ইরানিরা কীসের স্বপ্ন দেখছে?


মিশেল ফুকো
Thursday 29 October 09

তরজমা: মাহবুবুল আলম তারেক

“ওরা কখনোই আমাদেরকে তাদের ইচ্ছার বাইরে যেতে দিবে না; ভিয়েতনামে যতটুকু মেনে নিয়েছে তার অধিক কড়িকাঠও আমাদেরকে মাড়াতে দিবে না।” আমি উত্তরে বলতে চেয়েছিলাম, তারা এমনকি তোমাদেরকে ভিয়েতনামের মতো অতো সহজে ছাড়তে অনিচ্ছুক, কারণ তোমাদের রয়েছে তেল এবং অন্যতম কারণ এটা মধ্যপ্রাচ্য। ক্যাম্প-ডেভিড চুক্তির (১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮) পর মনে হচ্ছে যে, তারা হয়তো লেবাননকে সিরিয়ার কর্তৃত্বে এবং তার ফলস্বরূপ সোভিয়েত প্রভাবাধীনে মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কি এমন একটি অবস্থান থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে যা তাদেরকে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রাচ্যে হস্তক্ষেপ অথবা শান্তি প্রক্রিয়ার দেখভাল করার সুযোগ করে দিত?

আমেরিকানরা কি শাহকে একটি নতুন শক্তি-পরীক্ষায় ঠেলে দিবে? যা হবে আরো একটি “কালো জুমাবার”[১৯৭৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর শাহের মার্শাল ল ভঙ্গ করে প্রতিবাদ সমাবেশ চলাকালে তেহরানের জালেহ চত্বরে ট্যাংক-গানশিপের বেপরোয়া আক্রমণে প্রায় হাজার খানেক লোক শাহাদাৎ বরণ করে]? বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় ক্লাস সমুহ শুরু হওয়া [তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শাহবিরোধী তরুণ শিক্ষক প্রশাসনিক ভবন দখল করে ক্লাশ শুরু করে], সাম্প্রতিক ধর্মঘট সমূহ [আবাদান তেলশোধনাগারের শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘট], পুনরায় শুরু হওয়া গন্ডগোল সমূহ, এবং পরবর্তী মাসের ধর্মীয় উৎসব-- এসব ঘটনাবলী হয়তো এমন একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ ব্যাপারে কঠোর-হস্ত ব্যাক্তিটি হচ্ছে সাভাকের [শাহের গোয়েন্দা বাহিনী] চলতি প্রধান মোঘাদাম।massrally

এটি হচ্ছে মদদকারী পরিকল্পনা (backup plan) যা এই মুহূর্তে অতটা কাঙ্ক্ষিতও নয় সবচেয়ে সম্ভাব্যও নয়। এটা হবে অনিশ্চিত; কেননা কতিপয় জেনারেলের উপর হয়তো ভরসা করা করা যেতে পারে কিন্তু এদিকটা পরিষ্কার নয় যে পুরো সেনাবাহিনীর উপর ভরসা করা যায় কিনা। এবং নিঃসন্দেহে এটা হবে অর্থহীন কেননা আভ্যন্তরীণ বা বহিরাগত কোন দিক থেকেই কোন প্রকার “কমিউনিস্ট হুমকি” (communist threat) নেই। বাইরের দিক থেকে নেই, যেহেতু বিগত পঁচিশ বছরে এ ব্যাপারে ঐকমত্য দেখা গেছে যে সোভিয়েত রাশিয়া ইরানে হস্তক্ষেপ করবে না, আর আভ্যন্তরীণ দিক থেকে নেই এজন্য যে, ইরানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মধ্যে মার্কিনিদের প্রতি যেমন ঘৃণা আছে ঠিক সমপরিমানে সোভিয়েত ভীতিও বিরাজমান।

যাই হোক, শাহের উপদেষ্টারা-- মার্কিন বিশেষজ্ঞ, প্রশাসনের হর্তাকর্তাবৃন্দ, রাজনৈতিক বিরোধীপক্ষের কতিপয় গ্রুপ (তারা জাতীয় ফ্রন্টই হোক কিংবা আরও বেশি “সমাজতন্ত্র-মনা” (socialist-oriented)-ই হোক, সকলেই বিগত সপ্তাহ সমুহে এই ব্যাপারে কমবেশি ঔদায্যের সাথে একমত হয়েছে যে, একটি “ত্বরিৎ আভ্যন্তরীণ উদারীকরণ” (accelerated internal liberalization) পদক্ষেপ নিতে হবে নতুবা যা ঘটার ঘটতে দিতে হবে। বর্তমানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য স্প্যানিশ মডেল হচ্ছে সবচেয়ে পছন্দসই। ইরানের ক্ষেত্রে কি তা খাপ খাওয়ানোর যোগ্য? কৌশলগত সমস্যাও রয়েছে অনেক। দিনক্ষণের ব্যাপারেও প্রশ্ন রয়েছে যে, এখনি নাকি পরবর্তীতে, আরেকটি সংঘাতময় ঘটনা ঘটার পর? কতিপয় ব্যাক্তি সম্পর্কেও প্রশ্ন রয়েছে-- শাহ থাকবে নাকি শাহকে ছাড়াই? হতে পারে তার পুত্র বা স্ত্রী কে দিয়ে? প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আমিনী, যে পুরাতন কুটনীতিককে অভিযানটি পরিচালনা করতে বাধ্য করা হয়েছিল, সে কি ইতিমধ্যেই ক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়নি?

রাজা এবং সাধু

ইরান ও স্পেনের মধ্যে কিছু মৌলিক ফারাক রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যর্থতার ফলে ইরানে একটি উদার, আধুনিক ও পাশ্চাত্যধরনের সরকার কায়েম বাধাগ্রস্থ হয়। তার পরিবর্তে সেখানে, যে সকল উদার রাজনৈতিক দলসমূহ ধীরলয়ে পূর্ণগঠিত হচ্ছিল সেগুলোকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে, নীচু তলা থেকে এক বিশাল আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে উঠে যা এই বছর বিস্ফোরিত হয়। এই আন্দোলন সংগ্রাম প্রায় পাঁচ-লক্ষ মানুষকে তেহরানের রাস্তায় ট্যাংক এবং মেশিনগানের বিপরীতে পরিচালিত করেছে। তারা চিৎকার করে শুধু এটাই বলেনি যে “শাহের মৃত্যু হোক” বরং তারা এও বলেছে যে “ইসলাম, ইসলাম, খোমেনী আমরা তোমাকে অনুসরণ করবো” এবং এমনকি তারা এও বলেছে যে “খোমেনীই হবে রাজা”।

khomineeইরানের পরিস্থিতি বুঝা যেতে পারে ঐতিহ্যগত-ধারাবাহিকতায় খুঁজেপাওয়া চিহ্নসমূহের মতো একটি মহান বীরোচিত লড়াই হিসাবে--রাজা এবং সাধুর মধ্যে, সশস্ত্র শাসক এবং নিঃস্ব নির্বাসিতের মধ্যে--যেখানে স্বৈরাচারী শাসক মুখোমুখি হয়েছে সেই মানুষটির যে রিক্ত হস্তে একাই একটি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। এই ধরনের ভাবমূর্তির নিজস্ব একটি ক্ষমতা রয়েছে, তবে এটা এমন এক বাস্তবতারও নির্দেশ করে যাতে লক্ষ লক্ষ মৃত-আত্মও শরিক হয়েছে।

ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তন ছাড়াই একটি দ্রুত উদারীকরণের ভাবনা এটাই নির্দেশ করে যে নীচুতলা থেকে উত্থিত আন্দোলনটি একটি কাঠামোর মধ্যে সুসংহত হচ্ছে অথবা তা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। তবে এখানে পয়লা নম্বরে উপলব্ধি করতে হবে যে আন্দোলনটি কোথায় এবং কতটুকু পর্যন্ত গড়াতে পারে। যাই হোক, আয়াতুল্লাহ খোমেনী গতকাল প্যারিসে, যেখানে সে আশ্রয় নিয়েছিল এবং আরও অনেক ধরনের চাপ সত্ত্বেও, “এটা (দ্রুত উদারীকরণ পরিকল্পনা) পুরোপুরিই নস্যাৎ করে দেয়।”

জাতীয়তাবাদেও দোহাই পেড়ে নির্বাচন, সংবিধান এবং অন্যান্য বিষয়ে সমঝোতার যে কথা-বার্তা হচ্ছিল এসব তিনি কোরআনের প্রেরণায় প্রতিরোধ করার জন্য ছাত্রদের প্রতি আহবান জানান; একইসাথে তিনি মুসলিম সম্প্রদায় এবং সেনাবাহিনীর প্রতিও একই আহ্বান রাখেন।

তাহলে কি বিরোধী-পক্ষে একটি সুদূরপ্রসারী শাহবিরোধী-বিভাজন ঘটতে যাচ্ছে? বিরোধী-পক্ষীয় “রাজনীতিবিদ”রা অবশ্য বারবার নিশ্চিত করতে চাচ্ছে এটা বলে যে “ভালোই হয়েছে, খোমেনী সামনে এসে শাহ এবং আমেরিকানদের বিরুদ্ধে আমাদেরই শক্তির যোগান বাড়িয়ে দিল। সে যাইহোক, তার নাম শুধু মিছিলের একটি স্লোগানই মাত্র, কেননা তার কোন কর্মসুচিই নেই। আর ভুলে গেলে চলবে না যে ১৯৬৩ সাল থেকেই রাজনেতিক দলসমূহের মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তাই এই মুহূর্তে আমরা শুধু খোমেনীর নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছি, কিন্তু একবার স্বৈরশাসনের উচ্ছেদ হলেই সব অস্পষ্টতা দূর হয়ে যাবে। এবং সত্যিকার রাজনীতিই কর্তৃত্ব গ্রহণ করবে। আমরা শীঘ্রই বুড়ো ধর্মপ্রচারককে ভুলে যাব।” কিন্তু এ সপ্তাহের ছুটির দিনে প্যারিসের উপকন্ঠে আয়াতুল্লাহর গোপন আস্তানাকে কেন্দ্রকরে উত্থিত আলোড়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ ইরানীদের আসা-যাওয়া, প্রভৃতি ঘটনাবলী এই ত্বরিত আশাবাদের বিপরীত চিত্রই তুলে ধরে। এসব থেকে প্রমাণিত হয় যে জনগণ পূর্ণ আস্থা রাখে ঐ রূহানী-শক্তির আদানপ্রদানে যা বিগত পনের বছর নির্বাসিত ঐ বৃদ্ধ ব্যক্তি ও তাদের মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে, যারা তার নামে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে।

কয়েকমাস পুর্বে যখন এই শক্তির প্রকৃতি সম্পর্কে আমি প্রথম অবগত হই তখন আমাকে তা কৌতুহলোদ্দীপ্ত করে তোলে এবং আমি এ ব্যাপারে একটু অস্বস্তিতে ছিলাম। অবশ্যই এ অপরাধ স্বীকার করে বলতে হয়--আমাকে শোনানো কতিপয় চতুর বিশেষজ্ঞের বারবার আওড়ানো কথাটি: “আমরা জানি যে তারা কি চায় না, কিন্তু তারা এখনও জানে না যে তারা কি চায়।”

“কী চাও তোমরা?” এই প্রশ্নটি মাথায় নিয়ে গন্ডগোলের পরদিন আমি তেহরান ও কোওমের রাস্তায় বেরিয়েছিলাম। কোন পেশাদার রাজনীতিবিদকে এই প্রশ্ন না করার ব্যাপারে আমি সতর্ক ছিলাম। তারচে’ আমি বরং ধর্মীয় নেতা, ছাত্র, যেসব বুদ্ধিজীবীরা ইসলামের সমস্যাসমূহ নিয়ে আগ্রহী, এবং প্রাক্তন গেরিলা যোদ্ধা যারা ১৯৭৬ সালেই সশস্ত্র লড়াই ত্যাগ করে বিদ্যমান সমাজের ভিতরেই সম্পূর্ণ এক ভিন্ন আঙ্গিকে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়, এ ধরনের লোকদের সাথেই বিষয়টি নিয়ে কিছুটা-দীর্ঘ আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নেই।

“কী চাও তোমরা?” ইরানে আমার পুরো অবস্থানকালে “বিপ্লব” শব্দটি আমি একবারও শুনিনি, কিন্তু পাঁচবারের মধ্যে চারবারই লোকে আমাকে উত্তর দিয়েছিল, “একটি ইসলামী শাসন ব্যাবস্থা (An islamic government) ।” এটা তেমন আকস্মিক কিছু ছিল না। আয়াতুল্লা খোমেনী ইতিমধ্যেই সাংবাদিকদেরকে তার এই তেজোদ্দীপ্ত জবাব দিয়েছেন এবং জবাবটি এই বিষয়টিতেই অটুট রয়েছে।

ইরানের মত একটি দেশ, যার জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশই মুসলিম কিন্তু আরবও নয় সুন্নীও নয় এবং যার ফলে তা প্যান-ইসলামিজম বা প্যান এরাবিজম এর প্রতি কমই সংবেদনশীল, এরকম একটি দেশে এর (ইসলামী শাসন ব্যবস্থা) মানে কি হতে পারে?

প্রকৃতপক্ষে শিয়া ইসলাম এমন কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে যেগুলিই তার নিজস্ব ঢংয়ের একটি “ইসলামী শাসনব্যবস্থা”র বাসনার যোগানদার। এর সাংগঠনিক কাঠামোতে ধর্মতাত্ত্বিকদের মধ্যে স্তরভেদ-নির্দিষ্ট কর্তৃত্ব (hierarchy) অনুপস্থিত। ধর্মীয় নেতারা পরস্পর থেকে অনেকটা স্বাধীন, তবে অনুসারীদের প্রতি নির্ভরতা (এমনকি আর্থিকও) রয়েছে এবং পুরোপুরি পরমার্থিক (spiritual) কতৃর্পক্ষের গুরুত্বের প্রতি নিষ্ঠাবান। ধর্মতাত্ত্বিক নেতাদেরকে (the clergy) তাদের প্রভাব বজায় রাখার জন্য অনুসরণ এবং পথপ্রদর্শন উভয় ভূমিকাই অবশ্যই পালন করতে হয়। এই হল শিয়া সংগঠনের মূলবৈশিষ্ট্য। আর শিয়া মতবাদেও একটি মূলনীতি হচ্ছে, সত্যের প্রকাশ (truth) শেষ নবীর দ্বারাই সম্পূর্ণ এবং বন্ধ হয়ে যায় নি। মোহাম্মদের পর সত্য প্রকাশের (revealation) আরেকটি চক্র শুরু হয়, তা হচ্ছে শেষ না হওয়া ইমামদের চক্র। যারা তাদের বাণীসমূহ, তাদের কর্মনিদর্শন এবং তাদের শহীদী মৃত্যু প্রভৃতির মধ্যদিয়ে, একটি অভিন্ন আলোবহন করে চলে যা সদা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সদা পরিবর্তনশীল। এটি এমন আলো যা ঐশ্বরিক আইনের অন্তঃস্থিত মর্মকে ভিতর থেকে উদ্ভাসিত করতে সক্ষম। আর ঐশ্বরিক আইন শুধু সংরক্ষিত করার জন্যই নয় বরং এটি যে পরমার্থিক অর্থ বহন করে সময়ের প্রেক্ষিতে তাও প্রতিনিয়ত উন্মোচন করার জন্যেও প্রেরিত হয়েছে। যদিও তার প্রতিশ্রুত পুনরাগমনের পুর্ব পর্যন্ত তিনি অদৃশ্যই থাকবেন তথাপি দ্বাদশ ইমাম সর্বত বা নিরবিচ্ছিন্ন--কোনোভাবেই অনুপস্থিত নন। জনগণ নিজেরাই তার ফিরে আসার শর্ত তৈরি করে, সত্য ততটুকুই তাদেরকে আলোকিত করে যতদূর তারা সে সম্পর্কে নিজেদের জাগরিত করে।

শিয়া মতবাদে এটা প্রায়ই বলা হয় যে, সকল শক্তিই অশুভ যদি তা ইমামের শক্তি না হয়। যদিও আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বিষয়গুলো অনেক বেশি জটিল। আমাদের সাক্ষাতের প্রথম কয়েক মিনিটে আয়াতুল্লাহ শরীয়তমাদারী আমাকে যা বলেছেন তা হলো, “আমরা ইমামের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছি ঠিকই, তার মানে এই নয় আমরা একটি উত্তম শাসন ব্যাবস্থার (good government) সম্ভাবনা ত্যাগ করছি। তোমরা খ্রীস্টানরাও অনুরূপ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছ যদিও তোমরা শেষবিচার দিনের অপেক্ষায় বসে আছ।” যেন তার কথাকেই আরও বেশি যথার্থ করে তোলার জন্যই আমাকে অভ্যর্থনা জানানোর সময় তিনি ইরানের মানবাধিকার কমিটির কতিপয় সদস্য দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন।

একটি বিষয় অবশ্যই পরিষ্কার থাকা দরকার, “ইসলামী শাসন ব্যবস্থা” দ্বারা ইরানের কেউই এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা বুঝায় না যেখানে ধর্মতাত্ত্বিকদেরই কর্তৃত্ব থাকবে। আমার কাছে মনে হয় “ইসলামি শাসনব্যবস্থা” শব্দগুচ্ছটি দুটি বিষয় নির্দেশ করে।

প্রথমত, “একটি কল্পলোক” (“An utopia”) যা তাদের কেউ কেউ আমাকে বলেছিল কোন প্রকার নিন্দার্থে প্রয়োগ ছাড়াই এবং দ্বিতীয়ত, “একটি আদর্শ” (“An ideal”) যা তাদের বেশির ভাগই বলেছে। যে কোন উপায়ে ইসলামের এমন একটি অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করার বাসনা যা পয়গম্বরের সময় বিরাজমান ছিল--যা খুবই পুরনো আবার ভবিষ্যতের দিকেও অনেকদূর অগ্রসর। তবে এটি নিছকই পিছনে প্রত্যাবর্তন নয় বরং সামনের দিকে সুদূরে অবস্থিত আলোকিত লক্ষের অভিমুখে এগিয়ে যাওয়া, যেখানে নিরস আনুগত্য অক্ষুণ্ন রাখার চেয়ে বরং একনিষ্ঠতার নবায়ন সম্ভব হবে। আমার কাছে মনে হয় যে এই আদর্শের অনুসরণ ইসলামের সৃজনশীলতায় বিশ্বাসের পাশাপাশি সর্বপ্রথমেই আইনবাদিতার (legalism) প্রতি অপরিহার্য অনাস্থা তৈরি হবে।

একজন ধর্মতাত্ত্বিক পন্ডিত আমার কাছে ব্যাখ্যা করলেন যে, যেসব বিষয়ে কোরআনে স্পষ্ট কোন বিধান দেয়া নেই সেসব সমস্যাগুলোর উপর আলোকপাত করার জন্য সাধারণ মানুষ, ধর্মতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ, পন্ডিতজন এবং বিশ্বাসী সকলের সম্মিলিত এক বড় কর্মযজ্ঞের প্রয়োজন হবে। তবে যে কেহ এখানে কিছু সাধারণ দিকনির্দেশনা পেতে পারে: যেমন, ইসলাম কর্মের মুল্যায়ন করে; এবং কেউই তার শ্রমের ফসল থেকে বঞ্চিত হতে পারবে না; যাতে অবশ্যই সকলের হক রয়েছে (যেমন: পানি, ভূগর্ভস্থ সম্পদ) তা কোন একজন ব্যক্তি কর্তৃক কব্জায় থাকবে না। আর স্বাধীনতার ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, তারা ততটুকুই স্বাধীনতা চর্চা করতে পারবে যা অন্যদের ক্ষতি করবে না। সংখ্যালঘুরা বসবাসে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা পাবে, এই শর্তে যে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠদের ক্ষতি হয় এমন কাজে বিরত থাকবে; পুরুষ ও নারীর মধ্যে অধিকারের ক্ষেত্রে কোন বৈষম্য থাকবে না, তবে ভিন্নতা থাকবে, যেহেতু প্রকৃতিগতভাবেই তাদের মধ্যে একটা ভিন্নতা রয়েছে। রাজনৈতিক ব্যপারে দিকনির্দেশনা হচ্ছে যে, সিদ্ধান্ত প্রণীত হবে সংখ্যাগরিষ্ঠের দ্বারা, নেতাদেরকে অবশ্যই জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ হতে হবে, এবং প্রত্যেকটি ব্যক্তিরই, কোরআনে যেভাবে নির্দেশনা আছে, শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে কৈফিয়ত চাওয়ার অধিকার থাকতে হবে।

প্রায়ই বলা হয় যে ইসলামী শাসনব্যাবস্থার রূপরেখাসমূহ স্পষ্ট নয়। অথচ আমার কাছে সেগুলো সুপরিচিতই মনে হয়, তবে আমি অবশ্যই বলবো যে স্পষ্টতা অতটা সুদৃঢ় নয়। আমি বললাম “এগুলোই হচ্ছে গণতন্ত্রের মূলসূত্র, সেটা বুর্জোয়া বা বিপ্লবী উভয়েরই”। “আঠার শতক থেকে আজ পর্যন্ত আমরা অনর্গল পুনরাবৃত্তি করছি, এবং তোমরা জান তারা কোথায় নিয়ে গেছে।” কিন্তু আমি সাথে সাথেই এ জবাব পেলাম, “কোরআন তোমাদের দার্শনিকদের অনেক পূর্বেই এসব ঘোষণা করেছে, এবং যদি খ্রিস্টান ও শিল্পায়িত পশ্চিম এর অর্থ হারিয়েও ফেলে, ইসলাম জানে এই মুল্যবোধ ও কার্যকারিতা কিভাবে রক্ষা করতে হবে।”

যখন ইরানিরা ইসলামী শাসন ব্যবস্থার কথা বলে; যখন তারা ইসলামের নামে, সম্ভাব্য একটি রক্তস্নানের মুখেও, রাজনীতিবীদ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যস্থতায় আয়োজিত লেনা-দেনা প্রত্যাখান করে, তখন তাদের মনের মধ্যে এই সমস্ত ফর্মুলা ছাড়া ভিন্ন কিছু স্বপ্ন বিরাজ করে। এবং তাদের হৃদয়ের মধ্যেও ভিন্ন কিছু লালন করে। আমি বিশ্বাস করি যে তারা এমন একটি বাস্তবতার কল্পনা করছে যা তাদের অতি নিকটে, যেহেতু তারা নিজেরাই এর সক্রিয় বাস্তবায়নকারী।

প্রথম এবং প্রধানত এটা এমন একটা আন্দোলন যা ইসলামী সমাজের ঐতিহ্যবাহী কাঠামোসমূহের মধ্যেই রাজনৈতিকতার ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী ভূমিকা পালন করতে চায়। একটি ইসলামী শাসন ব্যবস্থা হচ্ছে এমন যা, শাহের শাসন প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে মসজিদ ও ধর্মীয় গোষ্ঠীসমূহের মধ্যে থেকে যে অসংখ্য রাজনৈতিক সভার উৎপত্তি হয়েছিল তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিবে। আমাকে একটি উদাহরণ দেয়া হয়। দশ বছর আগে ফেরদৌস নগরীতে একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল । পুরো নগরিটাই পুনর্নিমান করতে হয়েছিল, কিন্তু যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা যেহেতু বেশিরভাগ কৃষক ও ক্ষুদ্রশিল্পীদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি, তারা তা থেকে নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নেয়। তারা একজন ধর্মীয় নেতার নির্দেশনায় অদূরেই নিজেদের জন্য নতুন শহর তৈরি করে। তারা সবার কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে, যৌথভাবে বাসস্থানের জায়গা পছন্দ করে, এবং একটি সমবায়ও গড়ে তোলে। তারা তাদের নগরের নাম দেয় “ইসলামিয়াহ।” ভূমিকম্প শুধুমাত্র ধর্মীয় কাঠামোসমূহকে প্রতিরোধের কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করারই সুযোগ করে দেয় নি বরং রাজনৈতিক সৃজনশীলতার উৎস হিসাবেও ব্যবহার করার সুযোগ করে দেয়। কেউ যখন ইসলামী শাসন ব্যবস্থার কথা বলে তখন সে এরকম স্বপ্নই দেখে।

গায়েবী উপস্থিতি (The invisible present)

তবে কেউ কেউ অন্য এমন একটি আন্দোলনের স্বপ্নও দেখে যা প্রথমটির বিপরীত ধারণা লালন করে। এটি হলো এমন একটি স্বপ্ন যা রাজনৈতিকতার ক্ষেত্রে একটি পরমার্থিক (spiritual) দিগন্ত উম্মোচন করার সুযোগ করে দিবে। এজন্য যেমনটি সচরাচর ঘটে থাকে তেমনি, আধ্যাত্মিকতার (spirituality) প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ না হয়ে বরং এর আধার, এর সুযোগ সৃষ্টি এবং এর চালিকাশক্তি হবে। ঠিক এখানটাতে এসে আমরা আসলে এক ছায়ামূর্তি মুখোমুখি হই যিনি আজকের ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জীবনের সর্বত্রই তাড়া করে ফিরছেন। আলী শরীয়তি--দুই বছর আগে তাঁর মৃত্যু তাঁকে এমন উচ্চতায় আসীন করে যা শিয়া বিশ্বাসের মধ্যে গায়েবের উপস্থিতি বলে গণ্য-- সদা বর্তমান এক অবর্তমান।

ali shariatiএকটি ধর্মীয় ঘরানায় বেড়ে ওঠা শরীয়তি ইউরোপে অধ্যায়নকালে আলজেরিয়ান বিপ্লবের নেতাদের ও বাম ঘরানার খ্রিস্টান আন্দোলন এবং অ-মার্কসীয় সমাজতান্ত্রিক চেতনা প্রবাহের সংস্পর্শ লাভ করেছিল। (তিনি গরভিচ (Gurvitch) এর ক্লাশসমুহে অংশগ্রহণ করেছিলেন)। তিনি ফ্রানজ ফ্যানন ও লুই মাঁসিনোর কাজের সাথে পরিচিত ছিলেন। এরপর তিনি মাশাদে ফিরে আসেন। সেখানে তিনি শিখাতে শুরু করেন যে, শিয়া মতবাদের প্রকৃত অর্থ এমন একটি ধর্মাচরণের মধ্যে অনুসন্ধান করা উচিত নয় যা সতেরশতক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল, বরং ইতিমধ্যেই প্রথম ইমাম কতৃক প্রচারিত সামাজিক ইনসাফ ও সাম্যের নসিহতের মধ্যেই তা অনুসন্ধান করতে হবে। তার (শরীয়তির) “সৌভাগ্য” ছিল যে, হয়রানির কারণে সে বাধ্য হয়েছিল তেহরান যেতে এবং তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি মসজিদের তত্বাবধানে তাঁর জন্য নির্মিত একটি ঘরে বসে দীক্ষা প্রদান করতে। সেখানে তিনি একটি জনসমষ্টির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতেন যা ছিল তাঁর নিজের, এবং অচিরেই তা সহস্র সংখ্যায় উন্নীত হয়, এরা ছিল ছাত্র, মোল্লা, বুদ্ধিজীবি, বাজারের নিকটবর্তী এলাকার বাসিন্দা, এবং পথিমধ্যে এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে যাতায়াতকারী লোকজন। শরীয়তির বইপত্র নিষিদ্ধ করা হয়, তাকে তাড়িয়ে বেড়ানো হয়, অবশেষে তিনি শহীদী মৃত্যু বরণ করেন। তাকে না পেয়ে তার পিতাকে গ্রেফতার করা হলে তিনি আত্মসমর্পন করেন। এক বছর জেল খেটে নির্বাসনে যাওয়ার অল্প পরেই তিনি এমনভাবে মৃত্যুবরণ করেন যে খুব কম লোকই মেনে নেয় যে তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তেহরানের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ মিছিলটিতে শরীয়তির নামটিই ছিল একমাত্র নাম যা খোমেনীর পাশাপাশি উচ্চারিত হয়েছিল ।

রাষ্ট্রব্যবস্থার উদগাতারা (The Inventors of the State)

ইসলামী শাসন ব্যাবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে একে শুধু একটি “ধারণা” (idea) বা এমনকি শুধু একটি “আদর্শ” (ideal) হিসাবে উপস্থাপন করতে আমি ঠিক স্বস্তি বোধ করি না। তার চেয়ে বরং এটি আমার কাছে “রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার” (political will) একটি বিশেষ রূপ হিসাবেই ধরা দেয়। চলতি সমস্যাবলীর সমাধান কল্পে অবিচ্ছেদ্যভাবে সামাজিক ও ধর্মীয়কাঠামো সমূহকে রাজনৈতিকীকরণের প্রচেষ্টায় এটি আমাকে মোহিত করে। এটি রাজনীতিতে একটি পরমার্থিক দিগন্ত উন্মোচনের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েও আমার মনে রেখাপাত করে।

এই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা সংক্ষেপে দুটি প্রশ্নের জন্ম দেয়:

১. এটা কি এখন পর্যাপ্তরুপে দাঁনা বেধেছে, এবং একটি “আমিনী সমাধান”(Amini solution) প্রতিহত করার জন্য এর সংকল্পের দৃঢ়তা কি যথেষ্ট পরিষ্কার? যার প্রতি (আমিনি সমাধান) কিছু আনুকুল্য রয়েছে যে, এটি শাহের নিকট গ্রহণযোগ্য, এটি বিদেশি শক্তিকর্তৃক সুপারিশকৃত, এর লক্ষ্য হচ্ছে একটি পশ্চিমা ধাচের সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা এবং এটি নিঃসন্দেহে ইসলামি ধর্মাচরণকে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করবে?

২. এই রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা কি ইরানের রাজনৈতিক জীবনে একটি স্থায়ী উপাদানে পরিণত হওয়ার জন্য গভীরভাবে শিকড় গাড়তে পেরেছে, অথবা এটি কি তখন বাষ্পের ন্যায় উবে যাবে যখন রাজনৈতিক বাস্তবতার আকাশ চুড়ান্তভাবে স্পষ্ট হবে? এবং আমরা কবে নাগাদ সক্ষম হব কর্মসূচীসমুহ, দলসমূহ, একটি সংবিধান, পরিকল্পনাসমূহ, এবং অনান্য বিষয়ে কথা বলতে?

রাজনীতিবিদরা বলতে পারে যে এই দুটি প্রশ্নের জবাবই মূলত এখনকার গৃহীত কৌশলের অনেকটার জন্য নির্ধারক।

এই “রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার” ব্যাপারে আরও দুটি প্রশ্ন রয়েছে যা আমাকে এমনকি আরও গভীরভাবে নাড়া দেয়।

একটি, ইরান এবং এর বিচিত্র নিয়তির প্রাসঙ্গিক। ইতিহাসের উষালগ্নেই পারস্য রাষ্ট্র ব্যবস্থার উদ্ভাবন করেছিল এবং এর বৈশিষ্টসমূহ ইসলামের মধ্যে প্রতিস্থাপন করেছিল। এর প্রশাসকরা খেলাফত পরিচালনা করেছে । কিন্তু ঠিক সেই একই ইসলাম থেকে এমন একটি ধর্মের উৎপত্তি ঘটিয়েছে যা তার জনসমষ্টিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রতিরোধ করার জন্য অফুরন্ত প্রাণশক্তি যুগিয়েছে। একটি ইসলামি শাসন ব্যাবস্থার এই উদিয়মান আকাঙ্ক্ষার মধ্যে কি কেউ একটি মীমাংসা, একটি বৈপরিত্য, অথবা নতুন কিছু হয়ে ওঠার যাতনা দেখতে পায়?

অপর প্রশ্নটি পৃথীবির এই ক্ষুদ্র অঞ্চলটির ব্যাপারে যার ভূমির, পৃষ্ঠদেশের উপরিভাগ এবং নিম্নভাগ উভয়দিক থেকেই, বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।

এমন একটি ভূমিতে বসবাসকারী জনমন্ডলীর, এমনকি তাদের জীবনের বিনিময়ে হলেও, অনুসন্ধানের বিষয়টি হচ্ছে একটি “রাজনৈতিক পরমার্থিকতা” (a political spirituality), যার সম্ভাবনার কথা রেনেসাঁ এবং খ্রিস্টধর্মের মহা সংকটকাল থেকেই আমরা ভুলে গেছি। ইতিমধ্যেই আমি শুনতে পাচ্ছি যে ফরাসিরা হাসছে, কিন্তু আমি জানি যে তারা ভ্রান্ত।

প্রথম প্রকাশ: লে নুভে অভজেভেতুঁর, অক্টোবর, ১৬-২২, ১৯৭৮। Foucault and the Iranian Revolution: Gender and the Seductions of Islamism by Janet Afary and Kevin B. Anderson, University of Chicago Press. ©2005. থেকে তরজমা করা হয়েছে।


Available tags : আইন, সংবিধান, গণতন্ত্র, ফরহাদ মজহার, Farhad Mazhar

View: 4698 Posts: 0 Post comments

Home
EMAIL
PASSWORD