আমাদের কী আর বলার থাকতে পারে!


ফরহাদ মজহার || Thursday 14 January 10

পরাশক্তি হিসেবে ভারত বুঝিয়ে দিতে চাইছে আমরা যে সরকার বা ব্যক্তিকে সমর্থন করি একমাত্র সেই সরকারের মাধ্যমে বা সেই ব্যক্তির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক করব। তাও শুধু আমাদের লাভালাভের কথা বিবেচনা করে। ভারতের নিরাপত্তা এবং আগামী দিনে তার অর্থনৈতিক বিকাশ বহাল রাখার দিক থেকে এটা ভুল রাজনীতি। ভারতের জন্য এটা বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে।

দুটো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সম্পর্ক হঠাৎ করে একজন প্রধানমন্ত্রীর সফরে ঠিক হয়ে যায় না। দুটো রাষ্ট্রের সম্পর্ক করা বা না করা রাষ্ট্রনায়কদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপারও নয়। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতি বা রাষ্ট্রের সামগ্রিক বৈষয়িক পরিস্থিতি, সামরিক শক্তি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শক্তি ও দুর্বলতা-- অর্থাৎ সামগ্রিক বাস্তবতার মধ্যে দুই দেশের সম্পর্ক ভালো হবে কি হবে না নির্ভর করে। পরস্পরের প্রতি দুই দেশের জনগণের মনোভাবও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই সময়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন। চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশ এবং পরাশক্তি হয়ে ওঠার প্রতি ভারতের ঝোঁক। বিশেষ করে ভারতের শাসক শ্রেণীর নিজেদের আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে হাজির করার বাসনা। ইত্যাদি বিষয় আমাদের বিবেচনার মধ্যে রেখেই ভারত ও বাংলাদেশের মতো দুটো অসম রাষ্ট্রের সম্পর্ক রচনার সম্ভাবনা ও বিপদগুলো আমাদের বিচার করতে হবে।

শেখ হাসিনার ভারত সফর ও দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত তিনটি চুক্তি এবং দুটি ঘোষণাকে আমি ইতিবাচক বলে গণ্য করি না। কিন্তু এতে আমি অবাক নই। একটি শক্তিশালী দেশের অধীনস্থতা মানা ও নগ্ন বশ্যতা স্বীকারের অধিক কিছুই এসব প্রমাণ করে না। ভারত বা বাংলাদেশের কারোরই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এখানে নেই। একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এই বশ্যতা মানতে বাংলাদেশকে বাধ্য করা হয়েছে। সে প্রক্রিয়ারই ফল মহাজোটের ক্ষমতারোহণ, শেখ হাসিনার ভারত সফর এবং দুই দেশের যৌথ ঘোষণা। দুটো স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মধ্যে সম্পর্ক রচনার জন্য যে ইতিবাচক চিহ্ন হাজির থাকা জরুরি ছিল সেই মূল ইস্যু-- যেমন পানি ও প্রাণ রক্ষার প্রশ্ন সেটা আদত জায়গাটাই এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কোন কাজ ভারত করবে না--এ ধরনের ঢালাও মন্তব্য ফারাক্কার অভিজ্ঞতার পর কাটা গায়ে নুনের ছিটার মতো। তাছাড়া সীমান্তে ভারতের ক্রমাগত বাংলাদেশীদের হত্যা তো আছেই। একটি ছোট দেশকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে খাঁচাবন্দি করা আর যাই হোক বন্ধুত্বের নিদর্শন নয়। এ সফরে একতরফা ভারতীয় স্বার্থ রক্ষার অধিক কিছুই হয়নি।

নব্বই দশকের শেষের দিক থেকে ভারত বাংলাদেশকে একটি সন্ত্রাসী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিভাবে প্রমাণ করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। জোট সরকারের শাসনামলের চরম অদূরদর্শিতার কারণে ভারত ও আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থকরা সফলও হয়েছে। মার্কিন-ভারত-ইসরাইলি অক্ষশক্তির যে নির্মাণ ২০০০ সাল থেকে আমরা দেখছি তারও সফল বিকাশ ঘটেছে। এর বিপরীতে যারা ইসলামী রাজনীতির কথা বলেন তারা আর্থ-সামাজিক ও আইনি পরিমণ্ডলে ইসলামের সার্বজনীন আবেদন কখনই হাজির করেননি। বরং সবসময়ই তাকে তুচ্ছ গণ্য করেছেন। ইহলৌকিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অর্থহীন প্রমাণ করার জন্য ধর্মভিত্তিক আত্মপরিচয়ের পারলৌকিক রাজনীতির চর্চা হিসেবে ইসলামকে ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের মুখেও যে ইসলামকে সামনে হাজির করা হয়েছে সেটা একটি সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। এ রাজনীতি জনগণকে ঐকবদ্ধ নয় বরং বিভক্ত করেছে। বিশেষত ভারত যখন এই যুদ্ধনীতির ওপর সওয়ার হয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছে তখন দেশের ভেতরে তাদের একটা সমর্থক শ্রেণীও গড়ে উঠেছে সহজেই। তার ফল হয়েছে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর।

একটি প্রশ্ন এখনও রহস্য হয়ে আছে। একটি তথাকথিত ইসলামপন্থী জোট ক্ষমতায় থাকার সময় ‘ইসলামী জঙ্গিবাদ’ বাংলাদেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল কেন? এর কারণ কি? কেন জোট সরকার নিজেদের ক্ষমতা দুর্বল করবে? কেন বাংলাদেশ অস্থিতিশীল করবে? এটা হিসেবে মেলে না। বিশেষত যখন ভালো-মন্দে মিশিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আস্তে আস্তে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ইসলামী জঙ্গিদের তৎপরতা কমে যায় তাহলে ইসলামী জঙ্গিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ কিংবা তাদের রাজনৈতিক মিত্র ভারতের কোন সম্পর্ক রয়েছে কিনা সেটাই বরং প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। গুরুতর প্রশ্ন হয়েই প্রত্যাবর্তন করবে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও সাংঘর্ষিক রাজনীতির অজুহাতে বাংলাদেশ বেসামরিক লেবাসে সামরিক শাসন এসেছে, প্রায় দুই বছর চলেছে। আর সেই অবৈধ, অগণতান্ত্রিক ও সামরিক স্বৈরতন্ত্রের হাত ধরেই শেখ হাসিনা ও তার মহাজোট ক্ষমতায় এসেছে।

ভারতের দিক থেকে শেখ হাসিনার ক্ষমতারোহণ বা তাকে ও তার জোটকে ক্ষমতায় বসাতে পারা একাত্তর সালের মতোই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি অসাধারণ সাফল্যই বলতে হবে। একটি সুবর্ণ মুহূর্ত। যার পূর্ণ সুযোগ ভারত নেবে এবং নিচ্ছে। বিস্মিত হওয়ার কোন কারণ নেই যখন আমরা দেখি মংলা বা চট্টগ্রাম বন্দর ভারতকে ‘ব্যবহার’ করতে দেয়া হচ্ছে। ভারত নানাভাবে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট আদায় করে নিচ্ছে। ভারতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো এতই স্পষ্ট যে আলাদা করে যৌথ ঘোষণা নিয়ে আমার বিশেষ কিছু বলার কিছুই নেই। শুধু পাঠকদের ভেবে দেখতে বলি, এই ‘ব্যবহার’ করার অনুমতি আদায় করার আগেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে তছনছ হয়ে আছে। নাকি করে দেয়া হয়েছে? বাংলাদেশ কার্যত অরক্ষিত এবং টিকে আছে ভারতের দয়ায়। মংলা ও চট্টগ্রাম দিয়ে ভারত কি নেবে না নেবে সেটা এখন একান্তই ভারতীয় বিষয় হয়ে থাকবে। এমনকি শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকবেন কি থাকবেন না সেটাও ভারতের দয়ার ওপরই নির্ভর করবে। যেখানে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে মূলত ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী-- বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কী আসছে-যাচ্ছে তার তদারকি তো তারাই করছে। সে ক্ষেত্রে মংলা আর চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ায় নতুনভাবে আশ্চর্যের কিছু নেই। অনেকে ঠিকই প্রশ্ন তুলেছেন বন্দর ব্যবহার করতে দেয়া এ সফরের আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সরকার পক্ষে কেউ কেউ ছিল বলে দাবি করছেন। কিন্তু আমরা জানি না। কোন সংবাদপত্রে তা প্রকাশিত বা আলোচিত হতে শুনিনি। জাতীয় সংসদেও কেউ আলোচনা করেছেন দেখিনি। অবশ্য বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাই যখন সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারী তখন সংসদে আলোচনা হওয়া না হওয়া অর্থহীনও বটে।

এতে আমি বিস্মিত নই। ভারত মূলত তার নিজের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক ক্ষেত্রে নিজের শক্তি, দর্প ও প্রতিষ্ঠার জন্য যে রাজনৈতিক সুযোগ এবং মুহূর্তের জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছিল তারই ফল তারা নগদে এখন তুলে নিচ্ছে। এই পরিস্থিতির জন্য নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগ বা মহাজোটকে একা দায়ী করা যাবে না। এর দায়-দায়িত্ব অবশ্যই জোট সরকারকেও নিতে হবে। একই সঙ্গে তার দায়ভাগ বাংলাদেশের জনগণকেও নিতে হবে। যদি তারা ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হতে চায় তাহলে এটাই বাস্তব ইতিহাস। খেয়াল রাখতে হবে এই সফরে শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছেন ভারত ও বাংলাদেশ যৌথভাবে রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করবে। যেহেতু দুই দেশের সরকার ও রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত অতএব রবীন্দ্র জয়ন্তী সরকারি ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানই হবে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক নজরুল ইসলাম নয় কেন? স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণ রবীন্দ্রনাথকে অপরিসীম শ্রদ্ধা জানিয়ে তার গানকে তাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করতে কার্পণ্য করেনি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে কি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে মেনে নিতেন? তিনি ভারতীয় কবিও বটে। অখণ্ড ভারতের প্রতীক ও প্রতিনিধি। এই পরিপ্রেক্ষিতে যদি আমরা দেখতাম ভারত আরেকজন মহৎ বাংলাভাষী কবি নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী একসঙ্গে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাহলে সন্দেহ বা সংশয়ের কিছু ছিল না। কিন্তু এ ঘোষণায় রবীন্দ্রনাথকে যেমন বিতর্কিত এবং ছোট করে ফেলা হল একই সঙ্গে কূটনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার অখণ্ড ভারতনীতির পরাকাষ্ঠাই আমরা দেখলাম। সাংস্কৃতিক কূটনীতি ভারতের শাসক শ্রেণীর মনোবাঞ্ছা পূরণ করবে। শেখ হাসিনা হয়তো এভাবে চাননি। ভারতের শাসক শ্রেণী তার হাত মোচড়াতেই পারে। কিন্তু সত্য এই যে অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার পথে সাংস্কৃতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে এই এক ধাপ অগ্রযাত্রা ঘটল। সাধু!

তিনটি সরকারি চুক্তি ও দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের চেয়ে এই লক্ষণগুলো অনেক বেশি অর্থবহ। যারা দাবি করেছেন এই ধরনের চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর দুই দেশের ‘আস্থার সম্পর্ক’ দৃঢ় করবে তাদের সঙ্গে একমত হওয়ার সুযোগ একদমই নেই। দুটো দেশ বা রাষ্ট্রের সম্পর্ককে ব্যক্তির সম্পর্ক রচনার ব্যাপার হিসেবেই অনেকে দেখছেন। যেমন ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধী আর শেখ মুজিবরের কন্যা শেখ হাসিনার সম্পর্ক। শেখ হাসিনা বলেই ভারত নাকি বাংলাদেশের প্রতি দয়ালু। অতি সরলীকরণের বিপদ সম্পর্কে আমাদের সাবধান থাকা চাই। এ ধরনের ভাবনার পদ্ধতিগত মুশকিল সম্পর্কে আমি আগেই বলেছি। আমার মনে হয় সম্পূর্ণ উল্টোটাও ঘটতে পারে। তাছাড়া এর আগে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশ নিজের দায় পালন করেছে কিন্তু ভারত নানা অজুহাতে করেনি। সন্ত্রাসবাদবিরোধী তিনটি চুক্তি মূলত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনন্ত যুদ্ধের নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ভারতের নিজের দেশের বিদ্রোহীদের দমন করার জন্যই। যদি একতরফা ভারতেরই লাভ হয় তাহলে আস্থাটা কিসের? আস্থাটা কার সঙ্গে কার?

পরাশক্তি হিসেবে ভারত বুঝিয়ে দিতে চাইছে আমরা যে সরকার বা ব্যক্তিকে সমর্থন করি একমাত্র সেই সরকারের মাধ্যমে বা সেই ব্যক্তির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক করব। তাও শুধু আমাদের লাভালাভের কথা বিবেচনা করে। ভারতের নিরাপত্তা এবং আগামী দিনে তার অর্থনৈতিক বিকাশ বহাল রাখার দিক থেকে এটা ভুল রাজনীতি। ভারতের জন্য এটা বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে।

শেখ হাসিনা ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। পুরস্কার নিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘ইন্দিরা গান্ধী শুধু আমার নেতাই নন, তিনি আমার মায়ের মতো। বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের শান্তির জন্য আমি কাজ করে যাব। চিরজীবী হোক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক (আমার দেশ ১৩ জানুয়ারি ২০১০)। মুজিব পরিবার অবশ্যই ইন্দিরা গান্ধীর পরিবারের কাছে কৃতজ্ঞ। সন্দেহ নেই। কিন্তু দুটো রাষ্ট্রের সম্পর্ক দুটো পরিবারের-- মা আর মেয়ের সম্পর্কে পর্যবসিত হোক-- এটা বাংলাদেশের কি জনগণ চাইতে পারে? সবকিছুই যদি ভারতের স্বার্থেই শেখ হাসিনা করে থাকেন তাহলে কি তিনি বাংলাদেশের স্বার্থ তার পারিবারিক কৃতজ্ঞতার দায় শোধ করার জন্যই বিকিয়ে দিচ্ছেন। এই প্রশ্নের মুখোমুখি তাকে হতে হবে। জনগণই এই প্রশ্ন তুলবে।

শেখ হাসিনার চারদিনের সফর শুরু হওয়ার আগে নিউইয়র্ক টাইমসে ফিলিপ বাওরিং একটি লেখা লিখেছেন, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রতিফলন স্পষ্ট। দেখুন (India's opening with Bangladesh, ১২ জানুয়ারি ২০১০) তিনি বলছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানটাই বাংলাদেশকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল করে রাখে। তবুও বাংলাদেশকে ভারত সবসময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে সেটা এখন ক্রমে কঠিন হচ্ছে। এ কারণে যে ভারত টের পাচ্ছে তার নিরাপত্তার প্রশ্ন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রচনার সঙ্গে জড়িত। বিশেষত ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তের বিদ্রোহ। তিনটি কারণে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিপদ ভারতের জন্য বেড়েছে। এক. অরুণাচল প্রদেশের বৃহৎ অংশ চীন এখন নিজের অর্থাৎ তিব্বতের অংশ বলে দাবি করছে। দুই. এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতের জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতা আন্দোলন। চীন এখন বিদ্রোহীদের সাহায্য করছে না। কিন্তু করার সম্ভাবনা বাড়ছে। শক্তির ভারসাম্যে রূপান্তর ঘটলে করতেও পারে। ফিলিপ বাউরিং আসাম এখন ভারতের জন্য কাশ্মীরের মতোই সমস্যা বলে দাবি করেছেন। তৃতীয় কারণ হচ্ছে বিহার ও ঝাড়খণ্ডের অনুন্নয়ন। এর ফলে মাওবাদী রাজনীতির শক্তি বৃদ্ধি ঘটছে এবং তাদের সঙ্গে নেপালের মাওবাদী বিপ্লবীদের যোগাযোগ ঘটছে। এই বাস্তবতা থেকে পরিষ্কার যে নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই ভারতকে বাংলাদেশের সঙ্গে একটা সম্পর্ক রচনা করতেই হবে। আমি যতটুকু ফিলিপ বাউরিংয়ের লেখা বুঝেছি তাতে পরিষ্কার তিনি তাগিদটা ভারতেরই-- সে দিকেই জোর দিয়েছেন। জোর দিয়েছেন ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থেই। এ দিক থেকে ভারতের প্রতি তার পরামর্শ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রতি ‘উদার’ হওয়ার। শেখ হাসিনা উলফার নেতাদের ধরে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে ইতিমধ্যেই তাদের প্রিয়ভাজন হয়েছেন। শেখ হাসিনার প্রতি দিল্লির ঔদার্য প্রদর্শন এখন ভারতের স্বার্থেই জরুরি।

বাউরিংয়ের মতে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি, সমুদ্র সীমানা নির্ধারণ কিংবা ট্রানজিটের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যু হচ্ছে পানি। ভারত যেভাবে বাঁধ নির্মাণ করে বাংলাদেশকে পানি থেকে বঞ্চিত করছে তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়াটা তার ভাষায় 'legitimate'-- খুবই সঙ্গত। পানি বাংলাদেশের জনগণের বাঁচা-মরার সঙ্গে সম্পর্কিত, বাউরিং সেটা স্বীকার করেছেন। পানি বাংলাদেশের lifeblood-- প্রাণরক্ষার জন্য রক্ত সঞ্চালনের মতো।

এই হচ্ছে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একজন প্রবক্তার ভাষ্য। যিনি বলা বাহুল্য ভারতের স্বার্থের পক্ষেই আছেন। কিন্তু এরপরও শেখ হাসিনা পানিসংক্রান্ত কোন নীতিগত অবস্থান বা কোন কার্যকর প্রতিশ্র“তি আদায় করে আনতে পারেননি। এর চেয়ে লজ্জা ও পরাভবের আর কিছু হতে পারে না। বশ্যতার এর চেয়ে বড় নজির আর কী হতে পারে?

জনগণের প্রাণ রক্ষার প্রশ্নকে আমরা যদি মা আর মেয়ের সম্পর্কে পর্যবসিত করি তখন সরকার আর রাষ্ট্র বলে কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু এটাই কি আওয়ামী রাজনীতির মর্মশাঁস নয়। এই রাজনীতির কাছে বাংলাদেশে পারিবারিক সম্পত্তির অধিক কিছু কি?

আমাদের আর কী বলার থাকতে পারে?

৩০ পৌষ ১৪১৬। ১৩ জানুয়ারি ২০১০। শ্যামলী