গান্ধী, ফিলিস্তিন ও ইসলাম



‘ফিলিস্তিন আরব জনগণের, ঠিক যে-অর্থে বিলাত ইংরেজদের, অথবা ফ্রান্স ফরাসিদের। আরবদের ওপর ইহুদি জনগোষ্ঠীকে চাপিয়ে দেয়া ভুল কাজ এবং অমানবিকও বটে। ... নিঃসন্দেহে এটা মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ হবে যদি আরবদের অপমানিত করে ফিলিস্তিনের খানিকটা বা পুরোটাই ইহুদিদের হাতে তাদের জাতীয় আবাস দাবি করে তুলে দেয়া হয়।’

এই মন্তব্য একজন মহাপুরুষের। তিনি বিতর্কের উর্ধ্বে নন, সত্যি। এই উপমহাদেশের হিন্দু ও মুসলমান দুটো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে হিংসা, দ্বেষ ও দাঙ্গা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তার আন্তরিক অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু তিনি হিন্দু জনগোষ্ঠীর কাছে যতোটা গ্রহণযোগ্য হতে পেরেছেন, মুসলমান সম্প্রদায়ের কাছে ততোটা নন। ফলে তাকে কেউ দেবতা বানিয়ে ফেলতে চাইলে মুশকিল হয়। কিন্তু নিঃসন্দেহে মানুষটি অসাধারণ ছিলেন। সবলের বিরুদ্ধে দুর্বল কী করে লড়বে তার যে তরিকা তিনি আমাদের দিয়ে গিয়েছেন তার উপযোগিতা এখনো ফুরিয়ে যায় নি। আমি তার উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করছি কারণ হলো পাশ্চাত্যের চোখে তিনি রীতিমতো অবতার। দেবতা। পরদেশ লুণ্ঠনে সদা তৎপর, হিংস্র এবং প্রকট মিথ্যুকের সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতি মৃত মানুষকে দেবতা বানাতে ওস্তাদ, কিন্তু তার কথা বা কর্ম তারা অনুসরণের যোগ্য মনে করে না। যখন এই লেখা লিখছি তখন ফিলিস্তিনি শিশু-কিশোরদের ওপর চলছে ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর আধুনিক মারণাস্ত্র, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, মারকেভা ট্যাংক, মিসাইল, হেলিকপ্টার গানশিপ আর আনুষঙ্গিক ভারী যুদ্ধবাহনের লেলিয়ে দেয়া হত্যাকাণ্ড। শিশু-কিশোররা ছুঁড়ছে ঢিল আর গুলতি। বিপরীতে সকল স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র গর্জে উঠছে ইজরায়েলি সৈন্যদের হাতে।

এই হত্যাকাণ্ড সারা পৃথিবীর মানুষ টেলিভিশনে দেখেছে। দেখছে। কাচের স্ক্রিনে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো বারবার শিশু-কিশোরদের ঢিল আর গুলতি মারা দেখালো কী কারণে? এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদের জন্য না। দেখিয়েছে এই কথা প্রমাণ করবার জন্য যে এরাই, এই দশ থেকে আঠারো-উনিশ বয়েসী শিশুরাই হচ্ছে সন্ত্রাসী। কেন? দেখুন কিভাবে 'সন্ত্রাসী' কথাটা ভাষার অস্ত্র হিশাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ তারা আরব। তাদের ঢিল আর গুলতিও নাকি ভয়াবহ মারণাস্ত্র। যদি তাই হয় তাহলে মারকেভা ট্যাংক, স্বয়ংক্রিয় আধুনিক মারণাস্ত্র আর হেলিকপ্টার গানশিপ দিয়ে ইহুদি সৈন্যরা পাখি শিকারের মতো যেভাবে নিরস্ত্র শিশু-কিশোরদের মেরেছে সেটা তাহলে কী? সেটা জায়নিস্ট ইহুদিদের আত্মরক্ষা। 

তবে সকলেই, বলা বাহুল্য, এই মিথ্যাচার মেনে নেয় নি। এমনকি ভাষার বর্ণনা এবং পরিভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক মানবাধিকার সংগঠনগুলো আপত্তি জানাচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে মৃত্যুর এই উৎসব দেখে বিচলিত হয়েছে। ‘খুন করবার ক্ষমতা সম্পন্ন শক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার’ (excessive use of lethal force) নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন এই খুনে-শক্তির ব্যবহার হয়েছে সেই সকল ক্ষেত্রে যেখানে ‘নিরাপত্তা রক্ষীদের ওপর কোনো বিপদের আশঙ্কা ছিল না, ফলে এই হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্ন জড়িত নেই। এগুলো অবৈধ হত্যাকাণ্ড’ (unlawful killings)।

তার মানে ইহুদি সৈন্যরা সারাবিশ্বের মানুষের চোখের সামনেই আরব শিশু-কিশোরদের হত্যা করছে। কোথাও কোনো কার্যকর প্রতিবাদ নাই। এই কাজটা তারা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে। সাম্রাজ্যবাদ মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে প্রধানত আরবদের তেলের ওপর দখলদারি কায়েম রাখবার দরকারে। সেই ইহুদিবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শিশু-কিশোরদের গুলতি লড়াই তাহলে আসলে সাম্রাজ্যবাদেরই বিরুদ্ধে। ইহুদিবাদ বা Zionism যার একটা প্রকাশ মাত্র।

মার্কিনি সাম্রাজ্যবাদের পা-চাটা মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের কথা আলাদা, কিন্তু আরব জনগণ কখনোই তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া ইহুদিবাদী (Zionist) রাষ্ট্র ইজরায়েলকে মেনে নেয়নি। সংঘর্ষ, যুদ্ধ চলছে। প্রাণ ক্ষয় রক্ত ক্ষয় হয়েছে প্রচুর। আরব জনগণের সশস্ত্র সংগ্রামের বিরুদ্ধে আরো হাজার গুণ বেশি শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ইহুদি রাষ্ট্র ইজরায়েল হামলার পর হামলা চালিয়েছে আরব জনগণের বিরুদ্ধে। অথচ ইজরায়েল সদর্পে নিজেদের ‘ইহুদিবাদী’ (Zionist) বলে দাবি করেও সভ্য ও তথাকথিত ‘অসাম্প্রদায়িক’ এবং ‘ধর্ম নিরপেক্ষ’ বিশ্বব্যবস্থায় গ্রহণযোগ্য হতে পেরেছে। অন্যদিকে, আরবদের কপালে জুটেছে ‘ইসলামী মৌলবাদ’ নামক কলঙ্ক। সন্ত্রাস আর বর্বরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে আরব জনগণ। আজ সারা বিশ্বে ‘ইসলামী মৌলবাদী’দের সমূলে উৎখাতের জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের ইহুদিবাদ সকল গণমাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক, সভ্য ও প্রগতিশীল চেহারা নিয়ে নিজেকে জাহির করে বেড়াচ্ছে আর পুরো আরব জাহান বর্বর, অসভ্য, সন্ত্রাসী বলে ক্রমাগত নিন্দিত হচ্ছে। পুরো প্রচার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে জন্মগতভাবে কোনো মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করাই যেন এখন অপরাধ হয়ে উঠেছে। চোখের সামনে সকলে দেখছে শিশু-কিশোররা ছুঁড়ছে ঢিল আর গুলতি, প্রত্যুত্তরে ইজরায়েলি সৈন্য তাদের বুকের সিনা বা মাথার খুলি লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ছে। তবু এই শিশু-কিশোররাই নাকি ‘সন্ত্রাসী’। কেন? প্রথমত তারা গরিব তৃতীয় বিশ্বের সন্তান, তারা সাম্রাজ্যবাদী সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইজরায়েলকে মেনে নেয় নি। দ্বিতীয়ত, তারা জন্মসূত্রে ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ইসলাম মাত্রই সন্ত্রাসী ধর্ম, বর্বর আর অসভ্যদের বিধান। তাদের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) তরবারির জোরেই এই ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছে। এই প্রচার পাশ্চাত্য দৃঢ ভাবে গেঁড়ে বসে আছে। অতএব আরব শিশু-কিশোররাও সন্ত্রাসী না হয়ে আর কী হবে?

অথচ আরব জনগণ মাত্রই ইসলাম ধর্মাবলম্বী নয়। কিন্তু পাশ্চাত্য ইসলামকে একটি দানবীয় শক্তি হিসেবে হাজির করে এবং আরবদের বর্বর, বেদুঈন ও উটের দঙ্গল হিসেবে ক্রমাগত প্রমাণ করার প্রয়াস চালায়। এই প্রয়াস ও প্রমাণের পেছনের কারণ হচ্ছে তেল। তেলের ওপর দখলদারি পশ্চিমা শক্তির পক্ষে ত্যাগ অসম্ভব। দুর্ভাগ্য আরবদের। আল্লাহ তাদের মধ্যে নবী-রাসূল যেমন উদারভাবে পাঠিয়েছেন, তেমনি তেলও দিয়েছেন। এখন সাম্রাজ্যবাদ এই তেলের ওপর দখলদারি কায়েমের জন্য সামরিকভাবে সবসময় যেমন প্রস্তুত, তেমনি তাদের গণমাধ্যমও সমান সক্রিয়। কারন প্রমাণ করতে হবে ইসলাম একটি দানবীয় ধর্ম এবং আরব মাত্রই সন্ত্রাসী তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে আরব্দের উৎখাত করে, এমনকি প্রয়োজনে গণহত্যা চালাতে কসুর না করে তেলের ওপর দখলদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাও সহজ হয়। যারা বর্বর ও সন্ত্রাসী তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো, তাদের দেশ দখল করে নেয়া, তাদের ভূখণ্ডে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মদদে ইহুদিবাদী রাষ্ট্র কায়েমসহ সকল জুলুম ও বেইনসাফী ন্যায্য প্রমাণ করা সহজ হয়। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বিরুদ্ধে এটাই পাশ্চাত্যের সাধারণ যুদ্ধনীতি। ফিলিস্তিনের ইহুদি প্রশ্ন এবং ইহুদিবাদের রাজনীতিকে এই দিক থেকে যেমন বিচার করা দরকার তেমনি একই সঙ্গে ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক ও রাজনৈতিক প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য হামলা এবং পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রচার প্রপাগান্ডাকে বিচার করা জরুরি।

তাহলে দেখা যাচ্ছে শিশু-কিশোরদের হত্যা জেনেশুনেও, এমনকি গণমাধ্যমে চোখে দেখেও নীরব থাকা, গুরুত্ব না দেয়া কিংবা প্রতিবাদ না করার পেছনে পাশ্চাত্যে ইসলাম সম্পর্কে যে-বদ্ধমূল ধারণা তৈরি এবং প্রতিষ্ঠা তার সরাসরি ভূমিকা রয়েছে। একটা ইসলামবিরোধী সাম্প্রদায়িক চেতনা কাজ করছে প্রকটভাবেই। বিশেষত যারা নিজেদের ‘আধুনিক’, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’, ‘অসাম্প্রদায়িক’ এমনকি ‘প্রগতিশীল’ বলে গণ্য করেন তাদের মধ্যে এই সাম্প্রদায়িকতা প্রবল। তাঁরা ভুলে যান আধুনিকতা মাত্রই সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতি, ইউরোপীয় রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা ও পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডেরই অভিপ্রকাশ। এই সত্য মনে রাখলে আধুনিকতার সাম্প্রদায়িক ভিত্তিটা আমরা ধরতে পারবো। এটাও বুঝবো যে, ‘আধুনিক’ হওয়া মানেই কেন আন্তর্জাতিক এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় আদতে নির্বিচার ইসলামবিরোধী হওয়া। না, আধুনিক হওয়া মানেই ধর্মনিরপেক্ষতা চর্চা কিংবা অসাম্প্রদায়িক নয়, মোটেও না। ইসলাম বিদ্বেষী ইউরোপীয় আধুনিকতাকে যেমন তার খ্রিস্টিয় ভিত্তি থেকে আলাদা করা যায় না, তেমনি ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে পোড়াবার  পর ইহুদিদের জন্য শোক (Holocaust) এবং মতাদর্শ হিশাবে ইহুদিবাদকে কিভাবে সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে সেটা ধরতে না পারলে আমরা সাম্রাজ্যবাদের ভয়াবহতা বুঝব না। সেটা বাস্তব ইতিহাস। আধুনিক হওয়া মানে আধুনিকতার খ্রিস্টীয় সাংস্কৃতিক ও মনোগাঠনিক ভিত্তিকেও যেমন স্বীকার করে নেয়া, একই সঙ্গে আধুনিকতার আউটপোস্ট ইহুদিবাদ এবং ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইজরায়েলের অস্তিত্ব, ভূরাজনৈতিক ভূমিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদের সমর নীতিকেও মেনে নেওয়া। 

অন্যদিকে আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতির দিক থেকে যদি বিচার করি আমরা দেখবো ‘আধুনিকতা’ মানে ঊনবিংশ শতাব্দীর সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিনাবিচারে গ্রহণ করা, অথচ ঔপনিবেশিকতার ঔরসে যার জন্ম ও বিকাশ। ঔপনিবেশিকতার সঙ্গে সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যে বঙ্গীয় আধুনিকতার জন্ম আর গড়ন তার চরিত্র হিন্দুত্ববাদী ও সাম্প্রদায়িক। এই সাম্প্রদায়িকতাকে 'বাঙালি সংস্কৃতি' হিশেবে বিনাবিচারে মানতে আমাদের বাধে না। বঙ্গীয় হিন্দুত্ববাদের শেকড় কলকাতাকেন্দ্রিক কিন্তু আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সর্বত্র সমানভাবে পরিব্যাপ্ত। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে সাধারণ মানুষের মুখের কাছাকাছি আনবার যে তত্ত্ব দিয়েছিলেন এবং নিজেও প্রাণপণ চর্চা করেছিলেন সেই তত্ত্ব ও চর্চা আধুনিক বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির হিন্দুত্ববাদী পরিমণ্ডল অতিক্রম করবার একটা পথ হতে পারতো। রবীন্দ্রনাথ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলান। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ঔপনিবেশিক ভিত্তি ও সাম্প্রদায়িক চরিত্রটা তিনি ধরে ফেলতে পেরেছিলেন, কিন্তু একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মধ্যে তার জন্ম হওয়ার কারণে এবং ইসলাম সম্পর্কে সাধারণভাবে তো বটেই এমনকি ভারতবর্ষে ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে তার অজ্ঞতার কারণে তিনি এটাও উপলব্ধি করেছিলেন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে সকল সম্প্রদায়ের ভাষা ও সংস্কৃতি হিশেবে গড়ে তোলার কাজটা তার দ্বারা সম্ভব নয়। ইসলাম ধর্মাবলম্বিরা তাদের নিজেদের জীবন যাপনের ভাষা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে যতো বেশী বাংলা সাহিত্যর অংশগ্রহণ করবে ততোই বাংলা সকলের বাংলা হয়ে উঠবে। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি আর উচ্চ বর্ণের হিন্দুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি হয়ে থাকবেনা। শুধু উচ্চ বর্ণের হিন্দু কবি-সাহিত্যিক, গায়েন বা তুলিকারের আধিপত্যে তৈরির হওয়া ‘বাঙালি’ সংস্কৃতিকে সকলের সংস্কৃতি বলা ভুল। কিন্তু এটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা। হিন্দুর সংস্কৃতি বলে তাকে বর্জন করার পাল্টা মুসলমানী সাম্প্রদায়িকতাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাংলাভাষী সকল সম্প্রদায়ের নিজস্ব করে তোলার কাজ বহুলাংশেই বাকি। শুধু হিন্দুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সকল বাংলাভাষীর সাহিত্য ও সংস্কৃতি হতে পারে না এই কাণ্ডজ্ঞানটুকু রবীন্দ্রনাথের ছিলো। আবুল ফজলকে লেখা তার বিখ্যাত চিঠির মধ্যে সেটা খুবই স্পষ্ট।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পরে ‘ত্রিশের আধুনিকতা’ নামে যে জিনিসটার রমরমা হলো সেটা ছিলো সম্পূর্ণই রবীন্দ্রনাথের উল্টা। ভাষা ও সাহিত্যের প্রকট ‘সংস্কৃতায়ন’ চললো। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো কবি ও প্রাবন্ধিক হয়ে উঠলেন ত্রিশের আধুনিকতার পুরোধা, যার লেখা পড়ে বোঝা মুশকিল ইনি বাংলা লিখছেন নাকি সংস্কৃত সাহিত্য চর্চা করছেন। সাহিত্য চর্চার একটি ধারা হিসেবে তার এই নিরীক্ষামূলক প্রয়াসে আপত্তি নেই, ঠিকই আছে। কিন্তু ত্রিশের আধুনিকতার তিনি যখন প্রধান নির্ধারক ও নির্ণায়ক হয়ে ওঠেন তখনই সমস্যা বাধে। তার প্রাধান্যের মধ্য দিয়ে বঙ্গীয় ‘আধুনিকতার’ চরিত্র আর অভিমুখটা আমাদের চোখে খোলাসা হয়। বুদ্ধদেব বসু তাকে আরো পুষ্ট করেন। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা আর সাহিত্যকে যে দোষ থেকে মুক্ত করবার আশা করেছিলেন ত্রিশের কারণে সেই আশা-দুরাশায় পরিণত হলো। সাম্প্রদায়িকতা আর হিন্দুত্ব শুধু সাহিত্যের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ রইলো না— ভাষা, উপমা, বাক্যবিন্যাস বা গঠনাগঠনে খোদিত হয়ে গেলো। ত্রিশের আধুনিকতার সমস্যা হলো সাহিত্য ও সংস্কৃতির ‘সংস্কৃতায়ন’ এবং হিন্দুকরণ প্রক্রিয়াকে আরো বদ্ধমূল করা। জীবনানন্দ খানিকটা ব্যতিক্রম, এর কারণ তিনি কলকাতার বাসিন্দা হয়েছেন অনেক পরে। তাছাড়া তরুণ বয়সে নজরুলের কবিতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু তবুও ত্রিশের কাব্যাদর্শের বাইরের মানুষ নন তিনি। বরিশালের মানুষ বলে পূর্ববঙ্গীয় উপাদান তার অজান্তেই তার কবিতায় জায়গা করে নিয়েছে।

‘আধুনিক’ সাহিত্য ও সংস্কৃতির নামে সাম্প্রদায়িকতার পক্ষেই শক্তিশালী ধারা তত্ত্বে ও চর্চায় গড়ে উঠলো, যদিও বাইরে থেকে দেখে মনে হয় ত্রিশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইউরোপীয় আধুনিকতাকেই নকল করছে। শেষমেশ কলকাতার সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল সাহিত্যই হয়ে উঠলো বাংলা সাম্প্রদায়িক সাহিত্য ও সংস্কৃতি এবং অন্যদিকে বাংলাদেশে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের বিকাশ বাংলাদেশে এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চরম ইসলামবিরোধী চেতনা, মনমানসিকতা ও ধ্যান-ধারণাকে বদ্ধমূল করে তুললো। যার কুফল আমরা রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির সকল ক্ষেত্রে ভোগ করছি। প্রকাশ্য তত্ত্ব আকারে যতোটা না তার চেয়ে হাজার গুণ হলো ‘আধুনিক’ বাংলা সাহিত্য চর্চার ধারা হিশেবে এই সাম্প্রদায়িকতা নিজেকে প্রকাশ করলো। পূর্ববঙ্গের মানুষের মুখের ভাষা, বাক্যগঠন, প্রতীক বা উপমা নির্মাণ এক অর্থে না-জায়েজ হয়ে উঠলো। পূর্ববঙ্গের মানুষের অতিপরিচিত আরবি, ফারসি বা উর্দুর ব্যবহার তো রীতিমতো নিষিদ্ধ হয়ে গেলো। অলিখিতভাবে তো বটেই, এমনকি লিখিতভাবেও তার বিরুদ্ধে আপত্তি উঠলো। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাসাহিত্য ও সংস্কৃতির এই সাম্প্রদায়িক ধারাটাই বদ্ধমূল হলো। এতোটাই যে সরাসরি তো দূরে থাকুক, আকারে ইঙ্গিতে যদি ইসলামের সঙ্গে কারো কোনো যোগসূত্র দেখা যায় তবে তাকে ‘পাকিস্তানপন্থী’ বলে গালি দিয়ে একটা সন্ত্রাসী পরিস্থিতি তৈরির চর্চাও চললো প্রকটভাবে। ‘আধুনিক’ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি হয়ে উঠলো একধরণের সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের মতো, যার হিংস্র আধিপত্য থেকে আমরা আজও মুক্ত হতে পারি নি।

অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বাংলার সংস্কৃতি ও সাহিত্য থেকে ইসলামের নামচিহ্ন মুছে ফেলার চর্চাও চললো, কিন্তু ‘হিন্দুত্ব’-টা বহাল তবিয়তে রইলো। ‘হিন্দুত্ব’ কথাটি উদ্ধৃতি দিয়ে ব্যবহার করছি কারণ হিন্দু আর হিন্দুত্ববাদ এক কথা নয়। রামায়ণ, মহাভারত, বেদ, উপনিষদ, সাংখ্য, বৈশেষিক— অর্থাৎ ঐতিহাসিক সূত্রে সবকিছুর ওপর হিন্দু-মুসলমান প্রতিটি মানুষের যেমন হক আছে, তেমনি উপমহাদেশে ইসলামের সকল অবদানের ওপরও হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ খ্রিস্টান আস্তিক-নাস্তিক সকলেরই অধিকার আছে। সমস্যাটা শুরু হয় যখন কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের প্রতি আমরা হীনভাবে তাকাই বা আমাদের সাম্প্রদায়িক পরিচিতিটাকেই কিম্বা ধর্মীয় জাতিবাদকেই আমরা আমাদের প্রধান বা একমাত্র পরিচয় বলে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য যখন উঠে পড়ে লাগি তখনই আমরা পথভ্রষ্ট হতে শুরু করি। অথচ দরকার এই উপমহাদেশের ইতিহাস এবং বিশেষভাবে বাংলাদেশ ও তার শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাসের মধ্যেই আমাদের নতুন ভাষা ও সাহিত্য তৈরি এবং নতুন ভাবে ভাবতে ও পর্যালোচনা করার সামর্থ অর্জন করা। শিখতে ও শেখাতে  হবে। কিন্তু সেটা করতে হবে হিন্দুত্ববাদী, ইসলামবাদী, খ্রিস্টীয় বা যে কোনো সাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে মোকাবেলা করবার মধ্য দিয়ে, সাম্প্রদায়িকতার মুখোশ উন্মোচন করে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক কর্তব্যকে কর্তব্যকে আমরা কতর্ব্য বলে গণ্য করি না। বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি জ্ঞানচর্চার মধ্যে যা কিছুই ইসলামী দেখি তার বিরুদ্ধেই আমরা ত্রিশূল হাতে মারমুখো দাঁড়াই। এটাই নাকি অসাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মনিরপেক্ষতা।

ইসলামের প্রতি আমাদের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা ও সংকটগুলো বুঝতে না পারলে আমরা বুঝবো না কীভাবে সাম্রাজ্যবাদ শুধু ফিলিস্তিন শিশুদেরই আমাদের চোখের সামনে হত্যা করছে না। অর্থনৈতিক অবরোধের নামে ইরাকি শিশুদের তিলে তিলে তারা হত্যা করে চলেছে। অবিশ্বাস্য মনে হয় যখন খবর আসে যে সপ্তাহে কমপক্ষে এক হাজার ইরাকি শিশু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে মারা যায়। অথচ আমাদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে, ইরাকের জনগণ বা ফিলিস্তিনের জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর অর্থ বুঝি ইসলামের পক্ষে দাঁড়ানো। আর ইসলামের পক্ষে দাঁড়ানোর মানেই হলো সাম্প্রদায়িক হওয়া। যেন ইরাকি জনগণ ও শিশুদের পক্ষে দাঁড়ানো কিম্বা ইরাকের বিরুদ্ধে অমানবিক মার্কিন অবরোধের বিরোধিতা করার মানে সাম্প্রদায়িক হওয়া। একই কারণে ফিলিস্তিনি জনগণ বিশেষত ফিলিস্তিনি শিশু-কিশোরদের হত্যাযজ্ঞ চোখে দেখেও তার প্রতিবাদ করবার বোধশোধগুলো ইসলামের প্রতি সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। অথচ চরম হিন্দুত্ববাদী কলকাতা কিম্বা ইউরোপীয় আধুনিকতার অনুকরণ করে সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদের কাছে বুদ্ধি বন্ধক দেয়া বা মানসিক গোলামিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদিবাদীদের প্রতাপ এবং ইহুদি রাষ্ট্র ইজরায়েলের আধিপত্য কী পরিমাণ প্রবল তার প্রমাণ আমরা শুধু জর্জ বুশ বা আল গোরের নির্বাচনী প্রচারণা দেখে বুঝতে পারবো না। যখন ফিলিস্তিনে দ্বিতীয় ইন্তিফাদায় শিশু-কিশোররা মরছে বুশ-গোর উভয়েই ইহুদিবাদের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলেন। সেখানে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছুই নেই। কিন্তু র‌্যালফ নাদেরের মতো মানুষও এই প্রশ্নে নীরব থেকে ইহুদিবাদের পক্ষেই দাঁড়িয়েছিলেন। পরিবেশবাদী আন্দোলন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যারা নিজেদের অন্তত কিছুটা হলেও গণতান্ত্রিক বলে মনে করেন তাদের প্রতিনিধি ছিলেন র‌্যালফ নাদের। নির্বাচনের আগে র‌্যালফ নাদের ওয়াশিংটনে এক বিশাল র‌্যালি করেন। সেখানে রিপাবলিকান আর ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে বিষোদগার উৎক্ষিপ্ত হয়। ‘কর্পোরেট আমেরিকা’-র মন্দ নীতির কড়া সমালোচনা করা হয়। কিন্তু ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইজরায়েলের সঙ্গে যোগসাজশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে শিশু-কিশোরদের হত্যা করছে তার বিরুদ্ধে এক অক্ষর প্রতিবাদ কেউই করলেন না। এমনকি র‌্যালফ নাদেরও নন।

এই পরিপ্রেক্ষিতগুলো মনে রেখেই আরব ও ইহুদিদের সম্পর্ক ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গান্ধীর বক্তব্য মনে করিয়ে দেয়ার জন্য এই লেখা লিখছি। মজা হলো ওয়াশিংটনের সেই র‌্যালিতে ইনসাফ, ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ এবং রাজনৈতিক পথ ও পন্থা হিশেবে গান্ধীর ‘অহিংসা’ সম্পর্কে বিস্তর বাক বিস্তার করা হলো। কিন্তু ইহুদি, আরব এবং ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে গান্ধীর বক্তব্য একবারও কেউ মনে করা দরকার মনে করলেন না।

গান্ধী ১৯৩৮ সালে ফিলিস্তিন ও ইহুদিদের সম্পর্কে তার কথা পরিষ্কারভাবে বলতে গিয়ে নিজের অস্বস্তিটা লুকান নি। বলেছেন, ফিলিস্তিনে আরব আর ইহুদিদের সম্পর্ক আর জার্মানিতে ইহুদিদের অবস্থা সম্পর্কে তাকে অনেকবারই বলতে বলা হয়েছে, খানিকটা “অস্বস্তি” নিয়েই এই কঠিন প্রশ্ন সম্পর্কে তিনি তার মতামত পেশ করছেন। অস্বস্তি কেন?

“আমার সহানুভূতি পুরোটাই ইহুদিদের জন্য, আমি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেই তাদের অন্তরঙ্গভাবে চিনি। অনেকে আমার সারা জীবনের সাথী হয়ে গিয়েছেন। এই বন্ধুদের কাছ থেকে আমি তাদের বহু দীর্ঘ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস জানতে পেরেছি। তারা হচ্ছে খ্রিস্টানদের অচ্ছুত। খ্রিস্ট ধর্ম তাদের প্রতি যে আচরণ করেছে আর হিন্দুরা নমশূদ্রদের প্রতি যে আচরণ করে তার মধ্যে মিল খুবই ঘনিষ্ঠ।... অতএব বন্ধুত্বের প্রশ্ন ছাড়াও তাহলে ইহুদিদের প্রতি আমার সমবেদনার সার্বজনীন কারণ রয়েছে।”

“কিন্তু সমবেদনা আমাকে ইনসাফ সম্পর্কে অন্ধ করে ফেলেনি। আমার কাছে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় রাষ্ট্রের হাঁকডাকের তেমন কোনো আবেদন নেই। এর পক্ষে যুক্তি হাজির করা হয় বাইবেল থেকে আর ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তনের জন্য ইহুদিদের আকুলতার তীব্রতার বরাতে। কেন তারা পৃথিবীর আর সকলের মতো যে দেশে তারা জন্মগ্রহণ করে আর জীবনযাপন করে সেই দেশকেই তাদের মাতৃভূমি গণ্য করতে পারে না?”

‘ফিলিস্তিন আরব জনগণের, ঠিক যে-অর্থে বিলাত ইংরেজদের, অথবা ফ্রান্স ফরাসিদের। আরবদের ওপর ইহুদি জনগোষ্ঠীকে চাপিয়ে দেয়া ভুল কাজ এবং অমানবিকও বটে। ফিলিস্তিনে এখন যা চলছে তাকে কোনো প্রকার নৈতিক বিধিবিধানের মানদণ্ডে ন্যায্য বলা যায় না। যে ম্যান্ডেটের প্রয়োগ চলছে গত যুদ্ধের ফল ছাড়া তার কোনো বৈধতা নেই। নিঃসন্দেহে এটা মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ হবে যদি আরবদের অপমানিত করে ফিলিস্তিনের খানিকটা বা পুরোটাই ইহুদিদের হাতে তাদের জাতীয় আবাস দাবি করে তুলে দেয়া হয়।”

১৪ ডিসেম্বর ২০০০


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।