ভূমিকা : ইহজাগতিকতার ইতি-আদি


তালাল আসাদ
Thursday 10 December 09

নৃবিজ্ঞানী তালাল আসাদ বাংলাদেশে কমবেশি পরিচিত। পেশায় শিক্ষক, মার্কিন দেশের ন্যূ ইয়র্কের সিটি য়ুনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করছেন। ঔপনিবেশিক উৎস ও প্রকরণজাত শাস্ত্র হিসেবে সাম্রাজ্যিক প্রকল্প থেকে পরিচালিত অ-পশ্চিমী জগতকে ‘বিষয়’ বানিয়ে বিদ্যা উৎপাদন ব্যবসা তার হাতে পড়ে বড়সড় একটা ঝাকুনি খায়। তিনি একেবারে আরম্ভেই মোকাবেলার সূচনা করেন, এই শাস্ত্রের অনুমান, পাটাতন আর উদ্দেশ্যকে। এরই আদি নিদর্শন তার সম্পাদিত ‘এনথ্রপলজি এন্ড কলনিয়াল এনকাউন্টার’(১৯৭৩) বইটি।

নৃবিজ্ঞানের অভ্যাসের আওতায় ফেলে পশ্চিমকে সাব্যস্ত করার কাজ শুরু করেন সেই থেকে। ঔপনিবেশিক ‘কর্তা’কে ঔপনিবেশিতের অজ্ঞান উদ্ধারের জন্য বাছাই করে তিনি আধুনিকতার ইতি-আদি—আকার ও বিকার প্রদর্শনে নিরত হন। গোড়ায় গিয়ে গাথুনির তলা এবং মালমশলার স্বরূপ সংক্ষেপ করেছেন জেনিয়ালজি অব রিলিজিন বইটাতে(১৯৯৩)। ধর্মাধর্মের অর্গলমুক্ত নিখাদ দুনিয়াদারিতে অগ্রগামিতার অভাব হেতু প্রাচ্য বিশেষ, মুসলমানদের দুর্দশার যে অন্ত নাই সেই বয়ানের চাকচিক্যময় বাহিরানা আর অন্দরের ঐতিহাসিক বাসনার বসন খুলে তিনি আসল মুখখানা হাজির-নাজির দেখাতে পেরেছেন ফরমেশনস অব সেক্যুলার(২০০৩) বইটাতে। সদাপ্রভুর খেদমতে নিয়োজিত খ্রিস্টসাম্রাজ্য রাষ্ট্র ও রাজনীতির নিরন্তর দাওয়াইপত্রে ইসলামকে যেভাবে আদিভৌতিক বিভীষিকা বানানোর তালে মজেছে তার চলন ও চরিত বিশ্লেষণে তিনি তাদেরই ইতিহাসকে সাক্ষী মেনেছেন সর্বশেষ অন সুইসাইড বম্বিং(২০০৭) বইতে।

বাংলাদেশে এসবের কিছু খরব কিছু, জাবর কাটা হয়েছে। তবু ঔপনিবেশিক মধ্যবিত্তের মনোবৃত্তি আর ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র নামে ইসলাম বিদ্বেষের আয়োজনে ভাটা পড়েনি। অতি সম্প্রতি আরো জোরদার হয়েছে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রায়োগিক কৌশল বাস্তবায়নে ব্যস্ত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির লোক-লশকর মিলে। রাষ্ট্র ও সংবিধানকে ‘সেক্যুলার’ করার উপায় অথবা নিরুপায় রাস্তা ধরে আওয়ামী লীগ আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখেছে। অন্যদিকে কোনো মৌলিক পর্যালোচনার আভাস নেই গতানুগতিক বিরোধিতাকারীদের। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের চাইতেও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’য় কেন এত অধিক আগ্রহ জমে ওঠে বাংলাদেশে সেই প্রশ্নটি করা দরকার।

সেই অভাববোধ ঘুচিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনের সারির প্রশ্নগুলোর মোকাবেলায় প্রস্তুতির সহায়ক হবে এই বিবেচনায় আমরা আসাদের ফরমেশন অব সেক্যুলার বইটির তরজমা ধারাবাহিকভাবে ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখানে সেই প্রেক্ষিত তৈরি এবং আলোচনায় সবার সরব অংশগ্রহণ কামনা করছি। তরজমার কষ্টসাধ্য কাজটি করছেন মোহাম্ম্দ আরজু। এখানে দ্বিতীয় কিস্তি পড়ুন।

২.

মতবাদ হিসেবে ইহজাগতিকতা(সেকুলারিজম) যদি একান্ত যুক্তিবোধ ও অনেকান্ত মূলনীতির মাঝখানে ফারাক জারি করেই বহাল হয়, তবে তা একই সাথে যা কিছু ‘ধর্মীয়’ তার বদলে ‘জাগতিকতা’(সেকুলার) আমদানিরও জরুরত তৈরি করে। একান্ত যুক্তিবোধ কখনোই ব্যক্তিগত পরিসরের মতো একই কাতারের নয়; একান্ত যুক্তিবোধ হচ্ছে মতভিন্নতার অধিকার, অনেকান্ত মূলনীতির জবরদস্তি থেকে সুরক্ষা। সুতরাং এইসব প্রকরণের প্রতিটির তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক মুশকিলগুলো সাফসাফ সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন। একটা কথন (ডিসকোর্স) কিংবা সক্রিয়তাকে ঠিক কোন জিনিষটি ধর্মীয় কিংবা জাগতিক করে তোলে?

‘দি বাইবেল ডিজাইনড টু বি রিড অ্যাজ লিটারেচার’ নামে একটি বই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংল্যান্ডে প্রকাশিত হয়। বইটির বিন্যাস ছিল প্রাচীন ধরনের; দুই-কলামে সংখ্যাক্রম অনুসারে সাজানো শোলোক এবং আধুনিক পৃষ্ঠাসজ্জা ও মুদ্রণশৈলীতে পংক্তির জন্য বিরতি সহ ধারাবাহিক বর্ণনার আবহ তৈরি করার উদ্দেশ্যে বিন্যস্ত। ভূমিকায় যেরকমটি ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে: ‘‘বাইবেলের একটা বিশাল অংশ যদিও কাব্য, কাব্য মুদ্রিত হয়েছে গদ্যের মতো। অন্যদিকে ধারাবাহিকভাবে না হয়ে গদ্য মুদ্রিত হয়েছে আলাদা আলাদা ছোট্ট শোলোকে এবং শোলোকসমূহ পরিচ্ছেদে বিভক্ত। বাইবেলে সাহিত্যের সব প্রচলিত রুপ রয়েছে; গীতিকাব্য, নাট্যকাব্য ও শোকগাথামূলক কাব্য, ইতিহাস, কথাকল্প, দার্শনিক আলোচনা, প্রবাদ, চিঠিপত্র। তার সাথে রয়েছে এমন ধরনের রচনা যা বিশেষভাবে বাইবেলের নিজস্ব ধরন, যাকে বলে নবুওতী কালাম। যদিও এর সবই মুদ্রণে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যেন আদিতেও এগুলো এমনই সাহিত্যরুপে ছিল’’ (পৃষ্ঠা ৭)। বিন্যাসের এই বদল বাইবেলকে সাহিত্য হিসেবে পাঠ করার সুবিধা করে দিয়েছে। কিন্তু বইটির উদ্ধৃত অংশে ইঙ্গিতে জানানো হচ্ছে যে, সাহিত্য’র অর্থ অনিশ্চিত—যা একই সাথে ‘শিল্প’ও; ‘একটি নির্দিষ্ট বিষয় ঘিরে আবর্তিত বাক্যালাপ’ এবং স্রেফ ‘মুদ্রিত বিষয়’।

বাইবেলকে যদি শিল্পকলা হিসেবে পাঠ করা হয় (কাব্য, পুরান অথবা দর্শন, যাই হোক না কেন), সেটা এ কারণেই যে, নানা শাস্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্কসূত্রের ঐতিহাসিক ক্রমোন্নতি এবং সংবেদনশীলতা এ ধরনের পাঠ সম্ভব করে তুলেছে। সুতরাং বইটির ভূমিকা শেষ পর্যন্ত বলছে যে, সাহিত্য হিসেবে বাইবেলের পাঠ কোনোভাবেই এর পবিত্র মর্যাদার প্রতি অবমাননা নয় ; (‘‘এবং আসলে ধর্মীয় ও জাগতিক এর মাঝখানে অনমনীয় বিভাজন তৈরি করার মানে হলো দুটোকেই নিশ্চিতভাবে শেষ করে দেয়া’’) পাঠ্যবস্তুর নমনীয়তার বিষয়ে এরকম সিদ্ধান্ত আসলে নিজেই জাগতিক। একজন খ্রিস্টান যেভাবে বাইবেল পড়ছে একজন নাস্তিক সেভাবে পড়বে না। খ্রিস্ট বিশ্বাস মোতাবেক অতিন্দ্রীয়তার স্বারক—এটা হয় খোদাতালা প্রেরিত কিংবা খোদায়ী অনুপ্রেরণার হুবহু লেখ্যপ্রমাণ—বলেই কি আদতে বাইবেল রচনা হিসেবে ধর্মীয়? অথবা নাস্তিকরা যেহেতু একে মানবীয় শিল্পকলা হিসেবে পড়তে পারে, এটা কি সেকারণেই সত্যিকার অর্থে সাহিত্য? অথবা এটা নিজে কোনোটিই নয়—বরং স্রেফ একটা পাঠ্যবস্তু যা পাঠের গুণে হয় ধর্মীয় নয় সাহিত্যিক বনে যায়—অথবা যেমন আধুনিক নাসারাদের কাছে, দুটোই একসাথে। বিগত দুই অথবা তিন শতাব্দি ধরে ধর্মীয় সংবেদনশীলতার অনুগামী সাহিত্য’র নব উদ্ভূত ধারণার আসন গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। সে যা-ই হোক, যতক্ষণ না কেউ সিদ্ধান্ত দেয়ার খবরদারি নিচ্ছে ততক্ষণ এটা বলা যাচ্ছে না যে একান্ত যুক্তিবোধ কি এবং ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে স্বাধীন রাজনৈতিক মূলনীতি ঠিক কেমন (একান্ত যৌক্তিকতার বৈচিত্র্যকে জায়গা দেয়ার জন্য অনেকান্ত মূলনীতি—এভাবে তা যৌক্তিকতার চেয়ে আরো বেড়ে কিছু হয়ে ওঠে)।

এই জায়গাটুকু আমাকে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করতে দিন, যাকে বিশেষত ২০০১ এর সেপ্টেম্বরের পর থেকে আমাদের সংবাদমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীরা সহিংসতার ইসলামী শেকড় বলে বর্ণনা করছেন, তার বরাত দিয়ে। ধর্মকে বহুকাল আগে থেকেই সহিংসতার উৎস বলে বিবেচনার চল আছে, এবং আধুনিক পাশ্চাত্যে (আদর্শিক কারণেই) ইসলামকে আজব (বিশৃঙ্খল, কর্তৃত্বপরায়ণ, একচ্ছত্র দমনমূলক) তকমায় তুলে ধরা হয়েছে। ২০০১ এর সেপ্টেম্বরের পর ‘ইসলাম’ বিশেষজ্ঞবৃন্দ, ‘আধুনিক দুনিয়া’, এবং ‘রাজনৈতিক দর্শন’ কারবারীরা আরো একবার মুসলিম জাহানকে নসিহত করেছেন নিদারুন ব্যর্থতার জন্য। যারপরনাই অক্ষমতার স্তুপ খাড়া করেছেন—ইহজাগতিকতাবাদ আকড়ে ধরে আধুনিকতার মোকামে প্রবেশ এবং নিজস্ব সহিংস নাড়ির সম্পর্ক ছিন্ন করতে না পারার দরুন। এই প্রেক্ষিতে কিছু ভাবনা নজরে আনালে দেখা যাবে যে, কুরআন অথবা অন্য যেকোনো ধর্মীয় কিতাবের বরাতে সহিংসতার ন্যাযতা পাওয়ার প্রয়োজন নেই। সিরিয়ার জেনারেল আলী হায়দার যখন ১৯৮২ সালে তার সেকুলার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদের আদেশে বিদ্রোহী শহর হামা’য় ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার বেসামরিক লোকের ওপর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালালেন তখন তিনি কুরআনের নাম জপ করেন নি। কিংবা ইহজাগতিকতাবাদী সাদ্দাম হুসেন যখন হাজার হাজার কুর্দকে গ্যাস প্রয়োগ করে হত্যা করলেন এবং দক্ষিণ ইরাকের শিয়া জনগোষ্ঠীকে কচুকাটা করলেন তখনও তিনি কুরআনের আয়াত মুখে আনেন নি। ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনগণের ওপর এরিয়েল শ্যারনের নির্বিচার হত্যা ও সন্ত্রাস প্রসঙ্গে এখন পর্যন্ত যতটুকু সবাই জানে, তাতে জানা যায়, শ্যারন এ কাজ করতে তাওরাতের নাম নেন নি। জেরিকোর সব জীবিত প্রাণের ওপর জোসুয়ার ধ্বংসযজ্ঞ যেমনটি তাওরাতের বরাতে হয়েছিল। বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে বাছবিচারহীন নিষ্ঠুরতা চালাতে কোনো সরকারেরই (অথবা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর) ধর্মীয় কিতাবের মালিকের কাছ প্রার্থনা করে ন্যায্যতা জোগাড়ের প্রয়োজন পড়ে নি; তা সে সরকার বা গোষ্ঠী পশ্চিমা হোক অথবা অ-পশ্চিমা। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য তারা এটা করেছিল, কারণ তখন এটা করা তাদের কাছে ন্যায্য অথবা একই সাথে সুবিধাজনকও মনে হয়েছিলো। এই কিছু ক্ষেত্রে এবং একই সাথে সুবিধাজনক ক্ষেত্রে ধর্মীয় ন্যায্যতা ঘোষণা করা—আর এটা অবধারিতভাবে করতে বাধ্য বলা, দুটি খুবই ভিন্ন ব্যাপার। অগুনতি ধার্মিক মুসলিম, ইহুদি এবং খ্রিস্টান অবিশ্বাসীদের হত্যা করার জরুরতে আটকে যাওয়া ছাড়াই তাদের কিতাব তেলাওয়াত করে; বাধ্যবাধকতার কথা বলার সময় যেকারো এই ছোট্ট ব্যাপারটি মনে রাখা দরকার। এখানে আমার কথা বলার জায়গাটি খুব স্পষ্ট। আমি সোজাসাপ্টা এই বিষয়টিতে জোর দিতে চাই যে, লোকজন এই জটিল এবং বহুমুখী পাঠ্যবস্তুর (কিতাবের) সাথে যে উপায়ে নিজেকে সম্পৃক্ত করে, নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গী ও প্রাসঙ্গিকতা যেভাবে তরজমা করে, সেটা জ্ঞানের নানা শাখা এবং পাঠাভ্যাস, ব্যক্তিগত অভ্যাস ও আকর্ষণের দীর্ঘ প্রচলন এবং সাথে সাথে নির্দিষ্ট সামাজিক পরিস্থিতিতে উপলব্ধিকৃত চাহিদা; এই সবকিছু মিলিয়ে খুবই জড়ানো ব্যাপার।

ইসলামী কিতাবাদিতে বর্তমান ‘ইসলামী সন্ত্রাস’ বিষয়ে হালের কথন দুটি গোপন পূর্বানুমানের তালাশ পেয়েছে : (ক) কুরআনের বাণী মুসলিমদের সে অনুযায়ী চলতে বাধ্য করে; এবং (খ) নাসারা এবং ইহুদীরা নিজেদের খুশি মাফিক বাইবেলের ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে স্বাধীন। এই পূর্বানুমান পাঠ্যবস্তু ও পাঠকের মাঝখানে পরস্পরবিরোধী অবস্থান দাখেল করে: একদিকে ধর্মীয় কিতাবকে নিজস্ব সংবেদনে দৃঢ়সংকল্প বলে ধরে নেয়া হয় এবং ধরে নেয়া হয় যে ধর্মীয় কিতাবের নির্দিষ্ট বিশ্বাস তৈরি করার (যা পরবর্তিতে নির্দিষ্ট আচরণের জন্ম দেয়) ক্ষমতা ওই কিতাবের সাথে যোগাবিষ্ট পাঠকদের অকর্মক করে তোলে। অন্যদিকে ধর্মীয় পাঠককে পরিবর্তনশীল সামাজিক অবস্থা অনুযায়ি কিতাবাদির উদ্দেশ্যার্থ নির্মাণে জড়িত বলে ধরে নেয়া হয়—এখানে এসে আবার কিতাব নিজে অকর্মক থাকে। কর্তৃবর্গের (এজেন্সি) ব্যাপারে এই পরস্পরবিরোধী পূর্বানুমান ধর্ম এবং ইসলামে রাজনীতির ব্যাপারে প্রাচ্যবাদী এবং অন্যান্যদের নেয়া অবস্থানের ব্যাখ্যা করতে সাহায়তা করে। ইসলাম ধর্মীয় কিতাবাদিতে একটি ইন্দ্রজালিক গুণ আরোপ করা হয়েছে, এগুলোকে একই সাথে একার্থক (ঠিক যেমনটি ‘মৌলবাদি’রা জোর দেয় যে, এগুলোর অর্থ বিতর্কের বিষয় হতে পারে না) এবং সংক্রামক (এই সংক্রমন প্রবণতা প্রাচ্যবাদীদের ছাড়া, প্রাচ্যবাদীদের সৌভাগ্য যে তারা এর বিপজ্জনক সংক্রামক ক্ষমতা থেকে মুক্ত) বলা হয়। বস্তুত, খ্রিস্টবাদের মতোই ইসলামের ধর্মীয় কিতাবাদিতেও বদলাবদলি তাফসিরের ইতিহাস আছে, এবং খোদায়ী কালাম ও মানবীয় জ্ঞানগম্মির মাধ্যে ধরা দেওয়া দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যকার ফারাকও স্বীকৃত। সহিংস কাজের ‘প্রেরণা’ (মোটিভ) ‘ধর্মীয় আদর্শের’ ভেতর থাকে বলে যারা ভাবে তাদের দাবি, পরিণতিতে আসন্ন মুসিবতের ব্যাপারে যেকোনো উদ্বেগ থেকে নিস্তার পেতে আমরা যেন ধর্মীয় কথনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ—অথবা নিদেনপক্ষে যেখানে জন-নীতি (পাবলিক পলিসি) তৈরি হয় সেই ক্ষেত্রসমূহে ধর্মীয় বিষয়াশয়ের প্রবেশ রুদ্ধ করা সমর্থন করি। কিন্তু এটা সবসময় পরিস্কার নয় যে, যে ব্যাপারে জাগতিকতাবাদিরা উদ্বিগ্ন তা কি যন্ত্রণা ও দুর্ভোগ নাকি ঐ যন্ত্রণা ও দুর্ভোগ যাকে ধর্মীয় সহিংসতাজাত বলে আখ্যায়িত করা হয়। কারণ এই যন্ত্রণাবোধ, আধুনিক মনোরাজ্যে একেবারেই তিতকুটে ঠেকে। তথাপি এটাও পরিষ্কার নয় যে আধুনিক সমাজে অন্য সব কিছু থেকে আলাদা করে ‘ধর্মীয় প্রেরণা’ কিভাবে চিহ্ণিত করা যায়। উদ্দেশ্যমূলক আচরণ যা নিজের ব্যাখ্যা দেয় ধর্মীয় কথনের মাধ্যমে এবং সেই কারণেই তা ধর্মীয়, নাকি তা আন্তরিকভাবে করা হয় বলেই ধর্মীয়? কিন্তু অনান্তরিকতা নিজেই ধর্মীয় ভাষার নির্মাণ হতে পারে। ধর্মীয় সক্রিয়তার পেছনে সবসময়ই অচেতন প্রেরণা থাকে বলে ধরে নেয়া হয়, অতএব ফ্রয়েড অন্যান্যদের বয়ান অনুযায়ি এই প্রেরণা কি জাগতিক? কিন্তু এর মধ্যে এই প্রশ্নের মিনতি আছে যে কিভাবে ধর্মীয় ও জাগতিকের মধ্যে ফারাক করা হবে। সংক্ষেপে বলা যায়; সহিংসতার জন্য দায়ী (ধর্মীয়) প্রেরণা শনাক্ত করতে এমন একটি প্রেরণা-তত্ত্ব থাকতে হবে যা চরিত্র ও মেজাজ, অর্ন্তমুখীনতা ও দৃশ্যমানতা এবং ভাবিত ও অ-ভাবিত বিষয়াদিকে উপজীব্য করে তৈরি হয়েছে। আধুনিক জাগতিক সমাজে এই প্রেরণা তত্ত্ব বলতে বোঝায়—যেমন যেখানে বিদেশী দোস্ত ও দুশমনদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার গুরুত্ব যাচাই করে নীতিসমূহ প্রণয়ন করা হয় সেই আইনের আদালত (ল’ কোর্ট), অথবা জাতীয় সংবাদমাধ্যমের দাপুটে কথন, অথবা সংসদীয় মজলিশের মতো কর্তৃত্বমূলক তত্ত্ব ও প্রয়োগকেও।

মস্ত মস্ত সব নিষ্ঠুরতার কাণ্ড ঘটিয়েছে এমন জাগতিক কর্তৃবর্গের বেশুমার উদাহরণ তুলে ধরা খুব সহজ হবে। কিন্তু ধর্মের সমর্থনে এমনতরো কোশেশ না করে আমার কাছে আকর্ষণীয় মনে হয় যে; যখন আমরা ‘সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতা’র দায়িত্ব কোনো নির্দিষ্ট কর্তার প্রতি চাপিয়ে দিই তখন আমরা কি করি? একটা জবাব অবশ্যই তুলে আনা যায়; যখন আফগানিস্তানে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে জঙ্গে নামানোর জন্য সিআইএ পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনীর সাথে একত্রে ধর্মীয় যোদ্ধাদের উৎসাহিত, অস্ত্রসজ্জিত ও প্রশিক্ষিত করলো, যখন আরব অঞ্চল থেকে স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধাদের ওই দেশটিতে যাওয়ার জন্য সৌদি সরকার সুযোগ-সুবিধা দিলো; তখন বিভিন্ন আলাদা আলাদা কর্তৃবর্গের সাথে আমাদের একটি কাজ ছিল, একটি বিকাশমান ঘটনাপরম্পরায় নানা কর্তাসত্ত্বার আন্তসম্পর্ক ছিলো। শুধু সেখানে বিভিন্ন আলাদা আলাদা কর্তা ছিল বলেই নয় বরং বিচিত্র আকাঙ্ক্ষা, সংবেদনশীলতা ও নিজস্ব ভাবমূর্তি জড়িত থাকার কারণেও সেই জড়ানো-প্যাচানো ঘটনাটিতে একক ও স্থির প্রেরণা ছিলনা। কিন্তু এই কর্তৃবর্গজনিত জটিলতা কবুল করে নেয়ার বাইরেও আমরা প্রশ্নটিকে আরো ব্যপক মাত্রা দিতে পারি: আমরা কখন একটি স্পষ্ট প্রেরণা তালাশ করি? যখন আমরা কোনো বে-নজির ফলাফল শনাক্ত করতে পারি—অতএব নৈতিক বা আইনগত দায়িত্ব থেকে আমাদের মনে হয় সেই বে-নজির ফলাফলকে বৈধতা বা অভিযোগ হতে খালাশ পেতে হবে। আগে আমি যেমনটি বলেছি, কিভাবে এটা (বৈধতা বা অভিযোগমুক্তি) আরোপ করতে হয় সে ব্যাপারে অনেক তত্ত্ব আছে (আইন এখানে নমুনাস্বরূপ হতে পারে), সেই তত্ত্বগুলোকে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ এবং সেগুলো আধুনিক দুনিয়ায় কিভাবে ও কোন কোন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা হয় তা বোঝাও। সংক্ষেপে বলি, যদিও বিভিন্ন প্রচলনে ‘ধর্মীয়’ বাসনা ও ‘জাগতিক’ কামনার মধ্যে নানা তরিকায় ফারাক করা হয়েছে; তারপরও বাসনা শনাক্ত করা বিশেষত, যে জায়গা থেকে পন্ডিতরা নৈতিক ও আইনগত জবাবদিহিতাকে জায়গা দেয়ার জন্য আধুনিকতাকে আহ্বান জানান সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

৩.

অনেক সমালোচক এখন এই অবস্থান নিয়েছেন যে, ‘আধুনিকতা’(যেখানে ইহজাগতিকতাবাদের কেন্দ্রীয় অবস্থান) যাচাইযোগ্য বিষয় নয়। তাদের তর্কের জায়গা হচ্ছে; সমসাময়িক সমাজসমূহ নানা ধরনের ব্যক্তি ও বিষয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং জড়ানো, এসব সমাজ একই সাথে নানা অবস্থা, ভিত্তি ও পারস্পরিক আসক্তি (ভ্যালেন্স) ধারণ করে যেগুলো পরস্পর অসম এমনকি বিবদমানও বটে। এই তর্কের জবাবে আমি বলি—এক অর্থে এই সমালোচকদের অবস্থান যথার্থ (যদিও প্রয়োজনীয় যোগসূত্র সমূহ তালাশ করার উদ্দেশ্য মূল্য ভুলে যাওয়া উচিত নয়), কিন্তু আমরা যে দিকে মনোযোগ ফেরাতে চাই তা শুধু বোঝাপড়ার মামুলি ভুল নয়। ‘আধুনিকতা’র সমন্বিত চরিত্রের ব্যাপারে পূর্বানুমান নিজে থেকেই প্রায়োগিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। এই সমন্বিত চরিত্র সংকটাবস্থায় লোকজন কেমন আচরণ করবে সেধারা বাতলে দেয়। এইসব লোকেদের মনজিলে মকসুদ হলো ‘আধুনিকতা’ এবং তারা আশা করে বাদবাকীরাও (বিশেষত অ-পশ্চিমারা) এমনটি করবে। এই বাস্তবতা তখনো হাওয়ায় মিলিয়ে যায় না, যখন আমরা খুব সহজে বলি যে— ‘পাশ্চাত্য’ একটি সমন্বিত সামষ্টিকতা নয় অর্থাৎ পশ্চিমে অনেক লোকই ইহজাগতিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে কিংবা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে এর তফসির করে; যার মানে হচ্ছে পাশ্চাত্যে আধুনিকতা অনেক বাহাসের মুখোমুখি হয়েছে, এমন সব আকাঙ্ক্ষার সাক্ষী হয়েছে যেগুলো পরস্পর মিলমিশের অযোগ্য। অন্যদিকে আধুনিকতাকে যারা প্রকল্প হিশেবে নিয়েছে তারা ইতোমধ্যেই এসব বাহাস ও আকাঙ্ক্ষার কথা জানে। (আধুনিক উপনিবেশবাদের একটা দিক হচ্ছে; যদিও নিজের অন্দরমহলে পাশ্চাত্যের নানা চেহারা আছে কিন্তু বাইরে সে একাট্টা চেহারায় হাজির থাকে। ) অতএব ধারনা হিসেবে ‘আধুনিকতা’র (অথবা পাশ্চাত্যের) বয়ান বেঠিক কি না সেই সত্যাসত্য নির্ধারণ করা এখনকার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়; বরং জরুরি প্রশ্নটি হচ্ছে; একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে এটি দাপট-বিস্তারী হয়ে উঠলো কেন, এই দাপট থেকে কিসব প্রায়োগিক ফলাফল আসে এবং কেমনতরো সামাজিক অবস্থা একে লালন করে।

এটা বলা কি সঠিক যে, আধুনিকতা না পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ কিংবা না সাফসাফ সীমারেখা টানা কোনো লক্ষ্য, এবং এর ইতিহাসের সাথে জড়িত অনেক উপাদানই ইওরোপের বাইরের মানুষের ইতিহাসের সাথে জড়িত। ক্ষমতায় থাকা লোকেরা যা অর্জন করতে চায় সেরকম একটা প্রকল্প অথবা আন্ত:সম্পর্কযুক্ত প্রকল্পসমূহের একটা ধারাক্রম হচ্ছে আধুনিকতা। এ প্রকল্পের লক্ষ্য হচ্ছে বেশ কিছু নীতির (কখনো কখনো পরস্পর সাংঘর্ষিক, ও প্রায়ই বিকাশমান) প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা: সাংবিধানিকতা, নৈতিক স্বায়ত্ত্বশাসন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নাগরিক সাম্য, শিল্প, শ্রমিকতা, ভোক্তাসত্ত্বা, মুক্ত বাজার—এবং ইহজাগতিকতা। প্রতিষ্ঠানিকীকরণের এই প্রক্রিয়া (উৎপাদন, যুদ্ধ, ভ্রমণ, বিনোদন, ঔষধ) প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করে; যে প্রযুক্তি পরিসর ও সময়ের, নিষ্ঠুরতা ও স্বাস্থ্যকর, ভোগ ও জ্ঞানের নয়া অভিজ্ঞতা পয়দা করে। বলা হয় এইসব অভিজ্ঞতাসমূহ ‘মোহমুক্তি’ তৈয়ার করে—যা বাস্তবতায় সরাসরি প্রবেশযোগ্যতার ইঙ্গিত দেয়। পুরাণ, জাদু এবং খোদায়ী বিষয়াশয়কে পত্রপাঠ বিদেয় করে—এইসবই হলো আধুনিকতার পয়লা দিককার বৈশিষ্ট্য। নি:সন্দেহে, এটা হচ্ছে উনিশ শতকের রোমান্টিকতার এবং কিছু ক্ষেত্রে কল্পনাপ্রধান সাহিত্য পাঠের ক্রমবর্ধমান অভ্যাসের ফসল; যা এই অভ্যাসের দ্বারা ও অভ্যাসের মধ্যেই আটকে আছে, যাতে করে ‘প্রাক-আধুনিক’ অতীতের একটা মনোমুগ্ধকর চিত্র অর্জন করা যায়।

আধুনিকতার প্রকল্পসমূহ একটি সমন্বিত সামষ্টিকতা হিশাবে একসাথে ঝুলে নেই, তারা বরং আলাদা আলাদা সংবেদনশীলতা, নন্দন ও নৈতিকতা গড়ে তুলেছে। কিন্তু আধুনিকতা যখন দাবি করে ‘পশ্চিম’ বলে কিছু নেই, কারণ নিজেকে ইওরোপের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য আধুনিক সংস্কৃতির বিচিত্র কুষ্টিনামা (জিনিওলজি) আছে, তখন আসলে সমালোচনার ঠিক মানেটা কি? ইওরোপের যদি একটি ভৌগোলিক ‘বাহির’ থাকে তবে কি সে নিজেই ‘পশ্চিম’ কে স্থাপন করার জন্য দরকারি পরিসরের (যা একই সাথে সমধর্মী ও অধীনস্ত) ধারনার পূর্বানুমান করে না? আমার মতে এই প্রশ্নের ফায়সলা করার জন্য এটা (পশ্চিম এর আলাদা পরিসর কে অস্বীকার করা) উত্তম উপায় নয়। আধুনিকতা প্রধানত ‘বাস্তব’ কে (দ্য রিয়াল) শনাক্ত করার নয় বরং ‘দুনিয়াদারি থাকা’টা কাজে খাটানো। নয়া জামানার সূচনাকারী যে কোনো প্রত্যয়ের বেলায় এসব সত্য। কিন্তু এধরনের প্রকল্প হিশাবে আধুনিকতার বেলায় আলাদা বিষয়টি হচ্ছে—এটা একটা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রকল্প। তাছাড়া আমাকে বিশেষভাবে যে ব্যাপারটি আগ্রহী করে তোলে তা হচ্ছে; যেই অর্থে আধুনিক জীবন যাপন প্রয়োজনীয় বলে বলা হয়, সেই অর্থে জাগতিক ও ধর্মীয় প্রকরণ দাড় করানোর প্রচেষ্টা, যাতে করে ওইসব কারণের অপর্যাপ্ততা খতিয়ে দেখা যায়। আধুনিক ও আধুনিক হয়ে উঠছে এমন রাষ্ট্রগুলোতে জাগতিক ও ধর্মীয়-এর প্রতিনিধিত্বের জন্য জনগণের পরিচয়সমূহের মধ্যে মিলমিশের ব্যবস্থা করা হয়, তাদের সংবেদনশীলতাগুলোকে নয়া আদল দেয়া হয় এবং তাদের অভিজ্ঞতাসমূহকে জায়গা দেয়া হয়।

কিন্তু ‘আধুনিক প্রকল্প’ বলে কিছু একটা আছে তার প্রমাণ কি? ‘দি কমিউনিস্ট ইশতেহার’র নতুন সংস্করণের ওপর সম্প্রতি প্রকাশিত একটি আলোচনায় রাজনীতি বিজ্ঞানী স্টিফেন হোমস দাবি করেছেন যে, ‘কম্যুনিজমের সমাপ্তির মানে হলো সার্বজনীন ইতিহাস নির্ভর হেগেলীয় বিশ্বাসের ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপিত সর্বশেষ বিশ্বশক্তির পতনের অর্থ ইশতেহারে জোর আওয়াজ তোলা জগৎ বিস্তারি ইতিহাসেরও দফারফা। ঠান্ডা যুদ্ধের অবসান মানে, এখন আর একক কোনো লড়াই সরা দুনিয়াকে তাড়া কর ফিরবে না’। তারপরও, শুধু পরাজিত কমিউনিজমের ওপর বিশ্বজনীন ও ঐতিহাসিক পরমকারণবাদের এই আরোপ খুব কমই বিশ্বাসযোগ্য। নয়া বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে সাফাইগায়ক ফুকুয়ামার মতো নয়া-হেগেলীয়দের পাশ কাটিয়ে গেছেন যেই হোমস, দুনিয়াজুড়ে একটি একক সামাজিক আদল চালু করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে যখন সেই হোমস পাত্তা না দেন, তখন তা বিষ্ময়কর ঠেকে। বিশেষত, গত পনের বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মুরব্বিয়ানায় চালিত আর্ন্তজাতিক সংস্থাসমূহ (ওইসিডি, আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক) বিভিন্ন দেশ নির্বিশেষে একই ধরনের বিশ্লেষণ করে আসছে ও একই ধরনের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছে। সার্গ হালিমি’র পর্যবেক্ষণ মতে, ‘‘সমগ্র মানবতার উন্নয়ন প্রক্রিয়া এর আগে খুব কম সময়ই আমেরিকান আদল-এর এতটা কাছাকাছি ছিল কিংবা ওই আদলের দ্বারা এতটা অনুপ্রাণিত ছিল।’’ হালিমি যেমনটি বলছেন, এই আদল কেবল মুক্ত বাণিজ্য ও ব্যক্তি উদ্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এর মধ্যে নৈতিক ও রাজনৈতিক অনেক মাত্রাও আছে—যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে ইহজাগতিকতার মতবাদ (ডকট্রিন অব সেকুলারিজম)। যদি এই প্রকল্পটি সারা দুনিয়ায় সার্বিকভাবে সফল না হয়ে থাকে, যদি এর ফলে সমজাতীয়তার চেয়ে বরং আরো বেশি অস্থিতিশীলতা তৈয়ার হয়ে থাকে—তবে নিশ্চিতভাবেই তার কারণ এই নয় যে, যারা দুনিয়ার নানা বিষয়ে সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেয়ার অবস্থানে যারা আছে তারা সবগুলো দেশের জন্য একটি একক গন্তব্যের মতবাদ প্রত্যাখান করছে। তা যেন সকল দেশের জন্য কাল ও পাত্র নিরপেক্ষ এক পরমসত্য। (এটাও নিসন্দেহে সত্য যে, এই প্রকল্পের বিরোধীরা নিজেরা প্রায়ই আদর্শের একত্রিকরণ ও অসহিষ্ণু মনোভাবের দ্বারা চালিত হন। যাইহোক, এখানে আমার উদ্দেশ্য ‘আমেরিকাকে দোষ দেয়া’ ও ‘তার শত্রুদের কাজের ন্যায্যতা দেয়া’ নয়, বরং এই ইঙ্গিত দেয়ার জন্য বলছি যে, সেপ্টেম্বর এগারোর ট্রাজেডির পরিণামে, দুনিয়ার একমাত্র পরাশক্তি হিশাবে নিজের স্বার্থের ও স্বাধীনতার ওয়াদার সুরক্ষার জন্য দুনিয়াজুড়ে হস্তক্ষেপ করা এবং তার কাছে যা বিশ্বজনীন মূল্যবোধ বলে মনে হয় সে অনুযায়ী স্থানীয় পরিস্থিতির সংস্কারে সাহায্য করায় জোর দেয়া আমেরিকার দরকার হয়ে পড়েছে। সংস্কারকৃত স্থানীয় অবস্থাসমূহের মধ্যে রয়েছে ভোগ (কনজাম্পশন) ও প্রকাশ (এক্সপ্রেশন)-এর নয়া ধরণ। এগুলোকে ‘স্বাধীনভাবে পসন্দকৃত’ নাকি ‘আরোপিত’ বললে ভালোভাবে বলা হয় সে প্রশ্ন আলাদা।)

অতএব আমাদের ইহজাগতিকতাবাদী রাজনীতি সহ জাতীয় প্রগতির রাজনীতি’র (পলিটিকস অফ ন্যাশনাল প্রগ্রেস) দিকে নজর দেয়া উচিত, যে রাজনীতি আসে ‘পাশ্চাত্য’ (এবং বিশেষভাবে পাশ্চাত্যের নেতা ও সবচেয়ে অগ্রসর দৃষ্টান্তস্থাপনকারী আমেরিকা) কর্তৃক স্থাপিত দৃষ্টান্ত—আধুনিকতার বহুমুখী ধারণা থেকে। কিন্তু এর উল্টো মতের রাজনীতিও কি আমাদের খতিয়ে দেখা উচিত নয়? দুনিয়া আধুনিক ও অনাধুনিক, পশ্চিম ও অ-পশ্চিমে বিভক্ত নয়—এই ভাবনা কেমনতরো রাজনীতি সংগঠনে সহায়তা করে? দুনিয়ার কোনো তাৎপর্যপূর্ণ দ্বি-বিভক্ত (বাইনারি) বৈশিষ্ট্য নাই, যার বিপরীতে জড়াজড়ি করে থাকা ও ভঙ্গুর সংস্কৃতিসমূহ, সঙ্কর সত্ত্বাসমগ্র, একের পর এক বিলীন হতে থাকা ও আবির্ভূত হতে থাকা সামাজিক রাষ্ট্রসমূহে দুনিয়া বিভক্ত—এই ভাবনা থেকে কেমনতরো প্রায়োগিক উপায় তৈয়ার কিংবা শেষ হয়? আমি বিশ্বাস করি—এই বোঝাপড়ার একটা অংশ হিশাবে আমাদেরকে বিভিন্ন পূর্বধারণার মোড়ক খুলে দেখতে হবে, যেসব পূর্বধারণার ভিত্তির ওপর এই দুনিয়ায় দুনিয়া নিয়ে একটি আধুনিক মতবাদ, ইহজাগতিকতা স্থাপিত। এটা একেবারেই সুনির্দিষ্টভাবে সেই প্রক্রিয়া, যেই প্রক্রিয়া দ্বারা এই ধারণাগত দ্বি-বিভাজনসমূহ কায়েম অথবা উৎখাত হয়, যেই প্রক্রিয়া আমাদের বলে যে কিভাবে মানুষ জাগতিক-এ বাঁচে—কিভাবে তারা সার্বভৌম আত্মসত্ত্বার জন্য অপরিহার্য স্বাধীনতা (ফ্রিডম) ও দায়িত্বের ন্যায্যতা প্রমাণ করে, ওই আত্মসত্ত্বাকে ধর্মীয় কথন দ্বারা সীমাবদ্ধ করে রাখার বিপরীতে।

 

৪.

এটা এই বর্তমান অধ্যয়নের অন্যতম ভিত্তি যে, জাগতিক (দ্য সেকুলার) ধারণাগতভাবে ইহজাগতিকতাবাদ-এর (সেকুলারিজম) রাজনৈতিক মতবাদের আগেকার, তার মানে হচ্ছে সময়ের সাথে সাথে নানা কিসিমের ধারণা, অনুশীলন এবং সংবেদনশীলতা মিলেমিশে জাগতিক’কে গড়েছে। অতএব সামনের পরিচ্ছেদগুলো আমি শুরু করেছি ওই ধারণাটির আংশিক কুষ্টিনামা দিয়ে, এই প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য এর স্বত:সিদ্ধ চরিত্রের প্রতি প্রশ্ন তোলা যখন একই সময়ে এ ঘোষণাও দিচ্ছি যে- তা সত্ত্বেও এটা বাস্তব কিছু একটা চিহ্ণিত করে। আমি যেভাবে কুষ্টিনামা’র আশ্রয় অবলম্বন করেছি তা অবশ্যই ফুকো বা নিটশে যেভাবে কুষ্টিনামা প্রয়োগ করেছেন সে উপায় থেকে উদ্ভূত, যদিও এটা তাদের নিষ্ঠাবানভাবে অনুসরন করার দাবি করে না। সামাজিক ইতিহাসের (‘বাস্তব ইতিহাস’, অনেকে যেমনটি বলেন) বিকল্প হওয়ার কোনো মতলব এখানে কুষ্টিনামা’র নাই, বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের বর্তমান থেকে পেছনের দিকে কাজ করে যাওয়া, যেসব অনিশ্চিত সম্ভাবনা একত্রিত হয়ে আমাদের নিশ্চয়তা দিতে আসে সেই দিকে কাজ করে যাওয়া।

জাগতিকতা আমাদের আধুনিক জীবনের অংশ হওয়ার কারণেই একে উপলদ্ধি করা সহজ কাজ নয়। আমি মনে করি এটাকে এর ছায়া সমূহের মধ্য দিয়েই ভালোভাবে ধরতে পারা যায়, যে ছায়া হয়েই এটা ছিল। এটাই হচ্ছে সেই কারণ যেই কারণে ১ম পরিচ্ছেদে আমি জাগতিকতার বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্তরে মিথ-এর (যা ‘মোহমুগ্ধতা’র আধুনিক ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে) ভাবনার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়েছি; এবং এরপর ২য় ও ৩য় পরিচ্ছেদে শরীরি প্রকাশের সাথে সর্ম্পকিত করে মাধ্যম (এজেন্সি), যন্ত্রণা (পেইন) ও নিষ্ঠুরতা’র (ক্রুয়েল্টি) আলোচনা করেছি। জাগতিকের এই তত্ত্ব-তালাশ থেকে আমি ইহজাগতিকতাবাদের দিকে গিয়েছি, উদ্দেশ্যভিত্তিক অধিকারের মূলে থাকা ‘মানব’ এর ধারণা (৪র্থ পরিচ্ছেদ), ইওরোপে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু’ বিষয়ক ভাবনা (৫ম পরিচ্ছেদ), এবং জাতীয়তাবাদ অপরিহার্যভাবে জাগতিক কিংবা ধর্মীয় হবে কি না সেই প্রশ্নের (৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ) দিকে গিয়েছি। সবশেষ পরিচ্ছেদে আমি ঔপনিবেশিক মিশরে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ, আইন ও নীতিবিদ্যার ইহজাগতিকীকরণে রুপান্তর (যা সাধারনত নাড়াচাড়া করা হয় না) প্রসঙ্গে কিছু মাত্রায় কাজ করেছি।

চুড়ান্তভাবে বলতে হয়: ইহজাগতিকতাবাদ বিষয়ে উত্থাপিত প্রশ্নসমূহের যাচাই বাছাই করার জন্য নৃতত্ত্ব কোনো অবদান রাখে কি? অধিকাংশ নৃতত্ত্ববিদ শিখিয়েছেন যে তাদের এই জ্ঞানকান্ডটি একটি গবেষণা কৌশলের (অংশগ্রহণকারী পর্যবেক্ষণ-পার্টিসিপ্যান্ট অবজারভেশন) দ্বারা অপরিহার্যভাবে সংজ্ঞায়িত যে কৌশলে শুধু নির্দিষ্ট সীমারেখা দ্বারা চিহ্ণিত ক্ষেত্রে গবেষণা চালানো হয় এবং সেক্ষেত্রে এর কারবার কেবল সুনির্দিষ্টতার সাথে—দার্শনিক গিলবার্ট রাইলের মতো করে ক্লিফোর্ড গার্টজ যাকে ‘থিক ডিসক্রিপশন’ বা মোটাদাগের বয়ান বলেছেন। এবং ইহজাগতিকতা কি আধুনিক দুনিয়াজুড়ে প্রয়োগযোগ্য একটি সার্বজনীন ধারণা নয়—যা একই সাথে সাংস্কৃতিক বহুত্বের নিয়ত পরিবর্তনশীলতার ব্যাখ্যা করা এবং বহুত্বকে সহনীয় করে তোলার ক্ষেত্রে সক্ষম?

আমার মতে, নৃতত্ত্ব একটা পদ্ধতির চেয়ে বেশি কিছু, এবং জনপ্রিয়ভাবে এটাকে যেভাবে দেখা হয়ে আসা হয়েছে, সেভাবে বিজ্ঞানকল্পিত ‘ফিল্ডওয়ার্ক’ এর ভাবনার সমান করে এটাকে দেখা উচিত নয়। ম্যারি ডগলাস একসময় যেমনটি প্রস্তাব করেছিলেন যে, আধুনিক নৃতত্ত্ববিদ্যার উত্থান বিষয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যাসমূহ যদিও বলে যে আরাম-কেদারায় তত্ত্বচর্চা করা থেকে সরে এসে এটা নিবিড় মাঠগবেষণার প্রক্রিয়া হিশাবে জায়গা করে নিয়েছে (বোয়াস, রিভার্স এবং ম্যালিনস্কি’র কাজের মধ্য দিয়ে), কিন্তু সত্যিকারের চিত্র আলাদা। ডগলাস আধুনিক নৃতত্ত্ববিদ্যার যে ব্যাখ্যা সমর্থন করেন তা শুরু হয়েছে সাংস্কৃতিক ধারণাসমূহে পদ্ধতিগত অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক মার্সেল মস-এর হাত ধরে (মার্সেল মস-এর উদ্দেশ্যে ‘ফরওয়ার্ড’, দি গিফট, লন্ডন: রুটলেজ, ১৯৯০, পৃষ্ঠা ১০)। এধরনের নৃতত্ত্ব চর্চায় যারা অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে ডগলাস নিজেও সম্মানিত একজন। কিন্তু ধারণাগত বিশ্লেষণের দিক থেকে নৃতত্ত্ব চর্চার এই ধরন ততটাই পুরনো, যতটা বয়স দর্শনের। আধুনিক নৃতত্ত্বের বেলায় যেটুকু স্বতন্ত্র তা হলো, এটা হচ্ছে সময় ও পরিসরের দিক থেকে আলাদা আলাদাভাবে অবস্থিত সমাজসমূহের মধ্যে পরস্পর দৃঢ়ভাবে গেথে থাকা ধারণাসমূহের (প্রতিনিধিত্বশীলতার) তুলনা। এই তুলনামূলক বিশ্লেষণে সেগুলোর উৎপত্তিস্থল (পশ্চিমা অথবা অ-পশ্চিমা) গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জীবন যাপনের ধরন, যা সেগুলোকে পরস্পর দৃঢ়ভাবে গেথে দেয়—গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সেই ক্ষমতা যা এগুলো তৈরি কিংবা ধ্বংস করে। ইহজাগতিকতাবাদ, ধর্মের মত—এমন একটি ধারণা।

ইহজাগতিকতাবাদের একটি নৃতত্ত্ব সুতরাং মতবাদটি ও তার প্রয়োগসমূহ সর্ম্পকে আগ্রহের সাথে শুরু হওয়া উচিত। সেগুলো কোথায় উৎপত্তিলাভ করেছে সেটা বিবেচনায় না এনেই, এবং এই আগ্রহ প্রশ্ন করবে যে, জীবন যাপনের বিভিন্ন ধরনে মানব শরীরের প্রতি (যন্ত্রণা, বস্তুগত ক্ষতি, ক্ষয়িষ্ণুতা ও মৃত্যুর প্রতি, বস্তুগত অখন্ডতা, শারীরিক বৃদ্ধি ও যৌন উপভোগের প্রতি) এর দৃষ্টিভঙ্গির হেরফের কিভাবে হবে? অনুভূতির—শোনা, দেখা, স্পর্শ করার কেমন কাঠামোর ওপর এই দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর করে? মানুষ যে ‘সত্যিকারের মানুষ’ তার ওপর ভিত্তি করে নানা অনুশীলন ও মতবাদকে আইন ঠিক কোন উপায়ে সংজ্ঞায়িত ও নিয়ন্ত্রিত করে। সংজ্ঞায়ন ও নিয়ন্ত্রণের এই কারবার ‘জাগতিক’ ও ‘ধর্মীয়’-এর জন্য কোন অপ্রাসঙ্গিক পরিসর উন্মুক্ত রেখে যায়? এই সব সংবেদনশীলতা, দৃষ্টিভঙ্গী, পূর্বধারণা এবং আচরন কিভাবে একত্রে ইহাজাগতিকতা’র মতবাদ কে সমর্থন কিংবা নাকচ করতে আসে?

ইহজাগতিকতার দোষ অথবা গুণ নিয়ে চটজলদি আওয়াজ তোলার চেয়ে বিশদভাবে এমনতরো প্রশ্ন দাঁড় করানোর চেষ্টা করা নৃতত্ত্বের জন্য আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।


Available tags : আইন, সংবিধান, গণতন্ত্র, ফরহাদ মজহার, Farhad Mazhar

View: 5270 Posts: 0 Post comments

Home
EMAIL
PASSWORD