জুলাই গণঅভ্যুত্থান: সনদের সীমাবদ্ধতা ও গণপরিষদের দাবী


বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ইতিহাসের এক যুগান্তকারী অধ্যায়। কোনো রাজনৈতিক দলের পতাকা ছাড়াই রাস্তায় নেমেছিল ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, বেকার যুবক এবং প্রান্তিক মানুষ। তাদের উপস্থিতি রাষ্ট্রক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। দাবি ছিল স্পষ্ট—দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র, সমতা, এবং জনগণের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা। এই ঢেউ শুধু ক্ষমতার চাকা পাল্টায়নি, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। ফ্যাসিবাদ, ফ্যাসিস্ট শক্তি ও ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা থেকে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনের বাসনাই ছিলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য।

অভ্যুত্থানের পর অন্তবর্তীকালীন সরকার দ্রুত সংস্কার কমিশন গঠন করে। তাদের আলোচনার ফলাফল হলো “জুলাই সনদ”—যা রাষ্ট্র সংস্কারের পথনির্দেশক দলিল হিসেবে প্রচারিত হচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই দলিল কি সত্যিই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত লড়াইয়ের প্রতিফলন, নাকি রাজনৈতিক ও অভিজাত নেতৃত্বের কলমে লেখা মাত্র? জুলাই অভ্যুত্থানের প্রাণ ছিল জনগণ, কিন্তু জুলাই সনদ রচিত হয়েছে টেবিলপাশের চুক্তির মাধ্যমে। গণমানুষের অংশগ্রহণের অভাব এই দলিলকে দুর্বল করেছে, স্বতঃস্ফূর্ত লড়াইয়ের চেতনা প্রতিফলিত হয়নি।

অন্যদিকে ৮ই অগাস্টের সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবকে বৈধকরণের মাধ্যমে লুটেরা-মাফিয়া বন্দোবস্ত পাকা করার পথ সুগম করে দিয়েছে এই জুলাই সনদ। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত গণসার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে গণপরিষদের মাধ্যমে জনগণকে ক্ষমতায়িত করা হয়। কিন্তু আমরা দেখছি নতুন বাংলাদেশের নামে জুলাই সনদকে লুটেরা-মাফিয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা বাঁটোয়ারার উপায় বানানো হয়েছে। জুলাই সনদ ও খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের ন্যায্যতা ও বৈধতা গনসার্বভৌমত্ব। জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিমুহূর্তে চর্চা এটাই এই সরকার ও নতুন গণপরিষদের ভিত্তি রচনা করতে পারে। এটা আইন ও রাজনীতির ইতিহাসেও সর্বজনস্বীকৃত। এছাড়া যে কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করা জনগণের সাথে বেঈমানি ও বিশ্বাসঘাতকতা বলেই পরিগণিত হবে। 

 

ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত পাকিস্থানের গণপরিষদ সদস্যরা ১৯৭২ সালের সংবিধান লিখেছিলেন। কিন্তু এটি বাস্তবে হয়ে দাঁড়ায় একদলীয় আধিপত্যের দলিল। শ্রমিক, কৃষক, সংখ্যালঘু বা বিরোধী কণ্ঠের প্রতিফলন সেখানে ছিল না। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন—সবই কার্যত শাসকদলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলস্বরূপ, ১৯৭৫ সালের বাকশাল, সামরিক অভ্যুত্থান, এবং ধারাবাহিক সংশোধনী—সবই এই সীমাবদ্ধ কাঠামোর ফল।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানও একই শিক্ষা দেয়। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমেছিল, কিন্তু ক্ষমতা পুনরায় রাজনৈতিক দলের হাতে চলে আসে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে পুরানা সংবিধানের সংস্কারের নামে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে জনগণকে প্রতারিত করা হয়। ফলে, জনগণের আকাঙ্ক্ষা দলিলে রূপান্তরিত হতে পারেনি। জুলাই সনদের নামে আবারও জনগণকে লুটেরা-মাফিয়া রাজনৈতিক দলের অধীনস্ত করার মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করা যাবে না।

বিশ্ব ইতিহাসে দেখা যায়, বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন গঠনতন্ত্র লেখার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ হলো গণপরিষদ নির্বাচন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ পতনের পর নির্বাচিত গণপরিষদ কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ, নারী, শ্রমিক এবং সংখ্যালঘুর সমন্বয়ে সংবিধান রচনা করে। জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণই তার বৈধতা ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেছে। আইসল্যান্ডে ২০০৮ সালের আর্থিক ধসের পর নাগরিকদের ভোটে গঠিত সংবিধান কাউন্সিল সাধারণ মানুষকে যুক্ত করে খসড়া তৈরি করেছিল। যদিও রাজনৈতিক কারণে তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, তবু এটি দেখিয়েছে সংবিধান লেখা রাজনীতিকদের কাজ নয়, এটা জনগণের অধিকার।

নেপালে দীর্ঘ আন্দোলন ও গৃহযুদ্ধের পর গণপরিষদ নির্বাচন করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। গণপরিষদ প্রক্রিয়াই নেপালকে নতুন রাষ্ট্র কাঠামো দিয়েছে। ফরাসি বিপ্লবও এ শিক্ষা দেয়—রাজা ও অভিজাতদের সীমাবদ্ধ প্রক্রিয়ার চাপে জনগণ ন্যাশনাল কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি গড়ে তোলে, যা নতুন সংবিধান তৈরি করে।

জুলাই সনদের দুর্বলতা স্পষ্ট। জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নেই। রাজনৈতিক দল ও অভিজাত নেতৃত্বের প্রভাব প্রবল। স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থানের চেতনা প্রতিফলিত হয়নি। জনগণের নতুন ভাবে নিজেকে নিজে গঠন করবার বদলে কেবল সংস্কারমূলক প্রস্তাবের স্তূপ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করতে চায়, তবে গণপরিষদ নির্বাচন অপরিহার্য। এতে শ্রমিক, কৃষক, নারী, সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি অংশ নেবে। জনগণ জানবে, তাদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি সংবিধান লিখছে। দলিল কেবল আইনি নয়, একইসঙ্গে জনগণের সামষ্টিক বাসনা হিসাবে হাজির হবে। অভ্যুত্থানের স্বতঃস্ফূর্ত শক্তি সংবিধানে রূপান্তরিত হবে এবং সংবিধানের স্থায়িত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।

অতীত ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, অভিজাত-নেতৃত্বাধীন সংবিধান কখনো স্থায়ী সমাধান দেয় না। বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধান, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরের কাঠামো এবং জুলাই সনদ—সবই দেখিয়েছে, যদি জনগণ না থাকে, সংবিধান দুর্বল হয়, আর রাষ্ট্র পড়ে সংকটে। আজকের প্রধান প্রশ্ন হলো, জুলাই অভ্যুত্থান কি কেবল ক্ষমতার পালাবদল ঘটাবে, নাকি জনগণের হাতে রাষ্ট্র ফিরিয়ে দেবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে গণপরিষদ নির্বাচনের মধ্যেই। জনগণ যদি নিজেদের ভোটে প্রতিনিধি পাঠিয়ে নতুন গঠনতন্ত্র লিখতে পারে, তবেই জুলাই অভ্যুত্থান হবে প্রকৃত গণবিপ্লবের সূচনা। অন্যথায়, জুলাই সনদ কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়ে থাকবে লুটেরা-মাফিয়াদের শাসন, জনগণের নয়।


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।