জনগণের গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে উঠুক


ফরহাদ মজহারের এই নিবন্ধগুলো এক-এগারোর সময়কালে বিভিন্ন সময়ে লেখা। এক-এগারোর সময়কাল ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে পরের বছর ২০০৮ সাল জুড়ে। নিবন্ধগুলো ২০০৮ সালের রাজনৈতিক ঘটনা-ঘটনের পটভূমিতে বসে সমসাময়িক সময় ও প্রসঙ্গ নিয়ে লেখা। ফলে ইতিহাসের বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট উপাদানে ভরপুর। তবে এটা কেচ্ছাকাহিনীর মতো বলে যাওয়া কোনো বিবরণ নয়। বরং তার মধ্য দিয়ে মূলত বাস্তবতা ও বাস্তব ঘটনাঘটনের প্রতি তাৎক্ষণিক পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই লেখালিখিগুলো বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে নতুন বয়ান ও মতামত হাজির করেছে, রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছে। ফলে আমরা লেখাগুলিকে খোদ এই ইতিহাসের প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবেই পড়তে পারি। এই লেখাগুলি আমরা চিন্তার পাঠকদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি যাতে পাঠক আজকের পরিস্থিতে বসে সেসময় কে কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কিভাবে নিচ্ছিলো তার প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করে নিতে পারেন।


 

বাংলাদেশ ভয়ানক বিপদের মধ্যে পড়েছে— এ কথা আমি বারবারই বলে আসছি। বিপদের চরিত্র ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার জন্য আমাদের সকলকেই যার যার কাজের ক্ষেত্র থেকে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। হতে পারে আমরা দুই একজন সামনের কাতারের মানুষ হক কথা বলার অপরাধে খরচ হয়ে যেতে পারি। তাতে কী আছে। কারণ চিন্তা ও তৎপরতার যে বীজ আমরা বুনে যাবার চেষ্টা করছি, সেটা খুব তাড়াতাড়িই মহীরুহে পরিণত হবে। এই দেশের মানুষই ইতিহাস সৃষ্টি করবে। পরাশক্তির সকল হিশাব-নিকাশ বানচাল করে দেবে। তার লক্ষণই ফুটে উঠছে দ্রুত।

ঘটনা ঘটেছে যাতে আমি প্রচুর অনুপ্রাণিত বোধ করেছি। জাপানে আমাদের প্রচুর প্রতিভাবান তরুণ ছেলেমেয়ে পড়ছেন। তাদেরই উৎসাহে সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ডেভিড ওয়াংক জানুয়ারির ২৬ তারিখে একটি চমৎকার আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করেছিলেন। বিষয় ছিল অলটারনেটিভ ডেভেলপমেন্ট (Alternative Development)। ‘ডেভেলপমেন্ট’ কথাটার সংস্কৃত মার্কা অনুবাদ করা হয় ‘উন্নয়ন’। অথচ তৎসম শব্দ হলেও ‘উন্নতি’ বলে একটা শব্দ আছে আমাদের। এর তাৎপর্যগত ইঙ্গিত হচ্ছে ‘নতি’ স্বীকার না করা- অন্যের নতি স্বীকার করে থাকা নতজানু জীবন মেনে না নেওয়া। পরাধীন জীবন্ত অতিক্রম করে নিজের সার্বভৌম শক্তি ও প্রতিভার বিকাশ ঘটানো। নিজের জীবন নিজের হাতে ফিরিয়ে আনা এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবার শক্তি অর্জন করা। এই দিক থেকেই একটি জনগোষ্ঠীর ‘উন্নতি’ ঔপনিবেশিকতা, সাম্রাজ্যবাদ ও পরাশক্তির দখলদারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মধ্যে নিহিত। ‘উন্নতি’ এই দিক থেকে রাজনৈতিক পরিভাষা, অর্থনীতি মার্কা ধারণা নয়। উন্নতি- ভারি সুন্দর শব্দ। সহজ ও মানুষের প্রাণের কথা। আমরা অবশ্যই উন্নতি চাই। ‘উন্নতি’-র আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক অবশ্যই আছে। কিন্তু প্রথমেই আছে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিশাবে নিজেদের শক্তি নিজেদের মধ্যে সন্নিবেশ ঘটানো ও নিজেদের দেশের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেবার ক্ষমতা অর্জন। একটি দেশের উন্নতি মানে সেই দেশের জনগণের সার্বভৌম রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকাশ, যে বিকাশ নিশ্চিত করা না গেলে তার পক্ষে অর্থনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক বিকাশ সাধন অসম্ভব। ইমপসিবল।

অথচ ‘উন্নয়ন’ মানে নিছকই বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার অসম সম্পর্কের অধীনে পুঁজিতান্ত্রিক উন্নয়ন। এই উন্নয়নের তত্ত্ব কারা দেবে? অবশ্যই দেবে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সাহায্য সংস্থা। তারাই ‘সুশীল’ সমাজ নামক দালাল, মুৎসুদ্দি ও পরজীবী শ্রেণীদের দিয়ে তাদের আকাম-কুকামগুলো বাস্তবায়িত করবে। কারা ‘উন্নয়ন’ দেখভাল করবে? দেখভাল করবে পরাশক্তির স্থানীয় দূতাবাস। বশংবদ দেশীয় সাহায্য সংস্থাগুলো হবে তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি। ‘উন্নয়ন’ মার্কা তত্ত্ব বা ধারণার আদত অনুমান হচ্ছে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিশাবে আমাদের সার্বভৌম ক্ষমতার বিকাশের দরকার নাই। আমাদের দরকার পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে কী করে বাংলাদেশকে পরাশক্তি ও অবাধ বাজারব্যবস্থার অধীন করা যায় সেই কৌশল চর্চা করা। বাংলাদেশকে বিদেশিদের বাজার ও লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে পরিণত করা।

তাহলে ‘উন্নতি’ ও ‘উন্নয়ন’- এই দুই ধারণার মধ্যে পার্থক্য আকাশ আর পাতাল। কিন্তু ইংরেজিতে এই ধরনের ভাষাগত সুবিধা নাই বলে ‘উন্নতি’ কথাটা বোঝাতে সাধারণত ইংরেজিতে অনেকে ‘Alternative development’ কথাটা ব্যবহার করেন। দ্যোতনার দিক থেকে ‘উন্নতি’ কথাটার মধ্যে যে তাৎপর্য, আক্ষরিক অর্থে ‘বিকল্প উন্নয়ন’ বললে সেটা বোঝা যায় না, এমনকি পুরানা মদই নতুন বোতলে ঢোকানো মনে হয়। তবুও যারা তৃতীয় বিশ্বের জনগণের ‘উন্নতি’ যে ‘উন্নয়ন’ মার্কা ধারণার চেয়ে আলাদা তা বোঝাবার জন্য ‘Alternative development’ কথাটা ব্যবহার করেন। অর্থাৎ তারা বোঝাতে চান পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা যেভাবে বিভিন্ন দেশ, উৎপাদন ক্ষেত্র ও জীবনের সকল দিক গ্রাস করছে তার বিপরীতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিকাশের পথ নিশ্চয়ই আছে এবং তার চর্চাও মানুষ করছে। সেই চর্চার উদাহরণ হিশাবে নয়াকৃষি আন্দোলনের নাম ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে। কারণ আহাম্মকেও এই সত্য বুঝতে পারে যে খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে যদি আমরা প্রাণের প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকার শর্তই ধ্বংস করি, যদি বিষে বিষে পরিবেশ বিষাক্ত করে তুলি আর উৎপাদনের হাজার বছরের অভিজ্ঞতা ও লৌকিক ঐতিহ্য হারিয়ে বসে থাকি তাহলে ‘উন্নয়ন’ তো দূরের কথা, আমরা বেঁচে থাকতে পারব কিনা সেটাই সন্দেহের। নয়াকৃষি কিভাবে খাদ্য উৎপাদন বাড়াচ্ছে, বীজ ও প্রাণ সম্পদ রক্ষা করছে এবং সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নতুন ধরনের সমাজ গড়ে তুলছে সেই বিষয়গুলো প্রফেসর ওয়াংক তার ছাত্রদের জানাতে চেয়েছেন, উন্নতির এই নতুন পথগুলো সম্পর্কে ছাত্রদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান আরও পাকাপোক্ত করতে চেয়েছেন তিনি। যে কৃষকেরা কমপক্ষে আড়াই হাজার জাতের ধান রক্ষা করে ও যার মধ্যে বিপুল সংখ্যকের উৎপাদনশীলতা বিদ্যমান সকল ধানের জাতের চেয়ে বহুগুণে বেশি, তার প্রতি বৈজ্ঞানিক আগ্রহ থাকা খুবই স্বাভাবিক।

টোকিওতে আমাদের তরুণ ও প্রতিভাবান ছাত্রদের সঙ্গে আন্তরিক কথাবার্তা বলতে পারা বিরল সৌভাগ্যই বলতে হবে। তারা সচেতন হয়ে উঠছেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে তর্কবিতর্কও করেছেন। অনেকে বলেছেন, তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেছিলেন এই সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে কাজ করছে সেটা ভাল কাজ। কিন্তু খুব কম সময়ের মধ্যেই তাদের আশা ভঙ্গ হয়েছে। তারা পথ সন্ধান করছেন। সবচেয়ে আশার কথা তারা দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, এই দৃঢ়তাই তাদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছে। নিরাশার মধ্যেই এই লক্ষণগুলোই আমাদের জন্য আশার, ভবিষ্যতের জন্য আলোর মতো। তাদের আতিথেয়তা ও আন্তরিকতার জন্য ধন্যবাদ জানানোর কোনো মানে হয় না। সবচেয়ে ভাল লেগেছে তাদের ডরমেটরি বা আবাসিক হলে সকলে মিলে রান্নাবান্না করা আর একসঙ্গে খাবার অভিজ্ঞতা। এই মধুর স্মৃতি কখনই ভুলে যাবার নয়। দেশের প্রতি যে তীব্র ভালবাসা আমি আগামী প্রজন্মের মধ্যে দেখছি তার ওপরই আমাদের দাঁড়াতে হবে। তাদের ধন্যবাদ।

বাংলাদেশের আগামী রাজনীতির অভিমুখ কোনদিকে সেটা বুঝতে হলে কয়েকটি বিষয়ে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। পরাশক্তি যে উদ্দেশ্যে এগারোই জানুয়ারির ঘটনা ঘটিয়েছে সেই উদ্দেশ্য অনেকাংশেই সফল করতে সক্ষম হয়েছে। যেমন, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া। কোনো রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগারোই জানুয়ারির আগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থেকে একটি জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলা বাংলাদেশের জন্য অসম্ভব করে দিয়েছে ক্ষমতাসীন উপদেষ্টা সরকার। অর্থনৈতিকভাবে মার খাওয়ার মুখে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে পুরা দেশকে তুলে দেবার ব্যবস্থা করে দিয়েছে যাতে যে সরকারই এখন আসুক তাকে টিকে থাকতে হবে অল্প কয়েকটি বিদেশি কোম্পানির চাকরবাকর হয়ে। অন্যদিকে এর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশে স্থিতিশীল নির্বাচিত সরকার গঠন করাও এখন দুরাশা মাত্র। একদিকে পরাশক্তির অর্থনৈতিক স্বার্থের চাপ আর অন্যদিকে জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বিএনপি, আওয়ামী লীগ বা কোনো নির্বাচিত জোট সরকার যেন টিকতে না পারে তার ব্যবস্থা মোটামুটি পাকাপোক্ত করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ‘মহাজোট’ করেও কোনো স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবে না। অবশ্য যদি নির্বাচন হয় আর মহাজোটকে উপদেষ্টা সরকার জিতিয়ে আনে। কিন্তু তার পরেও আগামীতে কোনো নির্বাচিত সরকারেরই টিকিয়ে থাকার সম্ভাবনা নাই বললেই চলে। অবশ্য বর্তমান সরকারের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই যদি কারো পণ হয় সেটা ভিন্ন কথা।

দ্বিতীয় যে দিকটা ভয়াবহ এবং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি সেটা হচ্ছে খাদ্যব্যবস্থা— বিশেষত কৃষিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়ে অল্প কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া। কৃষি উপদেষ্টা সিএস করিম এই সফলতার সঙ্গে বন্যা ও তুফানের সুযোগ নিয়ে হাইব্রিড বীজের বাজার কোম্পানিগুলোর জন্য শুধু দখলই করেন নি, তাদের জন্য সরকারি ভর্তুকিও দিচ্ছেন। ভাবুন, কোম্পানিগুলো সার, বীজ, বিদ্যুৎ, পানি সব ক্ষেত্রেই ভর্তুকি পাচ্ছে— কোম্পানিই নাকি আমাদের খাওয়াবে। তাকে বারবার আমরা প্রশ্ন করেছি যে, যে সকল বীজ তিনি প্রবর্তন করছেন তাদের উৎপাদনশীলতা নিয়ে কোথায় পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে? বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়াবার পথ একমাত্র বাজারের হাইব্রিড বীজে কৃষকের হাতে গড়া হাজার বছরের বীজব্যবস্থা ধ্বংস ও সর্বনাশের এতো বড়ো চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র অন্য কোনো দেশে হয়েছে বলে আমার জানা নাই। ‘No Logo’ বই লিখে বিখ্যাত হওয়া নাওমি ক্লাইন (Naomi Klein) সম্প্রতি একটি দারুণ বই লিখেছেন। সেটা হচ্ছে ‘Shock Capitalism’। তিনি disaster বা দুর্যোগের সময় এই ধরনের ‘শক’ দিয়ে— যেমন বন্যা, তুফান, খাদ্য ঘাটতির ভয় দেখিয়ে কিভাবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাজার দখল করছে, মুনাফার নতুন নতুন ক্ষেত্র বাড়াচ্ছে সেই সম্পর্কে লিখেছেন।

তৃতীয় যে দিকটা আমরা দেখছি সেটা হলো তেল, গ্যাস, কয়লা এবং খনিজ সম্পদও বিদেশিদের হাতে তুলে দেবার ব্যবস্থা কম বেশি কমপ্লিট করেছে ক্ষমতাসীনরা। মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে যে চুক্তি করা হয়, সেই চুক্তি কোনো নির্বাচিত সরকার— বিশেষত বাংলাদেশের মতো দুর্বল রাষ্ট্রের পক্ষে অস্বীকার করা অসম্ভবই বটে। অথচ এই সরকারের কোনো নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেবার সাংবিধানিক এখতিয়ার নাই। তাছাড়া সাংবিধানিকভাবে এই সরকার আদৌ বৈধ কিনা সেটাও তর্কের বিষয়।

মোট কথা আমরা যে মহাবিপদে পড়েছি তার হাত থেকে রক্ষা পাবার পথ কী? পরাশক্তিগুলো এখন জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া ও নির্বাচন দেবার কথা বলছে। জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হোক এটা অবশ্যই জনগণের দাবি। কিন্তু পরাশক্তিগুলো যে কারণে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া ও নির্বাচনের দাবি করছে তার কারণ অন্যত্র। বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা ও সংকল্পের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নাই। তাদের নিজ নিজ দেশের জনগণ বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে সমর্থন করবার পক্ষে কোনো যুক্তি পাচ্ছে না। একদিকে এই সরকার সাংবিধানিকভাবে অবৈধ, অন্যদিকে চরম অদক্ষ। তাহলে কোন যুক্তিতে এই সরকারকে পরাশক্তির পররাষ্ট্র দফতর— বিশেষত তাদের স্থানীয় দূতাবাসগুলো সমর্থন দিচ্ছে? ফলে পররাষ্ট্র দফতরগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। পররাষ্ট্র দফতরগুলোর দিক থেকে দুটো কারণ এখানে মুখ্য। এক, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং দুই, অর্থনীতি ও জিনিসপত্রের প্রচণ্ড মূল্য বৃদ্ধির ফলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই সরকারের আমলে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে, তবে পররাষ্ট্র দফতরগুলোর চাপের মুখে খানিক কমেছে। সেটা ভাল কথা। কিন্তু বিপজ্জনক দিক হলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ও কারাগারে নির্যাতনের ঘটনার বৃদ্ধি। সম্প্রতি বন্দী অবস্থায় মৃত্যু, অসুস্থ বন্দীদের চিকিৎসা না পাবার অভিযোগ এবং তারেক রহমানের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেবার যে অভিযোগ উঠেছে তাতে পরাশক্তির পররাষ্ট্র দফতরগুলো বিচলিত। কারাবন্দী অবস্থায় কাফরুলের ওয়ার্ড কমিশনার ও থানা বিএনপি নেতা মো: কাইয়ুম খান মারা গিয়েছেন। হয়তো তিনি অসুস্থই ছিলেন, কিন্তু আদৌ চিকিৎসা পেয়েছেন কিনা সেটাই প্রশ্ন। একই প্রশ্ন উঠেছে সিগমা হুদা ও সাবেরা আমানের ক্ষেত্রেও। মনে রাখা দরকার বাংলাদেশ নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর আচরণ ও শাস্তি দেবার বিরুদ্ধে গৃহীত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আইন স্বাক্ষর করেছে (CONVENTION AGAINST TORTURE and Other Cruel Inhuman or Degrading Treatment or Punishment) | পরাশক্তির বিচলিত হবার নানা কারণের মধ্যে এটা একটা কারণ। সরকার বৈধ হোক কি অবৈধ হোক, প্রতিটি নির্যাতন, নিষ্ঠুর আচরণ ও নিষ্ঠুর শাস্তি দেবার অভিযোগ আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারযোগ্য। বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা’ জারি করে বাংলাদেশে না হয় এর বিরুদ্ধে বিচার বন্ধ করা যেতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আদালত তো বাংলাদেশের জরুরি অবস্থার অধীনে নয়। তাহলে এই ধরনের সরকারকে পরাশক্তিগুলো সমর্থন দিয়ে যাবার বিপদ আছে।

পরাশক্তিগুলো এটাই চাইছে যে অবিলম্বে নির্বাচন দিতে পারলে তারা এক ঢিলে দুটো পাখি মারতে পারবে। আওয়ামী লীগ যেহেতু এই সরকারকে নিজেরা ক্ষমতায় এলে বৈধতা দেবে বলে অঙ্গীকারবদ্ধ তাহলে আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থক দলগুলোকে সংসদে এনে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বৈধতা আদায় বর্তমান পরিস্থিতি থেকে প্রস্থানের একটা উপায় হিশাবে তারা ভাবছে। দুই নম্বর পাখি হচ্ছে যদি কারো ক্ষমতা নিয়ে নেবার খায়েশ থেকে থাকে বা আগামী দিনে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হবার ইচ্ছা থাকে তাহলে নির্বাচন হয়ে গেলে সেই সুপ্ত ইচ্ছাও প্রশমিত হতে পারে। দেখা যাক কী হয়।

জনগণের দিক থেকে কী কর্তব্য? প্রথম কাজ হচ্ছে মহাবিপদ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সকল দিক বিবেচনায় নেওয়া। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার যে কোনো চেষ্টাই পরাশক্তি, বহুজাতিক কোম্পানি, সুশীল সমাজ ও কিছু উচ্চাভিলাষী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বানচাল করে দিতে পারে, এই দিকে সতর্ক থাকার সময় এসেছে। গণতান্ত্রিক সরকার ও এই সরকারের অধীনে গঠিত তথাকথিত 'নির্বাচিত' সরকারের পার্থক্য আমাদের মনে রাখতে হবে। নির্বাচন অবশ্যই আমরা চাই, কিন্তু এই সরকারের অধীনে নির্বাচিত সরকার মানে অবৈধ সরকারকে বৈধতা দেবার সরকার কিনা এই প্রশ্নের মীমাংসা দরকার। সবচেয়ে আদর্শ পরিস্থিতি হত যদি কর্মী পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেশ রক্ষার জন্য সমঝোতা গড়ে উঠত। আওয়ামী লীগের অবস্থানের কারণে ওপরের নেতৃত্বের স্তরে দেশ ও দশের স্বার্থে ঐক্য গড়ে তোলা এখন কঠিন মনে হচ্ছে, কিন্তু সঙ্কট আরো ঘনীভূত হলে এবং শত্রু-মিত্র পরিষ্কার হয়ে উঠলে সেই বাধা থাকবে বলে আমার মনে হয় না। এই দিক থেকে আওয়ামী লীগ খালেদা জিয়ার মুক্তি ও ন্যায়বিচারের পক্ষে টু শব্দ উচ্চারণ না করলেও বিএনপি ক্রমাগত শেখ হাসিনার মুক্তির পক্ষে যে রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে তা সঠিক, গণতান্ত্রিক এবং গণমানুষের ইচ্ছারই প্রতিধ্বনি। জনগণকে একত্রিত ও ঐক্যবদ্ধ রাখাই এখনকার কাজ- দলীয় স্বার্থ উদ্ধার করা নয়। রাজনীতি এখন নীতির জায়গাতেই দানা বাঁধবে, দলবাজির জায়গায় নয়। কিন্তু বিএনপি যে ক্ষেত্রে এখনো চরম দূর্বলতার পরিচয় দিচ্ছে তা হলো দুর্নীতি সম্পর্কে তাদের অবস্থান। জনগণের কাছে করজোড়ে দাঁড়ানোর এটাই সময়। জনগণের আদালতে যারাই দাঁড়ানোর সং সাহস রাখে, জনগণ তাদের প্রতি ন্যায়বিচারই করবে, তাদের নিয়েই তারা পরাশক্তির সকল নকশা ভেঙে ফেলবে। সেই দিন খুব দূরে নয়। যারা নির্বাচিত হয়ে গিয়ে পরাশক্তির নকশাই বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিদাহে আমলা যাবার যতো দ্রুত উন্মোচিত হয় ততোই জনগণের মঙ্গল।

সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জনগণের গণতান্ত্রিক ঐক্যের জয় হোক, এটাই

আমাদের কামনা।

২৯ মাঘ, ১৪১৪/১১ ফেব্রুয়ারি, ২০০৮, আরশিনগর বিদ্যা ঘর, ঈশ্বরদী

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।