নির্বাচন, গণতন্ত্র ও আততায়ী রাজনীতি


১. আগুন নেভেনি, গণমানুষের হৃদয়ের পাশে দাঁড়ান
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে আগুন গণমানসে রোপিত হয়েছে তা মোটেও নিভে যায়নি। শহিদ শরিফ ওসমান হাদির জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রমাণ মিলল আগুন জ্বলছে এবং তা অগ্ন্যুৎপাত ঘটাতে সক্ষম। বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা বাতিল করে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের অভিপ্রায় এখনও জ্বলন্ত। মানুষ ইনসাফ চায়, কিন্তু হাসিনাহীন হাসিনাব্যবস্থা ইনসাফ দূরে থাকুক এখনও খুনিকে ধরতে ও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারেনি। এই অক্ষমতা পুরানা পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিচারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার ফল। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিচার বিভাগকে নতুনভাবে গঠন করা ছাড়া হাদি হত্যার বিচার অসম্ভব। অর্থাৎ পুরানা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উৎখাত করে নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করা ছাড়া অপরাধীর শাস্তি বা ইনসাফ নিশ্চিত করবার কোনো পথ নাই। 

কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতি পরিহার করে নির্বাচনই গণতন্ত্র এই তত্ত্ব ফেরি করা গণশত্রুর অভাব নাই। এটাই বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান বিকার। এই বিকারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গণতন্ত্র আর নির্বাচনকে সমার্থক গণ্য করা। এই বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক বিকার থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পথ অস্বীকার করে নির্বাচনী ডামাডোলে নিজেদের বিসর্জন দিয়ে তরুণরা তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতকেও বিপদে ফেলে দিয়েছে। ইতোমধ্যেই নির্বাচন তাদেরকে ভোট ব্যবসায়ী ও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে শেখ হাসিনার সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থা বহাল রাখার প্রতিবিপ্লবী সিদ্ধান্ত এবং পরে লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণীর সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় নামা ছিল ভুল রাজনীতি। যেখানে জনগণ নিঃশর্তে তরুণ নেতাদের ডাকে এবং নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান করেছে সেই জনগণ চেয়েছে তরুণদের নেতৃত্বেই নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠিত হোক। কিন্তু গঠনের রাজনীতি পরিহার করে তরুণেরা শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা রক্ষার শপথ নিয়েছে;  শুধু উপদেষ্টা সরকার কায়েম করে ক্ষান্ত হয়নি,  নির্বাচনী রাজনীতির ডামাডোলে প্রবেশ করে তারা লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণীর সহিংস ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় নেমেছে; ফলে গণঅভ্যুত্থানের নেতা হিশাবে  জনগণের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা যেমন হারিয়েছে, তেমনি নিজেদের ওপর বিপদ ডেকে এনেছে। যথাযথই আততায়ী রাজনীতি তার মহড়া শুরু করেছে। শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেছেন। তিনি জীবন দিয়ে আমাদের আবার ভাবতে বাধ্য করছেন যে নির্বাচন কোনো সমাধান নয়, আমাদের দরকার এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে আততায়ী ধরা পড়ে, বিচার হয় এবং ভারতে পালিয়ে যেতে না পারে। আফসোস, ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রচার  হত্যাকারীর সহযোগীদের প্রোপাগান্ডা কিনা—যেন তাদের আমরা বাংলাদেশে আর গ্রেফতারের চেষ্টা না করি—সেটা বোঝার মতো রাজনৈতিক বিচক্ষণতাও আমরা অর্জন করতে পারিনি।

নিজেদের প্রশ্ন করুন : আমরা শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ও আইন-আদালত ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা বহাল রেখে কি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার পাব? না–পাব না। অথচ এই ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞানটুকুও কি আমরা অর্জন করতে পারছি না যে নতুন করে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান গঠন করা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নাই। আমাদের বুঝতে হবে নির্বাচন ঔপনিবেশিক আইন-আদালতসহ পুরানা ফ্যাসিস্টব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার রাজনীতি। গঠনের কর্তব্য বাদ দিয়ে নির্বাচনী রাজনীতি গণমানুষের মুক্তি আনতে পারে না। সেটা গণমানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। 

২. মুশকিলের গোড়া ধারণাগত বিভ্রান্তির মধ্যেও নিহিত 

বাংলাদেশে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি অপরিচ্ছন্ন। গণতন্ত্র সম্পর্কে ধারণাগত অস্পষ্টতার ফলে রাজনীতিতে ক্রমাগত ভয়ংকর রকমের বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে চলেছে। এই বিভ্রান্তির ভয়াবহ রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। গণতন্ত্র সম্পর্কে অস্পষ্টতা গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের মধ্যেও বিকার তৈরি করেছে। গণঅভ্যুত্থানে নতুন রাষ্ট্র গঠনের ক্ষমতা বা গাঠনিক ক্ষমতা পেয়েও তরুণেরা শেখ হাসিনার সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে হাসিনাহীন হাসিনাব্যবস্থা জারি রেখেছে, ফলে  আততায়ী রাজনীতির পথ প্রশস্ত হয়েছে। শুধু তাই নয়, এর ফলে জনগণ তাদের নেতৃত্বে আস্থা হারিয়েছে। তাই দরকার ভুল স্বীকার এবং সঠিক নীতি ও কৌশল নির্ণয়ের জন্য গণঅভ্যুত্থানের সকল পক্ষকে নিয়ে আন্তরিকভাবে পর্যালোচনা করা। 


তাহলে গণতন্ত্র নিয়ে বিভ্রান্তির কারণ কী? প্রধান কারণ নির্বাচনকেই গণতন্ত্র ভাবা; নির্বাচনই গণতন্ত্র এই চিন্তা প্রকট তাত্ত্বিক বিকার এবং গুরুতর রাজনৈতিক বিভ্রান্তি। কারণ নির্বাচন জনগণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি প্রক্রিয়া মাত্র। অর্থাৎ গণতন্ত্র কায়েম থাকলে নির্বাচন আগেই গঠিত গণতন্ত্রের চর্চা হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র যদি গণতান্ত্রিক না হয় তাহলে আগে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করা প্রধান ও একমাত্র কর্তব্য হয়ে ওঠে।

কিন্তু বাংলাদেশের এক শ্রেণীর চরম মূর্খ ও গণবিরোধী শক্তি ক্রমাগত প্রচার করে চলেছে নির্বাচন ছাড়া নাকি আমাদের আর কোনো বিকল্প নাই। নির্বাচনই নাকি তথাকথিত ‘স্থিতিশীলতা’ আনবে। একথা তারা হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময়ও বলেছিল, জনগণ যদি তাদের বিকারগ্রস্ত দাবি শুনত তাহলে আজও শেখ হাসিনাই ক্ষমতায় থাকত। হাসিনাকে জনগণ যখন ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে দিল্লি পাঠিয়ে  দিল, তারপরও গণবিরোধী নির্বাচনবাদীদের হুঁশ হয়নি। হবে না। 

মুশকিল কোথায়? মুশকিল শুধু ব্যবহারিক রাজনীতিতে নয়, মুশকিলের গোড়া ধারণাগত বিভ্রান্তির মধ্যেও প্রকট। ‘গণতন্ত্র’ নামক একটি শব্দ দিয়ে একসঙ্গে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বোঝানো হয়— এক. গণতন্ত্র মানে নির্বাচন, দুই. গণতন্ত্র একটি নৈতিক-আদর্শিক প্রকল্প এবং তিন. গণতন্ত্র রাষ্ট্রের একটি ধরণ, ইত্যাদি। এই ধারণাগুলোর পার্থক্য এবং পারস্পরিক সম্বন্ধ সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অস্পষ্টতা রাজনৈতিক বিভ্রান্তির শর্ত তৈরি করে। এই বিভ্রান্তি গণতন্ত্র কায়েমের পরিবর্তে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠে।
 

গণতন্ত্র মূলত একটি নৈতিক–রাজনৈতিক মতাদর্শ। এটি নিজে কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়, আবার সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গেও এর অবধারিত সম্পর্ক নাই। আজ আমরা যেভাবে গণতন্ত্রকে প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্র, সরকার ও নির্বাচনের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছি, তা আসলে একটি ঐতিহাসিক বিভ্রান্তির ফল। গণতন্ত্রের নৈতিক–রাজনৈতিক ধারণাটি গড়ে উঠেছে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এবং একটি নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণীর অভিজ্ঞতা ও স্বার্থের ভেতর দিয়ে।

ইউরোপে প্রাচীন সামন্ততন্ত্র ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়াশ্রেণীর উত্থান ঘটে। সামন্ততান্ত্রিক সমাজে মানুষ ছিল জন্ম, ধর্ম, ভূমি ও প্রভুর সঙ্গে প্রাকৃতিক ও বাধ্যতামূলক বন্ধনে আবদ্ধ। পুঁজিবাদী বিকাশ সেই বন্ধনগুলো ভেঙে দেয়। মানুষ প্রথমবারের মতো নিজেকে ‘ব্যক্তি’ হিসেবে কল্পনা করার সুযোগ পায়—যে ব্যক্তি নিজের শ্রম বিক্রি করতে পারে, নিজের স্বার্থ বুঝতে পারে এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। এই সামাজিক বাস্তবতা থেকেই একটি নতুন নৈতিক-রাজনৈতিক ধারণার জন্ম হয়, যেখানে ব্যক্তিকে সমাজের মৌলিক একক হিসেবে দেখা হয়।

এই ধারণার ভিত্তিতে ব্যক্তির স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত মর্যাদা, মত প্রকাশের অধিকার, ভিন্নমত সহ্য করার ক্ষমতা এবং আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার সম্ভাবনাকে রাজনৈতিক মূল্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শাসক নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারও বৈধতা পায়। এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়েই ইউরোপে উদার পার্লামেন্টারি রাষ্ট্রের বিকাশ ঘটে। জন লক বা জন স্টুয়ার্ট মিলের চিন্তায় মানুষকে এমন এক স্বাধীন সত্তা হিশাবে কল্পনা করা হয়েছে, যারা যুক্তিবাদী, নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সংঘাতকে সহিংসতা ছাড়াই সামাল দিতে সক্ষম।

কিন্তু এই ধারণাটি কখনোই ‘স্বাভাবিক’ বা সার্বজনীন ছিল না। এখানে একটি গভীর অনুমান কাজ করে—মানুষ মূলত সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন স্বাধীন সত্তা এবং সমাজের সামষ্টিক কল্যাণ কী হবে, সে সিদ্ধান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থবোধ থেকেই স্বাধীনভাবে নিতে পারে। এই ধারণার মধ্য দিয়েই একটি নির্দিষ্ট নৈতিক-আদর্শিক প্রকল্প প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই প্রকল্পে সমাজের সামষ্টিক কল্যাণ বা সামষ্টির স্বার্থ মুখ্য নয়; বরং ব্যক্তিস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্য কথায়, সমাজকে দেখা হয় ব্যক্তিদের যোগফল হিসেবে, আর রাষ্ট্রের কাজ হয়ে দাঁড়ায় সেই ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার আইনি কাঠামো তৈরি করা।

এখানেই বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মূল নৈতিক ভিত্তি স্পষ্ট হয়। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভালোমন্দ আমরা বিচার করতে পারি। এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় সমষ্টির স্বার্থ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে নয়; বরং ব্যক্তিস্বার্থের সমন্বয়ই নাকি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামষ্টিক মঙ্গল সৃষ্টি করবে—এমন একটি বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত করা হয়। অথচ এটি কোনো চিরায়ত বা শাশ্বত সত্য নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের, নির্দিষ্ট সামাজিক শক্তির এবং নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা নৈতিক-রাজনৈতিক প্রকল্প। তাই একে দেশকালপাত্র নির্বিশেষে সার্বজনীন ভাবা বা সকলের জন্য গ্রহণযোগ্য গণ্য করা যেমন ভুল, তেমনি রাষ্ট্র ও নির্বাচনের সঙ্গে একে স্বাভাবিকভাবে একাকার করে দেখাও একটি গভীর রাজনৈতিক বিভ্রান্তি।
 

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে আজ গণতন্ত্র বলতে প্রায় একচেটিয়াভাবে নির্বাচন বা ভোটাভুটিকেই বোঝানো হচ্ছে। যেন ভোট হলেই গণতন্ত্র সম্পন্ন, আর নির্বাচন হলেই সব রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হয়ে যাবে। এই ধারণাটি শুধু ভুল নয়, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি একটি ভয়ংকর রাজনৈতিক প্রতারণা। কারণ ইতিহাস আমাদের স্পষ্টভাবে শেখায়—রাষ্ট্র গঠন আর সরকার নির্বাচন এক জিনিস নয়। ফরাসি বিপ্লব কোনো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাও ভোটাভুটির ফল নয়। আগে এসেছিল জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—পুরোনো শাসনব্যবস্থা ভেঙে নতুন রাষ্ট্র গড়ার সিদ্ধান্ত। নির্বাচন এসেছে পরে, গঠিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে ক্ষমতা বণ্টনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে।

এই কারণেই বলা যায়, নির্বাচন নিজে গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র কায়েম থাকলে ভোটাভুটি সরকার নির্বাচনের একটি উপায় হতে পারে, কিন্তু সেটাই জনগণের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র পথ নয়। গণতন্ত্র মানে কেবল কে ক্ষমতায় যাবে তা নির্ধারণ করা নয়; গণতন্ত্র মানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা কার স্বার্থে, কোন নিয়মে এবং কোন সীমার মধ্যে ব্যবহৃত হবে—সে বিষয়ে জনগণের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ। এই নিয়ন্ত্রণ যদি না থাকে, তাহলে নির্বাচন হয়ে দাঁড়ায় কেবল ক্ষমতা বদলের একটি আচার, গণতন্ত্র নয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় আজ এই কথাটি আরও নির্মমভাবে সত্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরেও যারা একমাত্র সমাধান হিশাবে ‘নির্বাচন’ ফেরি করে বেড়াচ্ছে, ভোটের বাজার আর ভোটের ব্যবসা রমরমা করতে চাইছে, আর প্রচার করছে যে ‘নির্বাচন হলেই গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে’—তারা জনগণকে মারাত্মকভাবে বিভ্রান্ত করছে। তাদের আসল উদ্দেশ্য পুরানা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অক্ষত রেখে কেবল সরকার বদলের খেলা চালু রাখা। তারা বড়জোর কে প্রধানমন্ত্রী হবে, কে মন্ত্রী হবে—সেই প্রশ্ন তোলে; কিন্তু রাষ্ট্রের গোড়ার প্রশ্ন, অর্থাৎ পুলিশ, আদালত, প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী এবং লুটতরাজের কাঠামো কাদের পক্ষে কাজ করবে—এই প্রশ্নটি ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যায়।

এই অবস্থায় ‘নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র’ ধারণাটি আর নিরীহ কোনো ভুল নয়। এটি বাংলাদেশে লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণীর একটি রাজনৈতিক নীতি ও আদর্শ। এই ধারণার মাধ্যমে তারা শেখ হাসিনাহীন পুরানা ফ্যাসিস্ট হাসিনা ব্যবস্থাই টিকিয়ে রাখতে চায়—যেন মুখ বদলালেও কাঠামো না বদলায়, যেন রাষ্ট্রক্ষমতা আগের মতোই লুটতরাজ, দমন-পীড়ন ও সহিংসতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কারণ একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে নির্বাচন মানে ক্ষমতার জন্য সশস্ত্র ও অর্থশক্তিনির্ভর প্রতিযোগিতা; সেখানে জনগণের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার বা অধিকার নিশ্চিত হয় না।

দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের তথাকথিত বামপন্থীদের একটি বড় অংশও এই জায়গায় চরম বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের পরিচয় দিয়েছে। তারাও মনে করে, পুরানা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা রেখে কেবল নির্বাচন করলেই নাকি গণতন্ত্র ফিরে আসবে। এর অর্থ দাঁড়ায়—রাষ্ট্র যেভাবে জনগণের ওপর দমন চালিয়েছে, যেভাবে বিচারব্যবস্থা ও আইনকে লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণীর স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না; শুধু ভোট হলেই সব পাপ ধুয়ে যাবে। এই চিন্তা আসলে জনগণের নয়, বরং ক্ষমতাবান শ্রেণীর সুবিধা নিশ্চিত করবার চিন্তা।

সুতরাং নির্বাচন মানে গণতন্ত্র—এই ধারণা শুধু একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ভুল নয়; এটি বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি চরম বিপজ্জনক রাজনৈতিক ফাঁদ। এই ফাঁদের উদ্দেশ্য একটাই—ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র কাঠামো অক্ষত রেখে জনগণের নামে, জনগণের ভোট ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতার দ্বারা লুটতরাজ চালিয়ে যাওয়া। গণতন্ত্রের সত্যিকারের প্রশ্ন তাই নির্বাচন কবে হবে, তা নয়; প্রশ্ন হলো—এই রাষ্ট্র কাদের পক্ষে দাঁড়াবে, কাদের নিরাপত্তা দেবে, আর কাদের বিরুদ্ধে বন্দুক, মামলা ও কারাগার ব্যবহার করবে। এই প্রশ্নের মোকাবিলা ছাড়া কোনো নির্বাচনই বাংলাদেশে গণতন্ত্র বা স্থিতিশীলতা আনতে পারে না।

৩. গণতন্ত্র রাষ্ট্রের একটি বিশেষ ধরন বা রূপ 

গণতন্ত্রের তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থটি হলো—গণতন্ত্র কোনো নির্বাচন-পদ্ধতি নয়, এটি রাষ্ট্রের একটি বিশেষ ধরন বা রূপ। এই কথাটি নতুন নয়। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর সময় থেকেই রাজনৈতিক চিন্তায় এই প্রশ্নটি কেন্দ্রে ছিল—রাষ্ট্র কাদের ক্ষমতাবান করে, কাদের নিরাপত্তা দেয়, আর কার ওপর বৈধ সহিংসতা প্রয়োগ করে। অর্থাৎ রাষ্ট্র মানে শুধু সরকার নয়; রাষ্ট্র মানে পুলিশ, আদালত, প্রশাসন, আইন, অস্ত্র এবং শাস্তির বৈধ ব্যবস্থাপনা। এই গাঠনিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েই নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রটি গণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক নাকি ফ্যাসিস্ট।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই মৌলিক রাজনৈতিক বোঝাপড়াটিই প্রায় অনুপস্থিত। আমাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র সম্পর্কে দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তার চর্চা কার্যত নাই বললেই চলে। ফলে গণতন্ত্র মানে এখানে দাঁড়িয়ে গেছে একটি সরল ও বিপজ্জনক ধারণায়—ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র কাঠামো অক্ষত রেখে কেবল সরকার বদলের একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। নির্বাচন যেন রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানোর জাদুর কাঠি। অথচ রাষ্ট্র যদি একই থাকে, যদি আইন ও অস্ত্র একই শ্রেণীর স্বার্থে কাজ করে, তাহলে সরকার বদলালেও জনগণের জীবনে কিছু বদলায় না।

এই জায়গায় এলেন বাদিয়ু (Alain Badiou) আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা দেন। তাঁর মতে, আধুনিক যুগে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি প্রায়ই রাষ্ট্রের একটি ব্যবস্থাপনা কৌশলে পরিণত হয়—যার কাজ জনগণের সমতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে ভোট, সংখ্যা আর প্রশাসনিক নিয়মের ভেতরে আটকে রাখা। তখন নির্বাচন আর রাজনীতির প্রকাশ থাকে না; বরং রাষ্ট্র নিজের বৈধতা নবায়নের একটি যন্ত্র হিসেবে নির্বাচন ব্যবহার করে। এই রাষ্ট্র বদল না করে নির্বাচন আয়োজন মানে, বাদিয়ুর ভাষায়, রাজনীতির অনুপস্থিতিকেই বারবার বৈধতা দেওয়া।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আজ যে ‘নির্বাচনের দাবি’ তোলা হচ্ছে, তার বাস্তব ফল কী? বাস্তবে এটি একদিকে লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণীর প্রতিনিধি নির্বাচনের একটি প্রতিযোগিতা, আর অন্যদিকে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও ভয়ভিত্তিক ক্ষমতা দখলের পথ। কারণ রাষ্ট্র যদি ফ্যাসিস্ট থাকে—যদি পুলিশ জনগণকে রক্ষা না করে, যদি আদালত ন্যায়বিচার না দিয়ে জামিন-বাণিজ্যের অংশ হয়, যদি প্রশাসন ক্ষমতাবানদের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়—তাহলে নির্বাচন আর মত প্রকাশের মাধ্যম থাকে না। তখন নির্বাচন মানে হয়ে দাঁড়ায় অস্ত্র, টাকা ও পেশিশক্তির লড়াই। ভোট মানে আর রাজনৈতিক মত নয়; ভোট মানে প্রাণের ঝুঁকি।

শরিফ ওসমান হাদির শাহাদাত এই নির্মম বাস্তবতাকে আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। তরুণদের রক্তের বিনিময়ে আমরা শিখছি—বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে নির্বাচন মানে ন্যায়বিচার নয়, বরং আরও নৈরাজ্য। আরও বিশৃঙ্খলা, আরও সন্ত্রাস ও সহিংসতা, এমনকি দীপু দাসদের গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে মারা। একটু ভাবুন, আমরা দীপু দাসদের রক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করব কীভাবে? আদালতে যখন জামিন-ব্যবসা চলে, আইনজীবীদের সিন্ডিকেট যখন ক্ষমতার অংশ হয়ে যায়, আর রাস্তায় যখন বুলেটই শেষ কথা বলে—তখন নির্বাচন কোনো সমাধান নয়। এমন রাষ্ট্রে নির্বাচন মানে হাদীর মতো তরুণদের কোনো রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ছাড়াই গুলিবিদ্ধ হওয়া।

এই কারণেই যারা আজও বলে ‘আগে নির্বাচন, পরে সব ঠিক হয়ে যাবে’, তারা হয় গভীর আত্মপ্রবঞ্চনায় ভুগছে, নয়তো সচেতনভাবে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রকে রক্ষা করছে। কারণ তারা রাষ্ট্রের প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছে। তারা সরকার পরিবর্তনের কথা বলে, কিন্তু রাষ্ট্র কার পক্ষে দাঁড়াবে—এই মৌলিক প্রশ্নে নীরব থাকে। গণতন্ত্র কোনো ব্যালট বাক্সের নাম নয়। গণতন্ত্র মানে জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা—নিজেদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও ক্ষমতার কাঠামো নতুন করে গড়ার সামষ্টিক সাহস।

সেই সাহস ছাড়া নির্বাচন কেবল একটি আচার। আর ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের ভেতরে সেই আচার শেষ পর্যন্ত কবরের ওপর ফুল দেওয়ার নামান্তর—যেখানে রাষ্ট্র অক্ষত থাকে, লুটতরাজ চলে, আর জনগণ শুধু নামেমাত্র ‘ভোটার’ হয়ে বেঁচে থাকে।

হয়তো শরিফ ওসমান হাদি জীবন বিসর্জন দিয়ে আমাদের আবার বিভ্রান্তি পরিহার করে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছেন। লুটেরা-মাফিয়াশ্রেণীর নির্বাচনী রাজনীতি নাকি দেশ-কাল-সমাজ ও ইতিহাস সচেতন তরুণদের নেতৃত্বে গঠনের রাজনীতির পথই জনগণের পথ। আজ তরুণদের সামনে এটাই প্রধান প্রশ্ন। আলবৎ এই পথেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। এটাই জনগণের মুক্তির পথ। শহিদ শরিফ ওসমান হাদির জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশগ্রহণ করে এই বার্তাই সরবে তরুণদের জানিয়ে দিয়ে গেল।

আগে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠন তারপর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক নির্বাচন লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণীর সৃষ্ট আততায়ী রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।