে চড়ে ঘটনা ও ইতিহাস সম্পর্কে অনেক অনুমান আমাদের চিন্তায় ও মননে গভীর ভাবে  পোঁতা  হয়ে গিয়েছে, যা থেকে মুক্ত হওয়া কঠিন কাজ। যেমন, আমরা ধরে নেই যে পাশ্চাত্যের ঘটনাবলীর মধ্য দিয়েই সার্বজনীন মানবেতিহাস রচিত হয়ে চলেছে। যেমন, ফরাসী বিপ্লব।  আমাদেরকেও অতএব এই সার্বজনীন চরিত্রের ঘটনা আবার ঘটিয়ে সার্বজনীন মানুষের ইতিহাসে প্রবেশ করতে হবে। প্রগতির ইতিহাসের মানদণ্ড অনুযায়ী 'সভ্য' হবার এটাই একমাত্র তরিকা; এর বাইরে থাকার অর্থ  ইতিহাসহীন 'উদ্ভিদমার্কা জীবন' হয়ে প্রকৃতি হয়ে থাকা।

'জগত' ধারণাটি 'গম্‌' ধাতু থেকে তৈরি: যা গতিশীল তাই জগত। তো গতিশীলতার হেন ধারণা আমাদের ভাষা, চিন্তা ও মননে যদি থেকে থাকে তাহলে আমরা তো নিত্য এই গতিশীলতার মধ্যে বর্তমান হই। অথচ শুধু পাশ্চাত্যই যদি 'ইতিহাস' হয় তো তারই বিপরীতে প্রাচ্যকে ভাবা হোল স্থির ও অনড় সমাজ হিসাবে। 'বিপ্লব' নামক বিপ্লবী শব্দ বা ধারণা আমদানি করেও আমরা রক্ষা পেয়েছি বলা যাবে না।  'রেভলিউশন'কে অনুবাদ করে আমদানি করায় এই তর্কগুলো তৈরি হয়ে আছে। আজ অবধি মীমাংসা হয় নি। নিজেদের সমাজের পরিপ্রক্ষিতে আমাদের সুনির্দিষ্ট সমস্যার দিকে আমরা ফিরেও তাকাই নি।  আমরাও বিশ্বাস করেছি, প্রাচ্য স্থির, নিশ্চেতন ও ইতিহাস বঞ্চিত। নিশ্চল ও গতিহীন। পাশ্চাত্যের বাইরে প্রাচ্যের নিজের কোন পথ গড়ে উঠবার কোন সম্ভাবনা অতীতে ছিল না। এখনও নাই। প্রাচ্যের কর্তব্য অতএব ইউরোপকে অনুকরণ করা। ফরাসি বিপ্লবের মতো একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মানবেতিহাসে প্রবেশ করা। ইরান যখন একটি ভিন্ন ধরনের 'বিপ্লব' ঘটিয়ে ফেলল, আমরা তা মেনে নিতে পারি না। খ্রিস্টিয় সমাজের সুনির্দিষ্ট সমাধানের জন্য ফরাসী বিপ্লব হোল সার্বজনীন, কিন্তু একটি ইসলামি সমাজের সুনির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের বিপ্লবকে আমরা সার্বজনীন মানি না। তাকে বিশেষ ঘটনা হিসাবে গণ্য করি। তার বিশেষণ জুড়ে দিয়ে বলি, 'ইসলামি বিপ্লব'। শুধু তাই নয়, আরও বিশেষায়িত করে বলি শিয়াদের বিপ্লব।

এই প্রকার অনুমানের মুশকিল মাথায় রেখেই ধরে নিচ্ছি আধুনিক সমাজের গতিশীলতা, দ্বন্দ্ব ও অনিশ্চয়তা আমাদের প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে ছিল না। সমাজ একদমই নিশ্চল ছিল কিনা সেটা তর্ক সাপেক্ষ, তবে আধুনিক সমাজের তুলনায় অনেক নিস্তরঙ্গ ছিল, 'বিপ্লব' নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এই অনুমান আপাতত তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম। প্রাচ্যের জাতপাত ও আভিজাত্যের সুস্পষ্ট পার্থক্যে বিভক্ত নিশ্চল সমাজকে কার্ল মার্কস নাম দিয়েছিলেন ‘প্রাচ্যের স্বৈরতন্ত্র’ (Oriental Despotism); জীবন ছিল নিয়তির হাতে ছেড়ে দেওয়া উদ্যমহীন ব্যাঙের ছাতা, মার্কসের ভাষায় ‘মর্যাদাহীন, আটকে পড়ে থাকা উদ্ভিদমার্কা জীবন ( undignified, stagnatory, and vegetative life’ that this passive sort of existence)। এই নিস্তরঙ্গ সমাজে ‘বিপ্লব’-এর কোন ধারনা ও পরিভাষা গড়ে ওঠা অসম্ভবই বলা যায়। ফলে পাশ্চাত্যের ‘রেভলিউশান’ অনুবাদ করে আমরা ‘বিপ্লব’ বানিয়েছি এই অভিযোগ মিথ্যা নয়। বিপ্লব সম্পর্কে আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও নাই বললেই চলে। একটা রোমান্টিক ধারনা হিসাবে আমাদানি করা হয়েছে, নিজেদের সুনির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের চেয়ে পাশ্চাত্য ইতিহাসের খাপের মধ্যে কিভাবে নিজেদের পুরে ফেলা যায় বিপ্লবী রাজনীতির নামে তারই কমবেশী চর্চা হয়েছে।

রাজনৈতিক পরিভাষা হিসাবে রেভলিউশানের বাংলা অনুবাদ ‘বিপ্লব’-এর মধ্যে ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯-৯৯) বৈপ্লবিকতা ধারণের চেষ্টা আছে। ইউরোপে গির্জা, পুরোহিত ও সামন্ত শ্রেণির একচ্ছত্র ক্ষমতা সাধারণ জনগণ সশস্ত্র গণ অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও আর্থ-সামাজিক সম্পর্ক থেকে উৎখাত করে; এরই চূড়ান্ত পরিণতিতে প্রাচিন রাজতন্ত্র (Monarchy) জনসাধারনতন্ত্রে (Republic) রূপ নেয়। পার্থক্য থাকলেও ‘রিপাব্লিক’ বা জনসাধারণতন্ত্রকে আমরা সাধারণত গণতন্ত্র বলেই গণ্য করি। মনে করি, ইংলণ্ড ও ইউরোপের আধুনিক সাংবিধানিক রাজতন্ত্রও আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি রূপ। এর মানে তাদের সাধারন মিল থাকলেও বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দিকে আমরা মনোযোগী থাকি না।

ইংলণ্ড নিজেকে ‘ইউনাইটেড কিংডম’ বা রাজাদের ‘যুক্তরাজ্য’ বলে। কিন্তু একে আমরা সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গণ্য করি। ফরাসি বিপ্লবের আগে ইংলণ্ডে সাধারণ জনগণের বিপ্লব ঘটেছে ১৮৮৮ সালে। রাজা বা রাণির রাজকীয় ক্ষমতা ইংলণ্ডে বিল অব রাইটস ১৬৮৯ এবং এক্টস অফ সেটেলমেন্ট ১৭০১ দ্বারা সীমিত। তাই ইংলণ্ডকে সীমিত রাজতন্ত্রও বলা যায়। রাজা বা রাণীর ক্ষমতা সীমিত করার ইতিহাস অবশ্য আরও অতীতে, ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টায়। বিপ্লবে সাধারণ জনগণের বৈপ্লবিক ইচ্ছা ও অভিপ্রায় সংবিধান ও আইনে রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র (Constitution) হিসাবে রূপ নেয়। গঠনতন্ত্র ‘ইংলিশম্যা্ন’কে মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দান করে। মঊলিক অধিকার স্বীকার করে নেওয়ার অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র নিজের সার্বভৌম ক্ষমতার সীমা কনুল করে নেয়। জনগণের নাগরিক ও মানবিক অধিকার রাষ্ট্র ক্ষুণ্ণ করবে না এই প্রতিশ্রুতির ওপর রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকদের সম্বন্ধ তৈরি হয়।

আধুনিক পাশ্চাত্য রাষ্ট্রগুলোতে রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্ম বা গির্জার সম্পর্ক নিয়েও বাংলাদেশে বিস্তর বিভ্রান্তি আছে। ইংলণ্ডে চার্চ অফ ইংলণ্ডকে বলা হয় ‘প্রতিষ্ঠিত গির্জা’ (Established Church), রাষ্ট্রের মধ্যেই তার প্রতিষ্ঠা। এখানে ধর্ম রাষ্ট্র থেকে আলাদা বলার সুযোগ নাই, কারন আইনের চোখে গির্জা রাষ্ট্রের বাইরে নিছক সামাজিক বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়। পার্লামেন্টে বিশপ গির্জার প্রতিনিধিত্ব করেন। যে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লিখিত গঠনতন্ত্রের প্রথম সংশোধনীতে পরিষ্কার উল্লেখ করা রয়েছে যে “কংগ্রেস ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য কোন আইন করবে না, কিংবা স্বাধীন ভাবে ধর্ম পালনে কাউকে বাধাও দেবে না...’, ইত্যাদি। মার্কিন আদালত একে সাধারণত ব্যাখ্যা করে এভাবে যে সকল সরকারী কর্মকাণ্ডে, স্কুলে বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্র ধর্মকে আলাদা রাখবে কিম্বা ধর্ম থেকে বিযুক্ত থাকবে, কিন্তু একই সঙ্গে সমাজে ধর্ম চর্চার স্বাধীনতাও রাষ্ট্র নিশ্চিত করে। অন্যান্য আধুনিক সেকুলার রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাষ্ট্র ও ধর্মের বিযুক্তির ব্যপারে এতো কড়া নয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে ধর্মীয় চরিত্রের দিক থেকে অতিশয় ধর্মীয় সমাজগুলোর অন্যতম।

সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক বিপ্লব বা গণতান্ত্রিক বিপ্লব

এই ঐতিহাসিক পার্থক্যগুলো মনে রেখে বিপ্লব সম্পর্কে ইউরোপীয় অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা কিছু বিষয় আলোচনা করতে পারি। সেটাও খুব সহজ নয়। সেই ক্ষেত্রেও অনেক নির্বিচার অনুমানের আশ্রয় নিতে হয়। যেমন, 'জনগণ'। জনগন মানে একাট্টা একপ্রকার জনগোষ্ঠি না।  জাত, শ্রেণি, লিঙ্গ, , আচার, ব্যবহার, ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি নানান ভাবে জনগণ বিভক্ত। 'জনপগন' কথাতাও আমাদের ইউরোপীয় সমাজের আলোকে বুঝতে হয়। সাধারণ জনগণের রাজনৈতিক বিপ্লব বা গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলতে বোঝায়: সামন্ততন্ত্র বা প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক ক্ষমতা সম্পর্কের খোলনলচে বদলে দেওয়া, এর বিশেষ অর্থ হচ্ছে সামন্তশ্রেণি ও রাজরাজড়ার বিপরীতে ‘সার্বভৌম ক্ষমতা’র দাবি নিয়ে ‘বিজয়ী জনগণ’-এর ঐতিহাসিক আবির্ভাব। ‘জনগণ’ তাহলে নিছকই একটি অক্ষর বা শব্দ নয়, অতএব একে আক্ষরিক ভাবে বোঝার সুযোগ নাই।

তাহলে ‘বিপ্লব’ কথাটা বুঝতে হলে জনগণের ঐতিহাসিক আবির্ভাব কথাটিকে ঐতিহাসিক ভাবেই বুঝতে হবে। ইউরোপের ইতিহাস সার্বজনীন মানবেতিহাস হিসাবে আমরা যদি মানি তাহলে ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়েই এই জনগণের আবির্ভাব ঘটেছে। ইংরেজিতে ‘উই দ্য পিপল’ কথাটা একদিকে রাজনৈতিক ইতিহাস ও জনগণের লড়াই সংগ্রামের প্রেক্ষাপট যেমন বর্ণনা করে, একই ভাবে জনগণের ঐতিহাসিক বিজয়ও ধারণ করে। এই ঘোষণা নিজেদের রক্ত, বর্ণ, ধর্ম, সম্প্রদায়, পরিচয় ইত্যাদি সকল প্রকার সামাজিক বৈচিত্র্যের উর্ধে নিজেদের একক ও অখণ্ড রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে হাজির করে। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এটা গুরুত্বপূর্ণ দিক।

রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সামাজিক বৈচিত্র ও পরিচয় মুখ্য নয়, কারণ তা ঐক্য ও অখণ্ডতার বিপরীত। অন্য দিকে সমাজে এই বৈচিত্র, পার্থক্য ও পরিচয় ভেদ আছে বলেই জনগণকে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের পার্থ্ক্য ঘোষণা করতে হয়। অর্থাৎ ঘোষণা দিতে হয় রক্ত, বর্ণ, ধর্ম, সম্প্রদায়, পরিচয় ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার সামাজিক বৈচিত্র্যে ও পার্থক্য সত্ত্বেও আমরা রাজনৈতিক ভাবে এক ও অখণ্ড সত্তা এবং বিশ্বের অন্যান্য রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি থেকে আলাদা। এই ঐক্য ও অখণ্ডতা বজায় ও রক্ষার জন্য একটি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্রের (Constitution) ভিত্তিতে আমরা নিজেদের আবির্ভাব ঘোষণা করছি এবং একটি মূর্ত রাষ্ট্রের রূপ ও অস্তিত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে।

রাজনৈতিক ভাবে এক ও অখণ্ড রাজনৈতিক সত্তা হিসাবে হাজির হবার এই রাজনৈতিক ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ই হচ্ছে রাষ্ট্রের ন্যায্যতা ও সিদ্ধতা যা গঠনতন্ত্রে বিধৃত থাকে। উই দ্য পিপল’ বা সংবিধানে যেভাবে লেখা হয়, ‘আমরা বাংলাদেশের জনগন...’ কথাটার এটাই অর্থ দাঁড়ায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে ‘বিপ্লব’ বা জনগণের বিজয়ী গণ অভ্যূত্থানের রাজনৈতিক অর্থ হচ্ছে (ক) সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেদের এক ও অখণ্ড রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে পরিগঠন; (খ) অন্য রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির সঙ্গে নিজেদের পার্থক্য সুনির্দিষ্ট করা (গ) নিজেদের রাষ্ট্র হিসাবে গঠনের জন্য গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন এবং (গ) গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন।

দ্বিতীয়ত, জনগণের ঐতিহাসিক আবির্ভাব বা জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার মানে দাঁড়ায় ধর্মের নামে বা ঈশ্বরের নামে ধরায় ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসাবে গির্জা বা পুরোহিত শ্রেণি যে সার্বভৌম ক্ষমতা ভোগ করত তার অবসান। জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় ছাড়া অন্য কোন অজুহাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা আর দাবি করা যায় না। ইংলণ্ডে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার রূপ হচ্ছে ভোটে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। যে কারণে পার্লামেন্টই ‘সার্বভৌম’ বলে একটা কথার চল আছে। যা নিয়ে আমাদের দেশেও তর্ক চলে। এখান থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে ‘সার্বভৌমত্ব’ মূলত রাষ্ট্র ক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার তর্ক। খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে ঈশ্বরের সার্বভৌমত্ব গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। আধুনিক পাশ্চাত্য রাষ্ট্রের ‘সার্বভৌমত্ব’ খ্রিস্টিয় ধর্মতাত্ত্বিক ধারণারই ইহলৌকিক বিকার কিনা সেটা একালে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তর্ক। ‘সার্বভৌমত্ব’ বা ‘সার্বভৌম ক্ষমতা’র বিচার একালে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

তৃতীয়ত, বিপ্লব একটি প্রক্রিয়া; হঠাৎ একদিনের, এক মাসের বা দুই এক বছরের ব্যাপার নয়। ‘বিপ্লব’ ধারণার এটা হচ্ছে আরেকটি অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ দিক। হঠাৎ হাতে অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে রাজার প্রাসাদ দখল করা নয়। এর জন্য সমাজেরও বিপুল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতির দরকার হয়। বিপ্লবী বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে ন্যায্য ও সিদ্ধ প্রমাণ করার নীতি ও কৌশলের অন্তর্গত। লেনিন যে কারনে বিপ্লবী তত্ত্বচর্চা ও প্রচারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। এ ছাড়া বিপ্লবের সফলতা অসম্ভব।দাবি করা হোত রাজা, পুরোহিত ও চার্চের ক্ষমতা ঈশ্বরের দৈব ক্ষমতারই ইহলৌকিক রূপ। এই দৈব উৎস ও চরিত্রই সার্বভৌম ক্ষমতার ন্যায্যতা হিসাবে জনগণের কাছে স্বীকৃত এবং দৈবগুণেই সিদ্ধ। তাহলে এর বিপরীতে জনগণের ক্ষমতাকে ন্যায্য ও সিদ্ধ করার জন্য নতুন বিপ্লবী বয়ান বিপ্লবীদের করতে হয়েছে। সামন্ত শ্রেণি, রাজা ও গির্জার ক্ষমতার বিরোধী হলেও বিপ্লবী বয়ানে ধর্মকে নতুন ভাবে ব্যাখ্যা করবার প্রয়োজন হয়েছে। যার ফলে ধর্মের নানান ফেরকা, মজহাব ও তরিকারও উদ্ভব ঘটেছে। দেশ ও রাষ্ট্র ভেদে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই ও সংগ্রামে ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের এবং ধর্মের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গীরও নানান রূপান্তর ঘটেছে। ধর্মতত্ত্বেরও বিবর্তন ঘটেছে।

চতুর্থত, দেশ, কাল ও পাত্রভেদে বিপ্লব ইউরোপের ফটোকপি হবে তার কোন যুক্তি নাই। সেই দিক থেকে পাশ্চাত্য চিন্তার পরিমণ্ডলে থেকে বলশেভিক বিপ্লব বা চিনা বিপ্লবের বয়ান সেই দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী যেমন হয়েছে তেমনি ইরানের বিপ্লব সেই দেশের ধর্ম, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের চরিত্র থেকে ভিন্ন কিছু হয় নি। হওয়া আশা করাটাই বাতুলতা। ইরানের বিপ্লব বিপ্লবের ইতিহাসে নতুন কি যুক্ত করল সেটা একালে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। উপেক্ষা করার উপায় নাই।

সশস্ত্রতা ও বিপ্লব

বিপ্লবী রাজনীতি সম্পর্কে বাংলাদেশে প্রচলিত ধারনা হচ্ছে যারা বিপ্লবের কথা বলেন তারা সশস্ত্র ও সহিংস কায়দায় তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করেন। বাস্তবে সশস্ত্রতা ও সহিংসতার চর্চা শুধু বিপ্লবী রাজনীতি করে সেটাও ঠিক নয়। বাংলাদেশে বড় বড় দলগুলোর সশস্ত্র দলীয় তৎপরতা এবং সহিংস চরিত্র দেখলে এটা মনে করার বিশেষ কোন কারন নাই। তবে ওপরের কথাগুলো মনে রাখলে আমরা বুঝব সশস্ত্রতা বা সহিংসতা বিপ্লবী রাজনীতির অন্তর্গত বৈশিষ্ট বা নীতি নয়। একই ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেকে সেনা অভ্যূত্থানকেও ‘বিপ্লব’ বলে থাকেন। ক্ষমতাসীনদের একাংশকে বল প্রয়োগ করে উৎখাত করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেয়। সমাজে ক্ষমতাসীন শ্রেণিরই একটি অংশ বা গোষ্ঠি যখন তাদের প্রতিযোগী বিরুদ্ধ গোষ্ঠি বা অংশকে সশস্ত্র কায়দায় ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে সেটা মোটেও ‘বিপ্লব’ নয়। কারণ সেটা এক শ্রেণির দ্বারা অন্য শ্রেণিকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত, রাষ্ট্রের গাঠনিক ও রাজনৈতিক রূপের কোন মৌলিক পরিবর্তন নয়। রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে অস্ত্রের জোরে কোন গোষ্ঠি বা দল কাকে অস্ত্রের জোরে বা নির্বাচনের মাধ্যমে সরালো বৈপ্লবিক রূপান্তরের দিক থেকে তাতে কিছুই বিশেষ আসে যায় না। বড়জোর সেটা সমাজের ক্ষমতাসীন শ্রেণির বিভিন্ন অংশের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব এবং সেই দ্বন্দ্ব পরস্পরের মধ্যে মীমাংসার ব্যর্থতা হতে পারে। ক্ষমতাবান শ্রেণির পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্ব শ্রমিক, কৃষক ও নিপীড়িত শ্রেণিকেও বিভক্ত করে এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করতে পারে। সেই ক্ষেত্রে যারা নিপীড়িত শ্রেণির পক্ষে রাজনীতি করেন তাদের কাজ হচ্ছে দ্বন্দ্বের চরিত্র ভাল ভাবে বোঝা। দ্বন্দ্বের উৎপত্তি সমাজের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণে ঘটে।

সমাজে ক্ষমতাসীন শ্রেণির বিভিন্ন অংশ সব সবসময়ই পরস্পরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ও সহিংস আক্রমণ জারি রাখে। সেটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালেই আমরা বুঝব। সশস্ত্রতা ও সহিংসতা চর্চার একচেটিয়া রাষ্ট্রের হাতে থাকে। ক্ষমতাসীন শ্রেণির বিভিন্ন অংশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যা ব, আইন আদালত ইত্যাদি – অর্থাৎ বল প্রয়োগের রাষ্ট্রীয় হাতিয়ারগুলো ব্যবহারের জন্য নিরন্তর নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। রাষ্ট্রের কেন্দ্রীভুত সশস্ত্র শক্তির সমর্থন ছাড়া বাংলাদেশের মতো দেশে ক্ষমতায় যাবার অন্য কোন বিকল্প নাই। ফরাসী বিপ্লব বৈপ্লবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের যে মানে তৈরি করেছে – বিপ্লব কথা্টার যে অর্থ তৈরি করেছে -- সেটা নিছক সশস্ত্র ও সহিংস কায়দায় ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে সেনাবাহিনী কিম্বা অন্য কারো ক্ষমতা দখল নয়। সেনা অভ্যূত্থান আর বিপ্লব সে কারনে সমার্থক নয়।

যে দিকগুলো ইউরোপের বিপ্লব প্রসঙ্গে এখানে আমরা আলোচনা করতে পারিনি তার মধ্যে রয়েছে বিপ্লব সংক্রান্ত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা ও শ্রেণির প্রশ্ন। বিভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণি এবং আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে তাদের সম্ভাব্য রাজনৈতিক ভূমিকা। মার্কস, লেনিন, মাও জে দং প্রমুখের দিক থেকে বিপ্লবের একটা আর্থ-সামাজিক মানে আছে। সমাজে উৎপাদন সম্পর্ক যখন অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে, দ্রুত ও ত্বরান্বিত বিকাশ অসম্ভব হয়ে ওঠে, তখন প্রতিবন্ধতা সৃষ্টিকারী শ্রেণীকে উৎখাত করবার নামই ‘বিপ্লব। ফরাসি দেশে সামন্ত শ্রেণি ও তাদের ক্ষমতার রাজনৈতিক রূপ ‘রাজতন্ত্র’ সমাজের বিকাশের জন্য বাধা হয়ে উঠেছিল, রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে তাদের উৎখাত করে রাষ্ট্র ও রাজনীতির নতুন গণতান্ত্রিক বিন্যাস জরুরি হয়ে পড়েছিল। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে যারা আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে গতিশীল করবার নেতৃত্ব দিচ্ছিল তারা ছিল ‘বুর্জোয়া’ শ্রেণি। সামন্ত শ্রেণির শাসন শোষণ থেকে মুক্তি পাবার জন্য শ্রমিক, কৃষক ও মজলুম জনগণ এই বুর্জোয়া শ্রেণিকেই সমর্থন দিয়েছিল। ফরাসি বিপ্লবের সামন্ত শ্রেণির পরাজয় ঘটে এবং বুর্জোয়া শ্রেণি রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে ‘গণতন্ত্র’ কায়েম করে। অপরদিকে সামন্ততান্ত্রিক আর্থ-সামাজিক সম্পর্ক উৎখাত করে ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির বিকাশ নিশ্চিত করে।

যেহেতু বুর্জোয়া শ্রেণির কাজ পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম ও গতিশীল করা, এজন্য ‘বুর্জোয়া’ বলতে আমরা সাধারণত ধনি শ্রেণি বুঝি। কিন্তু ‘বুর্জোয়া’ কথাটা বিপ্লবী রাজনীতির পরিভাষা হিসাবে শুধু অর্থনৈতিক বর্গ নয়, মূলত রাজনৈতিক বর্গ। অর্থাৎ এই পরিভাষাটিকে বুঝতে হবে তাদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ভূমিকার দিক থেকেও। এই বর্গের মধ্যে অর্থনৈতিক অবস্থা ও রাজনৈতিক চেতনা কিভাবে সম্বন্ধযুক্ত? নাকি তারা আলাদা? অর্থনৈতিক শ্রেণি এবং তাদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চেতনার সম্পর্ক পুরানা একটি তর্ক। যেমন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শ্রমিক হলেই কি শ্রমিক শ্রমিকের চেতনা ধারণ করে? অর্থনৈতিক অবস্থা আর শ্রেণী চেতনার সম্পর্ক কি তাহলে? সেই তর্কের এখনও মীমাংস হয় নি। সেই আলোচনাও এখানে করা হয় নি।

এই তর্কটা বিভিন্ন ভাবে নানান দিক থেকে আজকাল করা হচ্ছে। যারা ‘বৈপ্লবিক’ পরবর্তনে আগ্রহী ও বিপ্লবী রাজনীতি সম্পর্কে নতুন ভাবে বিচার ও নতুন পথ অন্বেষণের কাজ করছেন  পুরানা ধ্যান ধারণা কেন্দ্র করে দানা বাঁধা আন্তরিক তর্কগুলোর সঙ্গে তাদের পরিচিত হয়ে ওঠা জরুরি। এই লেখাটি সেই সকল তর্কে প্রবেশের উপক্রমণিকা মাত্র। বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে, যা এড়ীয়ে যাবে উপায় নাই বললেই চলে। যেমন  বিপ্লবের এজেন্ট বা কর্তাসত্তা নির্ণয়ের উপায় কি? কাজটা কি শুধু শহরের শ্রমিকরাই করবেন? তাহলে কি গণতান্ত্রিক বিপ্লবে ‘উই দ্য পিপল...’ কথাটার আর কোন তাৎপর্য বা ভূমিকা নাই? থাকলে সেটা কি? পরিবর্তন যারা ঘটাবেন সেই ‘জনগণ’ কারা? বিপ্লবের এজেন্সি বা কর্তাসত্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু অর্থনৈতিক অবস্থানই কি একমাত্র বিবেচ্য নাকি ধর্মচিন্তাসহ মতাদর্শ, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি সব কিছুকেই আমলে নেওয়া জরুরী।

বলাবাহুল্য বাস্তবে বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির মধ্যে কিভাবে প্রকাশিত হচ্ছে তাকে বাস্তবিক ভাবে বোঝাটাই প্রাথমিক কাজ। বাংলাদেশে সেই দ্বন্দ্ব ধর্ম নিরপেক্ষতা বনাম ইসলামপন্থা হিসাবে হাজির হোল কেন? এর উত্তর আগাম মাথায় তৈয়ার করে রাখা মতাদর্শের খোপে ফেলে বা মানদণ্ডে মেপে বোঝা অসম্ভব -- সেই মতাদর্শ ধর্ম নিরপেক্ষ প্রাচীন সেকুলার চিন্তা হোক, কিম্বা হোক ধর্মতত্ত্ব। তার জন্য বাস্তবে কি ঘটছে তাকে বাস্তবোচিত ভাবেই বুঝতে হবে। সেটা বুঝতে হলে আমাদের প্রাচীন পরিভাষার বোঝা বহন করা আদৌ জরুরী কিনা আমাদের তা ভেবে দেখতে হবে।

সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, বিশ্বাস, মতাদর্শ চর্চা থাকবেই। কারণ মানুষ কথাসম্পন্ন চিন্তাশীল প্রাণী, তাহলে কিভাবে এই ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যকে মান্য করেও সকলকে ধারণ করা যায় সেটা একটা ব্যবহারিক প্রশ্ন, কোন মতাদর্শের সত্য মিথ্যা যাচাই ও অন্যকে বল প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে চাপিয়ে দেবার মামলা নয়। এই পরিপ্রক্ষিতেই 'রাজনৈতিক পরিসর' নির্মাণ কথাটা বলা হয়। আদৌ বাংলাদেশে এর কোন উপযোগিতা আছে কিনা আমরা পর্যালোচনা করে দেখতে পারি। তবে গ্রিক-খ্রিস্টীয় পরিমণ্ডলে রাজনীতি ও আধুনিক রাষ্ট্র সংক্রান্ত  যে সকল ধ্যান ধারণা গড়ে উঠেছে তাদের উপযোগিতা নিয়ে  তর্ক একালে অনেক তীব্র হয়ে উঠেছে। বলা হচ্ছে আমরা এখন রাজনৈতিক সমাজে বাস করছি না, বরং  বাস করছি নজরদারি, শাস্তি, শৃংখলা ও গণনিয়ন্ত্রণের কারিগরির মধ্যে নিত্য বিভিন্ন স্তরে উৎপাদিত হতে থাকা 'কর্তা'দের  মধ্যে, যাদের সম্পর্কে 'জনগণ' কথাটা আগের মতো আর খাটে না। এখানে সেই বিষয়ে আলোচনা করি নি।  একালে ক্ষমতা, সার্বভৌমত্ব, নজরদারি, সাধারন মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখবার জন্য শুধু রাষ্ট্রের আইন শৃংখলা ব্যবস্থার স্তরে নয়, বরং সমাজের সকল ক্ষেত্রে শাস্তি ও শৃংখলার বিবিধ কারিগরি নিয়ে বাস্তব পর্যালোচনার চেষ্টা চলছে। বলা হচ্ছে ক্ষমতা এক জায়গায় ঘনীভূত বা কেন্দ্রীভূত নয়, বরং তার কারবার সর্বত্র।  ধ্যান ধারনার বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে বিপুল পরিবর্তন ঘটেছে। বিপ্লবের পুরানা চিন্তা দিয়ে যা আর বুঝবার উপায় নাই বললেই চলে। এখানে বা অন্য কোথাও আগামি কোন লেখালিখিতে সে বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছা রাখি। তার ক্ষেত্র তৈরি করাই এই লেখাটির উদ্দেশ্য।

১৬ জুন, ২০১৭, ২ আষাঢ়, ১৪২৪, শ্যামলী।