গণবিরোধী ও গণপন্থী রাজনৈতিক ধারা

১
পলাশি ও বক্সারে সুবে বাংলার সামন্ত নওয়াবেরা ব্রিটিশ বেনিয়াদের হাতে পরাজিত হওয়ার পরে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব চলে যায় মুনাফাকে খোদার আসনে বসানো ব্রিটিশ বেনিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। তারা সমৃদ্ধ বাংলার পাট, চিনি, চা, মশলা ইত্যাদি লুটপাট শুরু করে আর ব্যবসায় প্রতিযোগিতা ঠেকাতে ধ্বংস করে এই অঞ্চলের লাভজনক কৃষি (চাপিয়ে দেয় নীল চাষ) ও জগদ্বিখ্যাত মসলিনের মতো শিল্পসমূহ। এসব লুটপাট চালু রাখতে ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনী পালতে তারা জবরদস্তি অতি উচ্চহারে খাজনা আদায় করে এই দেশের কৃষকের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে দুর্ভিক্ষকে নিয়মিত ঘটনায় পরিণত করে। খাজনা আদায়ের কাজ সহজ ও দ্রুতগামী করতে সতেরোশো নব্বইয়ের দশকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্যদিয়ে বাংলায় ব্রিটিশ প্রভুদের লুটপাটের দালাল ও শোষক জমিদারশ্রেণী স্থাপিত হয়। আমাদের বাপ, দাদাদের পিটায়ে খাজনা আদায়ে জমিদারদের সহায়তা করতে তৈরি করা হয় জনতার বুক বরাবর গুলি করা পেটোয়া পুলিশ, ও সর্বদা ‘শাস্তি’ (Punishment) তথা নির্বাসন ও ফাঁসি দিতে এক পায়ে খাড়া ব্রিটিশ কোর্ট-কাছারী। জমিদারেরা যেমন লুটপাটে ব্রিটিশ জালেমদের সরাসরি সহযোগী ছিলো, ইংরেজি শিক্ষিত পেটোয়া পুলিশ অফিসার আর আদালতের জজ-ব্যারিস্টার, সরকারি অফিস কেরানিও ছিলো বিদেশি জালেমদের শাসন-ত্রাসনের সহযোগী। বিদেশি প্রভুর ভাষায়, তার শিক্ষায় শিক্ষিত ভদ্রলোক বাবুরা আমাদের জনগণকে দেখতে শিখেছে তাদের প্রভুদের চোখেই, অসহায়, বর্বর, স্বাধীন চিন্তায় অক্ষম ছোটলোক হিসেবে। রাজা রামমোহন রায়ের মতো মনীষীগণ ইউরোপ থেকে আত্মপরিচয়কে আরো সমৃদ্ধ করার রসদ খুঁজলেও জালিমিব্যবস্থায় জুলুমবাজের থেকে মজলুমের উপকৃত হওয়ার ব্যবস্থা সামান্যই।
ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাবুদের ডেমোক্রেসি, লিবারেলিজমের ধার করা ধারণা আর বিদেশি প্রভুর সাথে লুটপাটের ভাগাভাগি নিয়ে দর কষাকষি থেকে গড়ে ওঠে উঁচু শ্রেণীর গণবিমুখ শ্রেণীস্বার্থের রাজনীতি। জমিদারেরা খোলে Landholders Association, যা খাজনার সুবিধাজনক রেট থেকে শুরু করে নানা বিষয়ে জমিদারদের স্বার্থ আদায় করতে চাইতো ব্রিটিশ প্রভুদের সাথে বার্গেইনিং করে। হিসাব বরাবর না হলেই ব্রিটিশদের থেকে শেখা ডেমোক্রেসি আর লিবারেলিজমের চোস্ত বুলি দিয়ে রাজনীতিতে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে (অবশ্যই নিজেদের শ্রেণীস্বার্থে) এই ভদ্রলোক শ্রেণী। চাপিয়ে দেওয়া ইংরেজি শিক্ষা, জুডিও-খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ কেন্দ্র করে একটি বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক শ্রেণীও গড়ে ওঠে ‘ইয়াং বেঙ্গল’ তথা ডিরোজিও সাহেবের শিষ্যদের হাত ধরে। দীর্ঘকাল নিথর ও নিস্তব্ধ বাংলার মানস নতুন ধ্যান-ধারণায় উদ্দীপ্ত হয়। ফলে সাহিত্য, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে বাংলা ভাষার গদ্যরূপ ও আধুনিক সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। একেই বাংলা রেনেসাঁ বলে আমরা জানি। মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিম থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বাংলা ভাষা, সাহিত্য, বুদ্ধিজীবিতার আদিগুরুরা এসেছেন এই রেনেসাঁ থেকে। ভদ্রলোক জমিদার, ম্যাজিস্ট্রেট, কেরানির এই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ধারায় ব্রিটিশবিরোধিতা থাকলেও তা মূলত ছিলো আপসকামী।
একই সময়ে বাংলায় ব্রিটিশ আর জমিদারি লুটপাট, জুলুমের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছে ফকির-সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ। নূরল দীনের নেতৃত্বে স্বতঃস্ফূর্ত কৃষক বিদ্রোহ থেকে শুরু করে তিতুমীর, হাজি শরীয়তুল্লাহদের ধর্মীয় ভাবধারায় কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ ইত্যাদি সংঘটিত হয়। এটিই মূলত বাংলায় গণমুখী, গণরাজনৈতিক ধারার ভ্রুণ। খাজনাপীড়িত কৃষক ছাড়াও এই সকল বিদ্রোহ, প্রতিরোধে ক্রমান্বয়ে যুক্ত হয় নতুন জমিদার আর ভদ্রবাবুশ্রেণীর কাছে স্ট্যাটাস হারিয়ে সর্বহারা মুঘল আশরাফ জমিদারশ্রেণী, আলেম-মওলানা, কাজী, সওদাগরেরা। প্রাথমিকভাবে জনগণের কালেক্টিভ মজলুমিয়াতের স্মৃতি ও ক্ষোভ, লোকায়ত ধর্ম, সংস্কৃতি, গীতিকা, পুঁথি ইত্যাদি ছিলো এই গণবিদ্রোহ সমূহের ফুয়েল তবে কেতাবনির্ভর ধর্মীয় শুদ্ধতাবাদী চেতনাও এই লড়াইকে আকার দেয় সাবেক মুঘল আশরাফ ও শিক্ষিত আলেমশ্রেণীর অবদানের মধ্যদিয়ে। আঠারোশো সাতান্ন সালে মুঘল আশরাফশ্রেণী এবং গণমানুষের ক্ষোভের সম্মিলিত বিস্ফোরণ ঘটে নামেমাত্র মুঘল বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফরকে সামনে রেখে একটি ব্যর্থ মহাবিদ্রোহের মধ্যদিয়ে।
পলাশি থেকে মহাবিদ্রোহ পর্যন্ত ঐতিহাসিক পরিক্রমায় আমরা দেখতে পাই যে বাংলায় রাজনীতির তিনটি ধারা দাঁড়িয়ে গেছে। ধারাগুলো বর্ণনা করা হলো—
১। লুটপাট, জুলুম ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদী গণবিরোধী ধারা যার প্রতিভূ ছিলো ব্রিটিশ বেনিয়া আর জমিদারেরা।
২। জুলুমি ব্যবস্থারই তৈরি করা ও তার সঙ্গে আপস করে চলা একটি শিক্ষিত ভদ্রলোকশ্রেণী যারা সাধারণত গণবিরোধী শক্তির খুঁটি হিসেবে কাজ করে কিন্তু সংকীর্ণ শ্রেণীস্বার্থের প্রয়োজনে যা জুলুমিব্যবস্থার বিরুদ্ধেও দাঁড়ায়। ইতিহাসের এই পর্যায়ে জনগণের উপরে সামন্ত প্রভুত্ব চালিয়ে আসা মুঘল আশরাফদেরকেও গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন গণবিমুখী আকারেই দেখতে হবে। তবে এই শ্রেণীটি মুনাফা পূজা করা বেনিয়া ও তাদের দালালদের মতো জালিম ছিলো না বরং সামন্ত পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় যতোটুকু সম্ভব সুবে বাংলার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তবে মুঘল এই আশরাফেরা ছিলেন ব্রিটিশ বেনিয়া ও তার দালালদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে জমিদারি, শাসনদারি হারানো ক্ষীয়মান শ্রেণী।
৩। আমাদের চাষা-মজুর বাপ, দাদাদের জুলুম আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে ক্রমাগত লড়াইয়ের গণরাজনৈতিক আরেকটি সিলসিলা আমরা ইতিহাসে হাজির দেখতে পাই, যারা বৃহত্তর মজলুম জনগোষ্ঠীকে জুলুমের নাগপাশ চূড়ান্তভাবে ছিঁড়ে ফেলার পথে এগিয়ে নিয়ে যায় রক্তাক্ত শাহাদাতের মধ্যদিয়ে।
আমরা দেখতে পাই যে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের লড়াই তখনই সংগঠিত হয় যখন শিক্ষায়, সুবিধায় এগিয়ে থাকা গণবিমুখী ধারা, গণরাজনৈতিক সিলসিলার সাথে যুক্ত হয় গণবিরোধী শক্তিকে চূড়ান্ত মোকাবেলা করতে। আঠারোশো সাতান্ন ঘটেছিলো গণবিমুখ সামন্ত মুঘল আশরাফদের সাথে চাষা-মজুরের সন্তান সিপাহীদের লড়াই যখন একীভূত হয় তখন। কিন্তু ক্ষীয়মান সামন্তশ্রেণী এই সংগ্রামে উদীয়মান জমিদার ও বেঙ্গল রেঁনেসাজাত ভদ্রলোকশ্রেণীর সাথে টক্করে ব্যর্থ হয় ফলত সুসংঘটিত ব্রিটিশ, জমিদারশ্রেণীর সামরিক-অর্থনৈতিক শক্তি গণবিরোধী জুলুমি শাসন-শোষণকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়।
২
মহাবিদ্রোহ এইটুকু স্পষ্ট করেছিলো যে খুললামখুল্লা জুলুম বারেবারে বিদ্রোহের জন্ম দেবে আর তাই ব্রিটিশ বেনিয়াদের সরাসরি মুনাফাখোরীকে আড়াল করে ‘রানীর শাসন’ আকারে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের চাদর নেমে আসে বাংলায়। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই বাংলায় প্রথম জুলুমিয়াতকে আইনি ভিত্তি দেয়া হয় অথবা ‘আইনসম্মত’ জুলুমাতের শুরু হয়। রানীর শাহী ফরমানে সমতা আর ন্যায্যতার আশ্বাস থাকলেও এই অধিকার কেবল রানীর প্রজাদের জন্যে, বিদ্রোহী নাফরমানদের জন্যে নয়। খাজনা, লুটপাটের পীড়নে কতটুকু চিৎকার করলে প্রজা থেকে নাফরমানে পরিণত হতে হয় সেটাও কিন্তু রানীর মর্জি (মানে যতটুকুতে লুটপাটে বাঁধ সাধে না ততটুকু সই; উনবিংশ শতকীয় ইউরোপীয় লিবারেলিজমের ভ্রান্তি!)। অতঃপর এইবার ব্রিটেন সম্রাজ্ঞীর প্রতিনিধিত্বে স্বয়ং প্রটেস্টান্ট খ্রিস্টীয় গডের সার্বভৌম ক্ষমতাবলে বাংলার চাষা-মজুরের ওপরে জুলুম করার এখতিয়ার নাজেল হয় এই দেশের জমিদার, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, অফিসারদের ওপরে অর্থাৎ জুলুম এবার আর খুললামখুল্লা জুলুম হিসাবে নয় বরং ন্যায্য আইন/সংবিধান হিসেবে হাজির হয়।
আইন/সংবিধান কাঠামোয় লুটপাটের ভাগ পেয়ে টিকে থাকা জমিদার, ভদ্রলোকশ্রেণীকে নিজ স্বার্থে দরকষাকষির একটা জায়গা দেয়ার প্রশ্ন এই সময়ে জোরালোভাবে হাজির হয় রানীর তথাকথিত ‘ইনসাফ’ কায়েমের স্বার্থে! ফলত আইনসম্মত আপত্তি জানানোর মাধ্যম হিসেবে সরাসরি ব্রিটিশ মধ্যস্থতায় গড়ে ওঠে কংগ্রেস। জমিদারদের অধিকাংশই তখনো বেনিয়া উচ্চবর্ণীয় হিন্দু আর অফিসারেরাও এই উচ্চবর্ণীয় হিন্দু জমিদারশ্রেণী অনুগামী হওয়ায় কংগ্রেসের নেতৃত্ব অবধারিতভাবে তাদের হাতে চলে যায়। আঠারোশো সাতান্ন’র ব্যর্থ মহাবিদ্রোহের পরে সাবেক মুঘল আশরাফশ্রেণী তখন বিপর্যস্ত এবং বৃহত্তর মুসলমান ভদ্রলোকশ্রেণী রানীর ফরমানে আশ্রয় নিতে উৎসুক। স্যার সৈয়দ আহমদের নেতৃত্বে মুসলমান আশরাফশ্রেণী বিদেশি জালেম শক্তির আধিপত্য মেনে নিয়ে জমিদারি, কোর্ট-কাছারি, অফিস, আদালতে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার সংগ্রামে যুক্ত হয়; আলীগড় আন্দোলনের পত্তন ঘটে। কংগ্রেসের নেতৃত্ব মুসলমান ভদ্রলোকদের হাতে না থাকায় অবধারিতভাবেই এক পর্যায়ে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ খানের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ আবির্ভূত হয়। অর্থাৎ আমাদের এই অঞ্চলে রাজনৈতিক দলসমূহ অথবা আইনসম্মত রাজনৈতিক পরিসর ঐতিহাসিকভাবেই মূলত জুলুমি বন্দোবস্তের অধীনে এলিট ভদ্রলোকশ্রেণীর মধ্যকার সম্প্রদায়গত স্বার্থ নিয়ে দরকষাকষি ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যম বা মঞ্চ, যেখানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করার কোনো জায়গা নেই।
রাজনৈতিক দলের নামে নালিশ ও আপস করার নানা দোকান খোলায় নির্যাতিত চাষা-মজুরের চলমান কৃষক বিদ্রোহ (যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নানা অঞ্চলে ঘটছিলো), ওহাবী আন্দোলনের ক্রমবর্ধমানতা তথা র্যাডিকাল গণরাজনৈতিক কোনো তৎপরতাই বাংলার ভদ্রলোক-বাবুশ্রেণীকে টানতে পারেনি। তবে অচিরেই সরকারি চাকরিমুখী (অর্থাৎ কংগ্রেস/মুসলিম লীগমুখী) সংবেদনশীল ছাত্রদের অনেকেই অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার মধ্যদিয়ে বৃহত্তর মজলুম জনগোষ্ঠীর মুক্তির লড়াই সম্পর্কে সচেতন হতে শুরু করে অর্থাৎ অবধারিতভাবেই আপস ছেড়ে র্যাডিকালিজমের দিকে ধাবিত হয়। ইউরোপে জাতিগত স্বাধিকারের দাবিতে গড়ে ওঠা আইরিশ সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনসহ নানামুখী জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী কার্যক্রমে আকৃষ্ট হয়ে সূর্য সেন, বাঘা যতীনদের মতো কংগ্রেসমুখী তরুণদের একটি গ্রুপ অনুশীলন সমিতি, যুগান্তরের মতো সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন গড়ে তোলে। র্যাডিক্যাল হলেও বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের মধ্যদিয়ে এই ধারাটির সীমাবদ্ধতা প্রস্ফুটিত হয় যখন উচ্চবর্ণের শিক্ষিত ভদ্রলোক হিন্দুশ্রেণীর সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুসলমান, আদিবাসী, দলিত চাষা-মজুরকে অপাঙক্তেয় করে রাখে। এই সময়েই যুক্তবাংলা নিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগ থেকে দেশাত্মবোধক সাহিত্য, বুদ্ধিজীবিতা ও সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করে এবং বাংলায় জাতীয়তাবাদী আবেগের ভিত্তিভূমি রচিত হয়। এই সময় থেকেই ধীরে ধীরে বাংলায় কমিউনিস্ট আন্দোলনের আঁচ লাগতে শুরু করে যদিও তখনো তা গণবিমুখ পশ্চিমা ফ্রেমেই আবদ্ধ ছিল এবং বাংলার কৃষক-মজুরের জীবন সম্পৃক্ত ছিলো না।
এই সময়ের বিশ্লেষণ করে আমরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার চিহ্নিত করতে পারি যা হলো—
১. এই অঞ্চলে প্রচলিত আইন, সংবিধান ইত্যাদি ধারণা এবং এগুলোর প্রতি যে প্রশ্নাতীত শ্রদ্ধা-ভক্তি আমাদের মধ্যে গেঁথে দেয়া হয় সবই জুলুমিব্যবস্থার ভিত্তি। মূলত আমাদের উপরে চাপিয়ে দেয়া ইউরোপীয় জুডিও-খ্রিস্টীয় রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা এই অঞ্চলে লুটপাট, অত্যাচারের শাসনকে জায়েজ করে।
২. রাজনৈতিক দল এই অঞ্চলে ইউরোপের গণতান্ত্রিক পরিক্রমায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের দাবি নিয়ে হাজির হয়নি বরং আপসকামী জমিদার-অফিসারশ্রেণীর অন্তর্গত সম্প্রদায়সমূহের নিজ নিজ স্বার্থ নিয়ে দরকষাকষি ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে এগুলো কাজ করে এবং এই দরকষাকষি ও চাপ প্রয়োগই মূলত এই অঞ্চলে ‘আইনসম্মত’ রাজনীতি। এই অঞ্চলে ‘গণতান্ত্রিক’ রাজনৈতিক পরিসরে আসলে ‘গণ’ বলতে কিছু নাই বরং আছে ক্ষুদ্র নানাপ্রকার এলিটগোষ্ঠীর মধ্যকার আপস-মীমাংসা বা কোন্দলের ক্ষেত্র। অর্থাৎ রাজনীতি এইখানে গণবিমুখ।
৩. এই অঞ্চলে জাতি, দেশ ও দেশপ্রেমের ধারণা তৈরি হয়েছে আপসকামী উচ্চবর্ণীয় শিক্ষিত হিন্দুশ্রেণীর মানসে; এতে মুসলমান, আদিবাসী, দলিতসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উপেক্ষিত। এই অঞ্চলে মজলুমশ্রেণীর প্রতিনিধিত্বের দাবি করা কমিউনিস্ট রাজনীতির শুরুও গণবিচ্ছিন্ন উৎস থেকে।
৩
কংগ্রেস, মুসলিম লীগ দরকষাকষি ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এই অঞ্চলের মানুষের সমর্থন আদায়ের চাপে ব্রিটিশ জুলুমাত সীমিত হলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জায়গা করে দিতে শুরু করে। ফলে প্রথমবারের মতো বিদেশি জালেমি শাসন তার ক্ষমতা ভাগাভাগি করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে। তবে আপসকামী শিক্ষিত ভদ্রলোকশ্রেণীর মধ্যেই এই প্রতিনিধিত্ব সীমাবদ্ধ থাকে অর্থাৎ বৃহত্তর মজলুম জনগোষ্ঠী ক্ষমতায়িত হয়নি। ক্রমান্বয়ে নির্বাচনিব্যবস্থা শক্তিশালী ও বিস্তৃত হতে থাকলে শিক্ষিত ভদ্রলোক জমিদার ও অফিসারশ্রেণীর কাছে গণআকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে। চাষা-মজুরকে ঋণের জাল, খাজনার অত্যাচার থেকে মুক্ত করার এজেন্ডা সামনে রেখে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক কৃষক-প্রজা পার্টি গড়ে তুললে অতি দ্রুতই তা মজলুম গণমানুষের আশা-ভরসার প্রতিভূতে পরিণত হয় এবং বাংলায় প্রথম গণরাজনীতি ধারণে সক্ষম আধুনিক পার্টি গঠনের সূত্রপাত ঘটে। কৃষক প্রজা পার্টি নির্বাচনে ভালো করে চাষা-মজুরের পক্ষে কিছু কাজ করতে পারলেও গণরাজনৈতিক ধারার প্রধান লক্ষ্য বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে চাষা-মজুরশ্রেণীকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে পারেনি। তবে এইসব পরিবর্তনের সাথে সাথে এই অঞ্চলে সংকীর্ণ বাঙালি জাতিবাদ থেকে বের হয়ে বৃহত্তর মজলুম চাষা-মজুর জনগোষ্ঠী আকারে নিজেদের দেখার মানস এই সময়ে নির্মিত হতে থাকে। সাম্য ও বিদ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব ও পরবর্তীতে বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়দের রিয়ালিস্ট সাহিত্য, রবীন্দ্রবিরোধিতা এই মানসকে আরো শক্তিশালী করেছে। এই রকম রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় নির্বাচনব্যবস্থার মধ্যদিয়ে মজলুম জনগোষ্ঠী এলিটশ্রেণীগুলোর দরকষাকষির অন্দরমহলে আনাগোনা শুরু করলে গণরাজনীতি পার্টি পলিটিক্সের নিগড়ে প্রবেশ করে। এলিটেরা নেতা এবং মজলুম গণমানুষেরা কর্মী-সমর্থক আকারে জোট বেঁধে গণবিরোধী জালিম শাসনে ক্ষমতার হিস্যা আদায় করার রাজনীতি রূপায়িত হয়।
এই সময়ে কংগ্রেস-মুসলিম লীগ বিভাজন চরম আকার ধারণ করে। কংগ্রেস হিন্দু মহাসভার মতো সরাসরি হিন্দুরাষ্ট্রের পক্ষে না দাঁড়ালেও জাতিরাষ্ট্র ফ্রেমের অবধারিত সীমাবদ্ধতার বাইরে যেতে পারছিলো না অর্থাৎ উচ্চবর্ণের হিন্দু বাবুশ্রেণীর রাষ্ট্রকল্পনাকেই সবার ওপরে ভারতীয় জাতিসত্তার নামে চাপিয়ে দিচ্ছিলো। কংগ্রেস ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্রের আদলে যে ভারত কল্পনা করছিলো তাতে মুসলমানসহ নানা জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য যে বিলুপ্ত হবে তা আল্লামা ইকবাল, জিন্নাহ প্রমুখের বুদ্ধিবৃত্তি ও রাজনীতিকে রূপ দিয়েছে। গান্ধী, নেহেরুদের অখণ্ড ভারতের বিপরীতে জিন্নাহ, লিয়াকত আলীদের মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদের রাজনীতি পুরো উপমহাদেশেই মেরুকরণ ঘটায়। বৃহত্তর বাংলায় খাজা নাজিমুদ্দিন, সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ কংগ্রেস আর শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাজনৈতিক দলগুলো ধর্ম ও পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজিত হতে শুরু করলে তা ছড়িয়ে পড়ে এদের সমর্থক গণমানুষ তথা মজলুম জনগোষ্ঠীর মধ্যে। কংগ্রেসের র্যাডিক্যাল অংশ থেকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ও সুভাষ বোসের নেতৃত্বে মজলুম জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর ঐক্য গঠনের একটা রাজনীতি হাজির হয় যা বিংশ শতকের শুরুতে গড়ে ওঠা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। এই সময়ে কমিউনিস্টরা ফসলের ন্যায্য বণ্টনের দাবিতে তেভাগা আন্দোলনসহ নানাপ্রকার কৃষক আন্দোলনে সম্পৃক্ততা তৈরি করে ঐক্যবদ্ধ চাষা-মজুরের বৃহত্তর আন্দোলন সংঘটিত করতে চেষ্টা চালিয়ে গেলেও তা সফল হয়নি।
বাংলায় লুটেরা জমিদারেরা ছিলো মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক কংগ্রেসমুখী উচ্চবর্ণের হিন্দু বাবুশ্রেণী, অন্যদিকে দরিদ্র চাষা ও মজুরেরা ধর্মে মুসলমান কিংবা দলিত নিম্নবর্ণের হিন্দু । এই পরিস্থিতিতে আবুল হাশিম, ভাসানী, যোগেন মণ্ডলের মতো গণনেতাগণ অসামান্য দক্ষতায় অতি দ্রুতই বাংলার কৃষক-মজুর, দলিত, নিম্নবর্গকে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ করে ফেলেন এবং জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ ও কৃষক-মজুরের রুটি-রুজির অধিকারের পক্ষে ব্যাপক গণআন্দোলন এই অঞ্চলে পাকিস্তান আন্দোলনে রূপ নেয়। আঠারোশো সাতান্ন’র মহাবিদ্রোহের পরে প্রথমবারের মতো বাংলায় নিপীড়িত বিদ্রোহী জনগোষ্ঠীর (হাশিম, ভাসানী, যোগেন মণ্ডল প্রমুখ নেতৃত্বাধীন) স্বার্থের সাথে আশরাফ শিক্ষিতশ্রেণীর (খাজা নাজিমুদ্দীন, নূরুল আমীন) স্বার্থ পুরোপুরিভাবে এক বিন্দুতে মিলিত হয়, তবে এইবার অভিজাতশ্রেণীটি ক্ষীয়মান মুঘল শরীফদের মতো দুর্বল অবস্থানে নয় বরং উদীয়মান ও শক্তিশালী অবস্থানে থেকে ব্রিটিশ-জমিদারিব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ফলত শক্তিশালী মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন ও লড়াকু গণরাজনৈতিক ধারার ডাইরেক্ট অ্যাকশনের সংযোগে পাকিস্তান আন্দোলন সফলতার মুখ দেখে, জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়। আবুল হাশিম, শরৎ বসুরা (সুভাষ বোসের বড়ো ভাই) যুক্তবাংলা তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে সময়ের প্রয়োজনে পূর্ব পাকিস্তানের আকারে পোকায় কাঁটা বাংলা (নদীব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি নানাদিক থেকে অস্থিতিশীল) এই অঞ্চলের মজলুমদের মেনে নিতে হয়।
বাংলায় ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন-শোষণের অবসান পর্যন্ত এই সময়কে ব্যবচ্ছেদ করলে বেশকিছু বিষয় দৃশ্যমান হয়, যেমন—
১. এই অঞ্চলে নির্বাচন মূলত গণবিমুখ আপসকামী এলিটদের সাথে গণবিরোধী লুটেরা, অত্যাচারী ব্যবস্থার ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি মাধ্যম। তবে গণমানুষ এখানে কেবল সংখ্যা আকারে হাজির থাকলেও তাদের স্বার্থ ভোটের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কৃষক-প্রজা পার্টির মতো গণমুখী রাজনীতি করলে তার ফলাফলে ক্ষমতায় ভাগ পাওয়া যায়। তবে ক্ষমতার ধরনটাই গণবিরোধী হওয়ায়, অর্থাৎ পুলিশ, আদালতসহ সকল প্রতিষ্ঠান লুটপাট ও জুলুমের সহযোগী হওয়ায় এই ক্ষমতার ভাগ নিয়ে বৃহত্তর মজলুম জনগোষ্ঠীকে চূড়ান্ত মুক্তি এনে দেওয়া যায় না। প্রচলিত রাজনীতিতে চাষা-মজুর আর তার সন্তানেরা কর্মী-সমর্থক কিন্তু নেতা নয়। তাই এই অঞ্চলে গণরাজনীতির সাথে নির্বাচনীব্যবস্থার মিশেলে অল্প কিছু সংস্কারমূলক সুবিধার চেয়ে বেশি কিছু আদায় করা সম্ভব নয়।
২. ধর্ম ও পরিচয়ভিত্তিক (সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী পরিচয়ও হতে পারে) বিভাজন নিয়ে এই অঞ্চলে মূলত এলিটশ্রেণীই রাজনীতি করে যা ক্রমান্বয়ে গণমানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে মজলুম জনগোষ্ঠীর গণরাজনীতি পরিচয়কে আঁকড়ে ধরে অগ্রসর হতে পারে (পাকিস্তান আন্দোলন)।
৩. গণবিমুখ এলিট রাজনীতিতে একাধিক ধারা থাকতে পারে যার কোনো কোনোটি অধিকতর আপোষকামী ও গণবিমুখ (গান্ধী, নেহেরু) কোনোটি হয়তো স্রেফ শ্রেণীস্বার্থে অধিকতর গণমুখী হয়ে ওঠে (খাজা নাজিমুদ্দিন, সোহরাওয়ার্দী) আবার কোনোটি শ্রেণীচ্যুত হয়ে মজলুম জনগোষ্ঠীর লড়াইকেই প্রধান করে তোলে (সুভাষ বোস, আবুল হাশিম প্রমুখ)।
৪. এলিটশ্রেণীর মধ্যে একটি ধারা গণরাজনৈতিক হয়ে উঠে বৃহত্তর গণমানুষ ও মধ্যবিত্তের লড়াইয়ের মধ্যে সংযোগ ঘটাতে সক্ষম হলেই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মজলুম চাষা-মজুরের ভাগ্য পরিবর্তনের লড়াই এগিয়ে যায় (সফল পাকিস্তান আন্দোলন)।
৪
পাকিস্তানের জন্মের প্রায় সাথে সাথেই মুসলিম লীগের গণবিমুখ এলিটশ্রেণীটি গণরাজনৈতিক ধারা থেকে নিজেদের সরিয়ে এনে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে শুরু করে। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের সাথে সাথে পূর্ব বাংলায় চাষা-মজুরের সন্তানদের ব্যাপক ক্ষমতায়ন ঘটে কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে সামন্ত জমিদার ও অফিসারশ্রেণী বহাল তবিয়তে ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করে পূর্ব বাংলা থেকে শুরু করে পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলের সম্পদ ও সুবিধা মনোপলাইজ করে তোলে নিজেদের স্বার্থে। ভাষা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও অঞ্চলভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ প্রশ্নে এই সময়ে পূর্ব বাংলার উদীয়মান শিক্ষিতশ্রেণী (ছাত্র, চাকরিজীবী) ও ক্ষমতা কেন্দ্র পশ্চিমের সাবেক জমিদার এলিটদের বিরোধ বাঁধে। আঞ্চলিক অর্থনীতির সমৃদ্ধিতে যেহেতু চাষা-মজুর-শ্রমিকেরও স্বার্থ জড়িত তাই নিপীড়িত গণমানুষের স্বার্থ ও পূর্ব বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্তের স্বার্থের মধ্যে আবারো একটি যুগপৎ এলাইনমেন্ট ঘটে। বায়ান্নোতে ভাষা প্রশ্নে খাজা নাজিমুদ্দীন ও নুরুল আমিনকে মোকাবেলা করতে হয় বাংলার ছাত্র-জনতার।
ভাসানী গণরাজনৈতিক লাইনে অটল থাকতে আশরাফ মুসলিম লীগ ছেড়ে এসে গঠন করেন আওয়ামী মুসলিম লীগ, পরে আওয়ামী লীগ। এই সময়ে পূর্ব বাংলায় কমিউনিস্ট কৃষক আন্দোলনসমূহ স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোড়ন তৈরি করলেও জাতীয় রাজনীতিতে কোনো বৃহত্তর লড়াই দানা বাঁধাতে ব্যর্থ হয়। পূর্ব বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পূর্বের মতোই ক্ষমতার সাথে আপসরফা করে নিজের জায়গা বুঝে নেওয়ার রাজনীতিই অব্যাহত রাখে। পাকিস্তানের এমএলএ, মন্ত্রী, অফিসার হওয়াটা যাতে আরো সহজ হয় সে লক্ষ্যে চাপ দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে আওয়ামী লীগের মতো মূলধারার দলগুলো। এদিকে মার্কিন-সোভিয়েত তথা পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ দ্বন্দ্বে সারাবিশ্ব তখন পোলারাইজড। প্রযুক্তি ও ব্যবসার বিস্তারে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির ভেদরেখা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ভাগ বসানোর স্বার্থে আওয়ামী লীগও যখন দেশের চাষা-মজুর-শ্রমিকের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে বৈশ্বিক মার্কিন জোটে গিয়ে ভেড়ে তখন আরেকবার গণরাজনৈতিক ধারা থেকে সরে আসে এই অঞ্চলের শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণী। ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে এবার গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। পরবর্তীতে অতিরিক্ত বৈশ্বিক বামপন্থা নির্ভরতা ও সোভিয়েত-চীন বিভাজনের প্রেক্ষিতে গণরাজনৈতিক ধারার সাথে সম্পৃক্ত অসংখ্য নেতাকর্মীরা দিকভ্রান্ত হয়ে অর্থহীন সোভিয়েতপন্থী, চীনপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন দেশের মজলুমদের স্বার্থচিন্তা না করে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে কলোনিয়াল শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মননে গড়ে ওঠা সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের অনূরূপ সংকীর্ণ প্যান ইসলামী জাতীয়তাবাদকে এই অঞ্চলে আমদানি করে জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো।
পাঞ্জাব, সিন্ধ, বেলুচিস্তান, পাখতুন, বাংলা সবখানে বৃহত্তর ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক আন্দোলনের আকারে মজলুমের লড়াই শাণিত হতে শুরু করলে আঁতকে ওঠে পাকিস্তানের ভূস্বামী-এলিট ক্ষমতাকেন্দ্র। ব্রিটিশের রেখে যাওয়া পুলিশ, ব্রিটিশ শিক্ষায় জনগণকে ব্লাডি স্যাভেজ ভাবা অফিসার দিয়ে পিটিয়ে দেশ ঠান্ডা করতে চায় তারা। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সামরিক আইন জারি করেন ৫৮ সালে। সেনাবাহিনীর উপরে অতি নির্ভরতার ফল তাকে দিতে হয় ক্ষমতাচ্যুত হয়ে। জেনারেল আইয়ুব খান ব্রিটিশ পেটোয়াব্যবস্থার পক্ষ থেকে পাকিস্তানী ভূস্বামী-এলিটদের রক্ষাকর্তা হিসেবে হাজির হন। আইয়ুব খান কেন্দ্রীয় ক্ষমতাবলে পেটোয়া বাহিনী দিয়ে দেশ দখল করে রাখতে চাইলে বঞ্চিত আঞ্চলিক মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক দলগুলো তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। কবি, লেখক, শিল্পী থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অঙ্গনের সবখানেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ রিভাইভ করে অর্থাৎ উনবিংশ শতকে কলকাতায় উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদার-ভদ্রলোকশ্রেণী নির্মিত বাঙালি জাতিবাদী পরিচয়ের ফ্রেম আবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তৎসময়ে আঞ্চলিক অধিকারের লড়াইয়ে এই সাংস্কৃতিক রিভাইভালিজম নিপীড়িত চাষা-মজুর-শ্রমিকদের বঞ্চনাকে আঞ্চলিক বৈষম্যের সাথে যুক্ত করে দেখার মানস নির্মাণ করে। এমতাবস্থায় ছেষট্টিতে পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি বিকাশের ছয় দফা দাবি দিলে মুজিব এবং আওয়ামী লীগ পুনরায় গণরাজনৈতিক ধারার সাথে নিজেদের সংযোগ ঘটাতে সক্ষম হয়। ব্রিটিশের রেখে যাওয়া পেটোয়াদের বিরুদ্ধে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও গণমানুষের ঐক্যবদ্ধতার ভিত্তিতে আরেকটি গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। তবে এইবার আইয়ুবের হাতে নির্বাচনব্যবস্থা কুক্ষিগত থাকায় পাকিস্তান আন্দোলনের মতো ব্যালটে বিপ্লব করা সম্ভব ছিলো না। তবে যোগাযোগব্যবস্থা, রেডিও, খবর, রাজনৈতিক দল ও সংগঠন তথা প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক সচেতনতার ব্যাপক বৃদ্ধিতে সকল শর্ত নির্ধারিত হয়ে যায় সারা দেশে অভূতপূর্ব এক গণআন্দোলন সংঘটিত হওয়ার। আর তাই উনসত্তর (১৯৬৯) সালে দুশো বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জায়গায় জায়গায় বিচ্ছিন্ন স্থানীয় কৃষক বিদ্রোহ নয় বরং ঐক্যবদ্ধ গণঅভ্যুত্থানের স্বাদ লাভ করে এই অঞ্চলের মজলুমেরা।
পাকিস্তান আমলের প্রারম্ভিক এই ইতিহাস থেকে যে সকল গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার প্রতীয়মান সেগুলো হলো—
১. বিদেশি জালিম শাসন থেকে সাতচল্লিশে শুধু ‘বিদেশী’ ব্যাপারটাই অপসারিত হয়, জালিম শাসন রয়ে যায় যার চালকের আসনে বসে পশ্চিম পাকিস্তানের ভূস্বামী ও অফিসারশ্রেণী অর্থাৎ পুলিশ, আদালত, অফিস সবই গণবিরোধী অর্থাৎ অত্যাচারী রয়ে যায়।
২. মজলুম জনগোষ্ঠীর ক্রমাগত সংগ্রামের বিরুদ্ধে লুম্পেন রাজনৈতিক নেতারা লুটপাট, জুলুমের হুকুমাত টিকিয়ে রাখতে অসমর্থ হলে (অর্থাৎ গণশক্তি বিজয়ের দিকে যেতে থাকলে) সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে ভূস্বামী জমিদার-অফিসারশ্রেণীটি রাজনৈতিক নেতাদের সরিয়ে সরাসরি ক্ষমতা হাতে নেয়। ভূস্বামী-অফিসারশ্রেণী তাদের প্রভুত্ব টিকিয়ে রাখতে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে নতুন বৈদেশিক প্রভু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার উপরে। অর্থাৎ বিদেশি প্রভুর তত্ত্বাবধানে জমিদার-অফিসারদের জুলুমিয়াত নতুন আকারে, নতুন রূপে হাজির হয়।
৩. আওয়ামী লীগের মতো দলগুলো যেমন বিদেশি সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য মেনে জমিদার-অফিসারশ্রেণীর সাথে দরকষাকষিতে লিপ্ত হয় তেমনি মধ্যপ্রাচ্য প্রভাবিত প্যান ইসলাম, সোভিয়েত ও চীন প্রভাবিত বামপন্থা গণরাজনীতিকে অযৌক্তিক বৈদেশিক আধিপত্যের দিকে নিয়ে যায়। অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিসর রূপান্তরিত হয় নানা বৈদেশিক শক্তির দালালদের যুদ্ধ ক্ষেত্রে।
৪. গণরাজনৈতিক ধারায় ঐক্যবদ্ধ গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুলিশ, অন্যান্য বাহিনীকে পরাজিত করে, জালিমি বিচার, আদালত অস্বীকার করে বৃহত্তর মজলুম জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত গণআকাঙ্ক্ষার উত্থান নতুন পন্থা আকারে মজলুম জনগোষ্ঠীর সামনে হাজির হয়। নিজ নিজ শ্রেণীস্বার্থে কিংবা বৈদেশিক প্রভুর নির্দেশানুসারে নানা রাজনৈতিক দল এতে ভূমিকা রাখলেও গণমানুষ লড়াই ও রক্তের মধ্য দিয়ে সকল বিভাজনের বাইরে গিয়ে নিজেদের হাজির করে।
৫
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে জালিমব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়লে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্রিটিশের রেখে যাওয়া পেটোয়া বন্দোবস্তের প্রতিনিধি জেনারেল ইয়াহিয়া করে ক্ষমতা দখল করে। নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয় যাতে করে সামাজিকভাবে ক্ষমতাশালী শিক্ষিত ভদ্রলোকশ্রেণীকে ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারায় টেনে এনে তাদের দিয়ে বৃহত্তর মজলুম জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আঞ্চলিক মধ্যবিত্তের স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা ছয় দফাকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ এই অঞ্চলে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রতিভূ হয়ে ওঠে এবং শক্তিশালী আঞ্চলিক অর্থনীতি বিকাশের আশায় বৃহত্তর কৃষক-শ্রমিক-মজলুমশ্রেণী এই লড়াইয়ে তাদের অনুগামী হয়। সত্তরের নির্বাচনে অভূতপূর্ব বিজয় লাভ করে ছয় দফার ম্যান্ডেট নিয়ে আসে আওয়ামী লীগ। ছয় দফা বাস্তবায়নে ভেঙে যেত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসন-শোষণ কাঠামো। তাই পশ্চিমা এলিটেরা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উপরে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে সেনাবাহিনী দিয়ে আক্রমণ চালিয়ে বাংলার মানুষের উপরে একটি রক্তাক্ত জনযুদ্ধ চাপিয়ে দেয়।
আওয়ামী লীগ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিলো বটে কিন্তু যুদ্ধ চায়নি। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দল হিসেবে পাকিস্তানে এমএলএ, মন্ত্রী, অফিসার হয়ে শ্রেণীগত হিস্যা বুঝে নেওয়ায় তার মনোযোগ ছিলো যেক্ষেত্রে মূলত স্বায়ত্তশাসন হলেই পোয়াবারো। কিন্তু জনযুদ্ধের সামনে পড়ে যখন জান নিয়ে টানাটানি তখন তারা গণরাজনৈতিক লাইনে সশস্ত্র জনযুদ্ধ সংগঠিত করার বদলে নিজেদের জান বাঁচাতে পার্শ্ববর্তী ভারতে আশ্রয় নিয়ে নতুন বিদেশি প্রভু ভারতের কাছে এই অঞ্চলের আপামর জনসাধারণের ন্যায্য হক বর্গা দিয়ে বসলো। আওয়ামী লীগ যুদ্ধের সময়ে জান বাঁচাতে সশরীরেই যে শুধু কলকাতায় উঠেছিলো তাই নয় বরং মননে সে আত্মস্থ করে নেয় কলকাতাকেন্দ্রিক উনবিংশ শতাব্দীর সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদকে এবং আমাদের একাত্তরের বাঙালি, বিহারী, আদিবাসীসহ সকলের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জনযুদ্ধকে ফ্রেমিং করে ফেলে বাঙালির সংকীর্ণ আত্মপরিচয়ের সংগ্রামে; বাকিরা হয়ে দাঁড়ায় শত্রুপক্ষ। সিরাজুল আলম খান, আহমদ ছফা ছাড়া আর কোনো জাতীয়তাবাদী নেতা, বুদ্ধিজীবী এই ফ্রেমিংয়ের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তেমন সচেতন ছিলেন না। জন্মলগ্ন থেকেই মিলন-বিচ্ছেদের নানা পর্ব শেষে একাত্তরের জনযুদ্ধের এই পর্যায়ে এসেই আওয়ামী লীগের সাথে এই অঞ্চলের মজলুমিয়াতের রাজনীতি তথা গণরাজনীতির চিরকালীন বিচ্ছেদ সম্পন্ন হলো।
একাত্তরে জনযুদ্ধকালীন গণরাজনৈতিক ধারাটি প্রবাহিত হয় মূলত ভারতের ক্রমাগত হস্তক্ষেপে সতর্ক ও ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী দেশের মাটিতে গণমানুষের সাথে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করা গেরিলাদের মধ্য দিয়ে। কমরেড সিরাজ সিকদার, মেজর জলিলসহ আরো অনেক রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের মধ্যে এই গণরাজনৈতিক সচেতনতা খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে সাতচল্লিশে যেমন আবুল হাশিম, ভাসানীদের মতো জননেতাকে খাজা নাজিমুদ্দীনের মতো জমিদারকে নেতা মেনেই গণরাজনৈতিক লড়াইটা করতে হয়েছে তেমনি একাত্তরেও মেজর জলিলকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব মেনেই গণযুদ্ধটা করতে হয়েছে (এটলিস্ট অফিশিয়ালি)। কমরেড সিরাজ সিকদার ছিলেন এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।
গণঅভ্যুত্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাংলার মজলুমিয়াতের লড়াইকে বিবেচনা করলে বেশকিছু বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেমন—
১. গণঅভ্যুত্থানের পরে বলপ্রয়োগের পেটোয়া বাহিনী টিকিয়ে রাখলে সেটিই পুরোনো জুলুমিব্যবস্থাকে নতুন করে ফিরিয়ে আনে।
২. যদিও নির্বাচনীব্যবস্থা মূলত গণবিমুখ আপসকামী এলিটদের সাথে গণবিরোধী লুটেরা, অত্যাচারী ব্যবস্থার ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি মাধ্যম তবুও এর মাধ্যমে কখনো যদি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ম্যান্ডেট হাজির হয় তাহলে গণবিরোধী শক্তিসমূহ প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী ফয়সালা অস্বীকার করবে।
৩. শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণীর মানস মূলত বর্ণবাদী ও লুম্পেন ভীতু প্রকৃতির তাই তাদের নেতৃত্বে গণরাজনৈতিক ধারা চূড়ান্ত লড়াইয়ে প্রবেশ করলে এরা হয় পলায়ন অথবা আপস বা দুটোই করে।
৬
গণমানুষের রক্তস্নাত বিজয়ের ওপরে দাঁড়িয়ে শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণী তথা আওয়ামী নেত-কর্মীরা মুজিবের নেতৃত্বে দেশকে তাদের কেনা তালুকে পরিণত করে। বিহারী গণহত্যা হয়, আদিবাসীদের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়, চলে দেদারসে সশস্ত্র লুটপাট (এরা ব্রিটিশ বাহিনী আর অফিসারদের মতো ডিসিপ্লিন্ড লুটপাটে ট্রেইন্ড নয়) ও প্রতিপক্ষদের গুম, নির্যাতন ও হত্যা। ব্রিটিশের রেখে যাওয়া পেটোয়া, জুলুমিব্যবস্থা আদর্শিক জাতীয়তাবাদের হাতে পড়ে রূপ নেয় পিউর ফ্যাসিবাদে। দেশে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। স্বাধিকার হারিয়ে দেশ পরিণত হয় রুশ-ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নকে।
সিরাজুল আলম খানসহ গণমুখী রাজনীতিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মুক্তিযোদ্ধারা জাসদ হিসেবে বেরিয়ে আসেন। কমরেড সিরাজ সিকদার ছয় পাহাড়ের দালাল থিসিস প্রকাশ করে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও ভারতের বিরুদ্ধে। ভাসানী ততদিনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তবুও তিনি কোনোমতে হুকুমাতে রব্বানিয়া আন্দোলনের ঘোষণা দেন। তবে কারো মধ্যেই ঐক্য গড়ে ওঠেনি। গণমানুষ প্রধান না হয়ে তাঁদের লড়াই আবর্তিত হয় সামরিক-বেসামরিক প্রাসাদ ষড়যন্ত্র (কর্নেল তাহেরের ইনভলভমেন্টে) আর ক্রমশ গণবিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসবাদে (সিরাজ সিকদার)। অস্ত্রের সুলভতা, যুদ্ধের ট্রমা কোনো ফ্যাক্টরগুলো এই গণবিচ্ছিন্নতাকে নির্মাণ করেছে সেটা আরো ভাববার বিষয় কিন্তু গণরাজনৈতিক ধারাকে যারা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন তাঁদের এই রাজনৈতিক কৌশলে ভুলভ্রান্তির ফলে মুজিবের পক্ষে বাকশাল কায়েম সম্ভব হয়। রক্তাক্ত সেনা অভ্যুত্থান ছাড়া অন্য সকল পথ রুদ্ধ হয়ে যায় দেশকে মুক্ত করার। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টে সেনা অভ্যুত্থানটি ঘটে এবং শেখ মুজিব পরিবারের প্রায় সকল সদস্যসহ নিহত হন।
রাজনৈতিক পরিকল্পনাহীন, গণবিচ্ছিন্ন যেকোনো প্রচেষ্টার মতো এই অভ্যুত্থানও প্রথম থেকেই ব্যর্থ হতে শুরু করে। ভারতপন্থীদের পাল্টা ক্যু এবং প্রতিক্রিয়ায় জাসদের সেনা বিদ্রোহের প্রচেষ্টার পর মেজর জিয়া রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে উঠে আসেন সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। ক্যু পাল্টা ক্যুয়ের মাঝে বৈদেশিক আগ্রাসন ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন থেকে বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখা এবং বাংলার মানুষকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির পথ প্রদর্শনই ছিলো সেসময়ের গণরাজনৈতিক কর্তব্য। কোনো আদর্শিক ব্লক থেকে না আসায় এবং সর্বজনপ্রিয় হওয়ায় মেজর জিয়া ঐক্য ও স্থিতিশীলতা দ্রুতই ফিরিয়ে আনতে পারেন। যদিও তাঁকে বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হয় যার সঠিক বিচার একমাত্র ইতিহাসই কেবল করতে পারে। মেজর জিয়া অর্থনীতিতেও প্রথমবারের মতো উদ্যোক্তা নির্মাণের ভিত্তি গড়ে দেওয়ায় এই অঞ্চলে লুটপাটের বাইরে (সাতচল্লিশ ও একাত্তরে শত্রু সম্পত্তি লুট) থেকে স্বনির্ভর জাতীয় পুঁজি গড়ে উঠতে থাকে। ফলে চাষা-মজুর-শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নতির পথ পূর্বের চেয়ে সুগম হয়ে ওঠে। তিনি উপনিবেশিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ বহুদলীয় ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনেন। এই সুযোগে নতুন করে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী-ভারতীয় চক্র বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো এবং তার বিরুদ্ধে বৃহত্তর জোট আকারে বিএনপি দাঁড়ালো। রাজনৈতিক পরিসরে জারি হলো আগ্রাসী ফ্যাসিবাদী শক্তি ও ফ্যাসিবাদবিরোধীদের অনন্ত সহিংস লড়াই। এই লড়াইয়ের ধারাবাহিকতাতেই প্রাণ হারালেন মেজর জিয়া। পেটোয়া পুলিশ, জালেম আদালত ও শোষণ-লুটপাটমূলক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন না হওয়ায় মজলুম জনগোষ্ঠীর মুক্তি এলো না।
বাংলাদেশের প্রথম পর্বের ইতিহাস থেকে জরুরি যা জানা যায় তা হলো—
১. বাংলাদেশে শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণী অভ্যাসগতভাবে ফ্যাসিবাদী।
২. বাংলাদেশে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিসর থেকে ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত উৎখাত না ঘটালে বহুদলীয় ব্যবস্থা ও নির্বাচনের সুযোগ নিয়ে এই শক্তি বারেবারে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও বাংলার মজলুম জনগণের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করতে উদ্যত হবে।
৭
মেজর জিয়ার মৃত্যুর পরে অস্থির রাজনৈতিক পরিসরের সুযোগ নিয়ে অতি দ্রুতই জেনারেল এরশাদের সেনাশাসন কায়েম করেন আইয়ুবের অনুকরণে। এরশাদ সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও লুটেরা পুঁজির পৃষ্ঠপোষকতা করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে চাইলে আইয়ুবের মতোই গণঅভ্যুত্থানে তার পতন হয় নব্বই সালে। গণঅভ্যুত্থানের পরে গণবিমুখ রাজনৈতিক দলগুলোর তত্ত্বাবধানে বহুদলীয় ব্যবস্থাই পুনর্বহাল হলো। কিন্তু যেহেতু পেটোয়া বাহিনী আর আদালত যার হাতে তারা যেকোনো প্রতিপক্ষ দলকেই পিটিয়ে আর মামলা দিয়ে মাঠছাড়া করতে পারে সেহেতু বহুদলীয় ক্ষমতা বণ্টনটি সকল এলিট লুটেরা গোষ্ঠীর মধ্যে আরো সুষ্ঠু করে তুলতে ছিয়ানব্বইয়ে আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা আনতে হলো। গণমানুষ বঞ্চিত, লাঞ্ছিত হলেও সর্বাত্মক বিদ্রোহ করার যৌক্তিকতা কেড়ে নেয়া হলো নির্বাচনী গণতন্ত্র; একে পছন্দ না হলে ওকে আনুন যুক্তির হেজেমনি কায়েম করে।
নব্বইয়ে সোভিয়েত পতন, WTO বিস্তার তথা সারাবিশ্বে বৈশ্বিক বাজার গঠনকালে বাংলাদেশ স্বস্তা শ্রম ও কাঁচামালের দেশ হিসেবে নিও-লিবারেল বিশ্বের ভ্যালু চেইনে জায়গা করে নেয়। দেশীয় গ্যাস, কয়লাসহ নানামুখী রিসোর্স হয়ে পড়লো বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির শোষণের ক্ষেত্র। আমাদেরই সম্পদ শোষণ করে, আমাদেরকে গার্মেন্টসে দিনকে দিন সস্তায় খাটানো এবং বিদেশে অমানবিক শ্রম শোষণ করে লাভবান হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করল বহুজাতিক কোম্পানি ও বৈশ্বিক পুঁজিবাদ। যেসকল দেশীয় লুটেরারা এই প্রক্রিয়ায় বৈদেশিক শক্তির পার্টনার হওয়ার সক্ষমতা দেখালো তারা হয়ে উঠলো দেশীয় শিল্পপতি/অলিগার্ক। ঘন ঘন শ্রমিক আন্দোলন, ফুলবাড়ীর জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের মতো গণরাজনৈতিক প্রতিরোধ ঠেকাতে কাজে লাগতে থাকলো পুরোনো পুলিশিব্যবস্থা ও আদালত। যারাই জনবিক্ষোভকে সামাল দিয়ে বৈদেশিক শোষণ ও দেশীয় অলিগার্কদের আধিপত্য ভালোভাবে টিকিয়ে রাখতে পারবে তাদেরকেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন প্রদান করে নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হতে লাগলো। পাঁচ বছর পরপর তাই লুটপাট, জুলুম চালিয়ে অর্জনপ্রিয় হয়ে যাওয়া দল পরিবর্তন করে অন্য দলের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে জনবিক্ষোভ ম্যানেজ করে যাওয়ার রাজনীতি দেশে প্রতিষ্ঠিত হলো। তত্ত্বাবধায়কের রূপেই ক্ষমতার ভাগবণ্টনকারী হয়ে উঠলো বিদেশি পুঁজির আজ্ঞাবহ, লুটেরা অলিগার্ক, পেটোয়া বাহিনী, জালেম আদালত ও সরকারি আমলা। আমাদের রাজনীতিবিদেরা নিজেদের এই ব্যবস্থায় ভালো ম্যানেজার হিসেবে তৈরি করার প্রতিযোগিতায় নামলেন।
শিক্ষায় বিনিয়োগ, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি কোনো কিছুই আর প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ালো না। লাখে লাখে বেকার শ্রমের বাজার সস্তা রাখে, দালালিটা জমে ভালো। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বৃহত্তর জাতীয় পুঁজিতে অবদান রাখার সুযোগ ধ্বংস করা হলো অলিগার্কীয় মনোপলি বা ডুয়োপলি কায়েম করে। দেশের মানুষকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক দাসত্বে নিমজ্জিত করা হলো। তাই এই পর্যায়ে বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলনসহ শ্রেণী-পেশানির্ভর আন্দোলনসমূহ বিচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত হতে শুরু করলো কিন্তু এগুলো দানা বেঁধে উঠে পারেনি জাতীয় কোনো সংগ্রামে।
আশি থেকে একবিংশ শতকের শুরুর এই মেয়াদ বিশ্লেষণে বেশকিছু ব্যাপার পরিষ্কার হয়, যেমন—
১. এই পর্যায়ে এসে আমরা একটা প্রবণতা দেখতে পাই। জালিমি লুটেরা ব্যবস্থা গণমানুষের সম্মিলিত বিক্ষোভ, সংগ্রামের ক্রমবর্ধমান আঘাতে ভেঙে পড়ার উপক্রম হলে গণবিমুখ রাজনীতিবিদদের সরিয়ে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ করে পুনরায় ধীরে ধীরে ঐ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনে।
২. সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের শাসন তথা ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া অফিসারশ্রেণীর সরাসরি খোদকারী (Direct Management) গণঅভ্যুত্থানের মুখোমুখি হলে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রতিভূ গণবিমুখ রাজনীতিবিদেরা জনতার রক্তের উপরে দাঁড়িয়ে পুনরায় নির্বাচনীব্যবস্থা কায়েম করে নিজেরা নিজেদের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেয় এবং একেই রক্ত দেয়া মজলুম ছাত্র-শ্রমিক-জনতার বিজয় হিসেবে সাব্যস্ত করে।
৩. একবিংশ শতকের শুরুতে তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থার মধ্যদিয়ে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সাথে দেশীয় অলিগার্ক এজেন্ট এবং সামরিক-বেসামরিক অফিসারশ্রেণীর সরাসরি সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং এই নেক্সাসটি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতা ভাগবাটোয়ারা করে দেয়ার মধ্যস্থতাকারী হয়ে ওঠে।
৮
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের সরাসরি মদতে আওয়ামী ও মুজিববাদী বামদের গণবিরোধী, বাংলাদেশের অস্তিত্ববিরোধী কার্যক্রম জারি থাকায় দেশের রাজনীতিতে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করে। ক্রমাগত হরতাল, অবরোধ, ভাঙচুরে দেশের জনজীবন ও মানুষের নিরাপত্তা অনন্ত হুমকিতে পড়ে যায়। ফলশ্রুতিতে বৈদেশিক প্রভুদের বিনিয়োগ ও শোষণ-আধিপত্যমূলক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। এই অবস্থায় গণবিরোধী নেক্সাসটির প্রয়োজন ছিলো দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিসর যাতে লুটপাট চলমান ও নিরবিচ্ছিন্ন থাকে। অন্যদিকে গণমানুষ লুটপাট, জুলুম না চাইলেও স্থিতিশীলতা চাচ্ছিলো নিজেদের জান-মালের নিরাপত্তাহেতু। জনগণের এই প্রয়োজনকে ব্যবহার করে এবং গণবিরোধী নেক্সাসের সহায়তায় বিএনপি চার সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নির্বাচনে নিজেদের জিতিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং গণবিরোধী নেক্সাসটি সরাসরি হাজির হয়ে ফখরুদ্দীনকে সামনে রেখে ক্ষমতা গ্রহণ করে।
বিএনপি স্থিতিশীল একদলীয় শাসন কায়েমে ব্যর্থ হওয়ায় আওয়ামীলীগ ছিলো গণবিরোধী নেক্সাসের একমাত্র অপশন। ফ্যাসিবাদী একদলীয় চেতনা থাকায় এই দলটি মতাদর্শিকভাবেও ছিলো এইজন্যে একেবারে চলনসই। বৈশ্বিক পুঁজির মালিকেরা তখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে (War on Terror) লিপ্ত যা ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষের মতাদর্শিক আবহাওয়ায় চালিত হচ্ছিলো। আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারে ধাতগতভাবেই ইসলামবিদ্বেষী ও মুসলমান বিরোধী উনবিংশ শতকের কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চবর্ণীয় হিন্দু শ্রেণীজাত বাঙালি জাতীয়তাবাদ ধারণ করায় বৈশ্বিক পুঁজির পছন্দে দলটি এক নাম্বারে চলে আসে। ফলত জনগণের স্থিতিশীলতার আকাঙ্ক্ষা, গণবিরোধী নেক্সাসের একমাত্র অপশন এবং বৈশ্বিক প্রভুদের এক নাম্বার পছন্দে পরিণত হওয়ার মতো পরিস্থিতিগুলো এক বিন্দুতে উপনীত হলে দুই হাজার নয়ের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পরে ফ্যাসিবাদী এক দলীয় শাসন কায়েমের সকল পথ আওয়ামী লীগের সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়। দুই হাজার তেরোর শাহবাগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘রাজাকার’ আকারে দমনযোগ্য পরিচয় নির্মাণের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ তার কাঙ্ক্ষিত ফ্যাসিবাদ কায়েম করে ফেলে। আওয়ামী লীগ তার দীর্ঘ পনেরো বছরের শাসনে তিনটি পাতানো নির্বাচন আয়োজন করে নিজেদের বৈধতা উৎপাদন করে। হাজারো-লক্ষ মানুষকে গুম, নির্যাতন ও খুন করে। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী চেতনা যেহেতু মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক সর্বভারতীয় ফ্যাসিবাদী চেতনারই এক্সটেনশন সেহেতু ভারতের স্বার্থে দলটি দেশের সামরিক বাহিনী, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, নদীব্যবস্থা, অর্থনীতিসহ প্রায় সবকিছুই ভারতীয় শাসকশ্রেণীর কাছে জিম্মা দিয়ে দেয়।
অন্য কোনোভাবে ক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগকে হটানো অসম্ভব হয়ে পড়লে গণঅভ্যুত্থানই হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র লাইন। কিন্তু যেখানে উনসত্তর আর নব্বইয়ে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে সাথে নিয়ে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও তাদের পোষা ভুঁইফোড় দলগুলোকে হটিয়ে দিয়েছিলো এইবার তারা আর তা করতে সক্ষম হচ্ছিলো না। লুটেরা ও পেটোয়া সকল প্রতিষ্ঠানের মালিক আওয়ামী লীগ যেমন এগুলো ব্যবহার করে বিরোধীদের উপরে দমন-পীড়ন চালায় তেমনি দেশের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফ্যাসিস্ট অ্যাকটিভিস্টদের সমর্থনে রাজনৈতিক দল আকারে রাজপথের দখলও কুক্ষিগত করে রাখে। সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের যেই দুর্বলতা ছিলো (রাজপথে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন না থাকা) সেটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ছিলো না। ফলে বিরোধী দলগুলো বারংবার পরাজিত হচ্ছিলো। অন্যদিকে জনগণও বিরোধী দলগুলোকে সাড়া দিচ্ছিলো না কেননা এতদিনের অভিজ্ঞতায় তারা বুঝেছিলো যে নির্বাচনীব্যবস্থায় ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা পুনরায় ফিরে এলে তাদের জীবনের কোনো পরিবর্তন হবে না। তাই জুলুমিব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে সেখানে জালিমের অপশন বৃদ্ধির জন্যে মানুষ রক্ত, ঘাম কোরবানি দিতে ইচ্ছুক হয়নি।
আঠারো সালে অধিকার ও বিচারভিত্তিক ছাত্র আন্দোলন তথা নিরাপদ সড়ক ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যদিয়ে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে গিয়ে গণরাজনৈতিক ধারা পুনরায় বিকশিত হতে শুরু করে। মেজর জিয়া কর্তৃক বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনর্বহালের পরে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে গণরাজনৈতিক ধারা গণবিমুখ পার্টি পলিটিক্সের নিগড় ভেঙে বেরিয়ে আসে। প্রাথমিকভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা ভিপি নূরের নেতৃত্বে নতুন দল করে পুরোনো দলীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও পাঠচক্র, সামাজিক, সাংস্কৃতিক নানা সংগঠন ও উদ্যোগের মধ্য দিয়ে গণরাজনৈতিক ধারা তার বিকাশ অব্যাহত রাখে।
এই সময়ে দুইটি প্যারাডাইম গণরাজনৈতিক ধারায় হাজির হয়। একটি হচ্ছে রাষ্ট্র সংস্কারের ধারণা। পুলিশ, আদালতসহ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানে গণবিরোধী চরিত্র সংস্কার করে এগুলোকে গণবান্ধব করলে সমাধান আসবে এমনটি এই প্যারাডাইমের উপসংহার। অন্যদিকে আরেকটি প্যারাডাইম দাঁড়ায় জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যা বিদ্যমান সকল জুলুমি প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলে নতুন গণবান্ধব প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও রাষ্ট্র গঠনকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে। রাষ্ট্র সংস্কারের রাজনীতি রাষ্ট্রচিন্তা ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ধারণ করে। তবে অতি দ্রুতই তারা গণবিমুখ রাজনৈতিক দলগুলোর ঘাড়ে চেপে রাষ্ট্র সংস্কারের পথ বেছে নেওয়ায় গণবিমুখী পার্টি ও জোট রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। যেখানে পুরোনো দলগুলো জুলুমিব্যবস্থা বজায় রেখেই তাতে নিজেদের ভাগ বুঝে নিতে চাইছিলো নির্বাচনের মাধ্যমে সেখানে তাদের ঐ ব্যবস্থা সংস্কার করে লুটপাট ও বিরোধী মত দমনের সুবিধাগুলো ত্যাগ করতে চাওয়াটা সাংঘর্ষিক। যদিও একপর্যায়ে জনগণকে টানতে বিএনপি রাষ্ট্র সংস্কারের একত্রিশ দফা দাবি প্রণয়ন করে।
নতুন গণরাজনৈতিক ধারা থেকে বিচ্যুত গণঅধিকার পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন থেকে সচেতন ছাত্র-তরুণদের একটি অংশ বেরিয়ে এসে ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি’ গঠন করে লেজুড়বৃত্তিক তথা দলীয় ছাত্ররাজনীতির বাইরে গিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে শুরু করে। চব্বিশে নতুন করে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে এই দলনিরপেক্ষ অংশটি নেতৃত্বে থাকায় দমন-পীড়নের মুখে মজলুম গণমানুষ এদেরকে বিশ্বাস করে পাশে দাঁড়ায় এবং পুলিশ, আদালতসহ আওয়ামী লীগ ও গোটা গণবিরোধী নেক্সাসের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়। বিএনপি ও জামায়াতের নির্যাতিত নিপীড়িত নেতা-কর্মীবৃন্দ পেছনে থেকে আন্দোলন সংঘটিত ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে মূল ভূমিকা রাখে। যার ফলাফলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সারা দেশে মজলুম ছাত্র-শ্রমিক-জনতাকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করে। শত বছরের লড়াইয়ের ইতিহাসে এই প্রথমবার গণরাজনৈতিক ধারাটি সামনে এবং রাজনৈতিক দল ও গণবিমুখ শক্তিগুলো পেছনে থেকে লড়াই করে।
অভ্যুত্থান সফল হওয়ার সাথে সাথেই ছাত্রনেতৃত্ব ও জনগণ তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় যার ফলে উনসত্তরের মতো সেনাবাহিনী সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণের সাহস করেনি; আবার নির্বাচনব্যবস্থা গণমানুষকে মুক্তি দেয় না এই অভিজ্ঞতা থাকায় দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে দলীয় সরকারের দাবিও ওঠেনি নব্বইয়ের মতো। পুলিশসহ সকল জালেম বাহিনী তখন কার্যত পরাজিত, হুকুমাতের আদালত ক্ষমতাহীন। জনগণ তখন নিজেদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তিকে রূপ দিতে সক্ষম এমন রাষ্ট্র গঠনে উদগ্রীব। সেই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলসমূহ বৈঠকে বসলো গণবিরোধী নেক্সাসের মুখপাত্র সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সাথে যাতে করে ক্ষমতা ভাগাভাগির নতুন বন্দোবস্ত কায়েম করা যায়। গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও রক্তাক্ত ত্যাগ স্বীকারকারী বৃহৎ অংশের ছাত্র-শ্রমিক ও জনতা এই দলগুলোর অনুগত যাদের গণরাজনৈতিক, গণবিমুখ কিংবা গণবিরোধী রাজনীতির পার্থক্য সম্পর্কে কোনো সচেতনতাই ছিলো না। তাদের আত্মত্যাগ ও আনুগত্যকে পুঁজি করে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো গণঅভ্যুত্থানে তাদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করে এবং ছাত্রনেতৃত্বকে নতুন গণবান্ধব রাষ্ট্রগঠনের উপযোগী জাতীয় সরকার নির্মাণের প্রস্তাব থেকে সরে আসতে বাধ্য করে। গণবিরোধী নেক্সাসের সহায়তায়, রাজনৈতিক দলসমূহ ছাত্রনেতৃত্ব ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণীর প্রতিনিধিত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে। গণবিরোধী সকল প্রতিষ্ঠান, পুরোনো পুলিশ, আদালত আবার বহাল হয় কেবল ছাত্রনেতৃত্বের অতি সামান্য প্রতিনিধিত্ব নিয়ে একে গণবান্ধব চেহারা প্রদান করা হয়। বৃহত্তর মজলুম জনগোষ্ঠীকে প্রবোধ দিতে শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণীর প্রতিনিধিত্বে সংস্কার কমিশন গঠন করে তার সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণবান্ধব রাষ্ট্র তৈরির প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়। অর্থাৎ ছাত্র নেতৃত্ব ও নির্দলীয় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সুশীল সমাজকে সামনে রেখে পেছনে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেয় রাজনৈতিক দলগুলো উপরন্তু শ্রমিক আন্দোলনে গুলি করে শ্রমিক হত্যা ও দুর্নীতির ধারাবাহিকতা মূলত এটাই প্রমাণ করে যে এক সময়ের আওয়ামী ফ্যাসিস্ট দোসর বৈদেশিক প্রভুদের এজেন্ট দেশীয় অলিগার্কেরাও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সংস্কার কমিশন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুঃখজনক ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার প্যারাডাইমের সীমাবদ্ধতা ধরা পড়েছে। পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দুর্নীতিবাজ ও জালেম সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্তাক্ত লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা রাজপথে পরাজিত করেছে। তাদের ফিরিয়ে এনে আবার তাদেরকে দিয়েই তাদের সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া চরমতম ইউটোপিয়ান চিন্তা হিসেবে ধরা দিয়েছে। ফিরে আসা গণবিরোধী সকল প্রতিষ্ঠানই ভেতর থেকে সংস্কার প্রক্রিয়াকে বারবার স্যাবোটাজ করেছে। দ্রুত যাতে নির্বাচনীব্যবস্থা ফেরত এসে সংস্কারের ভূত দূরে সরে যায় তা নিশ্চিত করতে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আঁতাত করে রাজনৈতিক পরিসরে নির্বাচনকে আবার প্রধান করে তুলেছে। ক্রমাগত স্যাবোটাজ এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত প্রতিনিধিদের দুর্বলতা ও আপসকামীতায় বিরক্ত হয়ে জনগণও নির্বাচনী আমেজকে মেনে নিয়েছে। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর ঘাড়ে চড়ে, জালেম, লুটেরা সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার করতে চাওয়ার ইউটোপিয়ান প্রজেক্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জনকে রূপায়িত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা আমাদের যা যা শিক্ষা দেয় তা হলো—
১. ফ্যাসিবাদী ও গণবিরোধী ধারা এখন যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে জনমত গঠনে (Consent Manufacturing) মনোযোগ দেয়। শাহবাগ আন্দোলন কিংবা এখন নির্বাচনী ব্যবস্থার পুনর্বহালে এই কাজ করা হচ্ছে।
২. জালেম লুটেরাব্যবস্থা চালাতে সবচেয়ে দক্ষ হচ্ছে ফ্যাসিবাদী শক্তি তাই বৈদেশিক প্রভুরা ভালো ম্যানেজার হিসেবে ফ্যাসিস্টদেরই বেছে নেবে যদি এই জালেম, লুটেরা ব্যবস্থা বহাল থাকে। আবার এই ব্যবস্থাও ফ্যাসিস্টদের সহায়তা করবে কেননা ফ্যাসিস্টরাই একে পূর্ণ বিকশিত করে তোলে।
৩. পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাজিত করতে অক্ষম। হয় তারা এর সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করবে জালেম, লুটেরা ব্যবস্থার মধ্যস্থতায় অথবা তারা ফ্যাসিস্ট শক্তি কর্তৃক নিষ্পেষিত হবে।
৪. পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তোলা সম্ভব এবং এই পরিসর থেকে উদ্ভূত গণশক্তি ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাজিত করতেও সক্ষম।
৫. নির্দলীয় স্বতন্ত্র গণশক্তি যদি গণবিমুখ রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্ষমতার অংশীদার করে তবে তাদের চাপে গণবিরোধী নেক্সাস পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
৬. গণবিরোধী শক্তি কিংবা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রকাঠামোর ‘সংস্কার’ সম্ভব নয়। এর সাথে লড়াই হলে তাকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেই ছাড়তে হয় নতুবা ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে। এই শক্তি পরাজিত হলে তার স্থলে গণবান্ধব, মজলুম ছাত্র-শ্রমিক-জনতার রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে।